অনুগল্প ৭

 রাত ৯ঃ১৫ কি ১৬, ছাঁদের কার্ণিশ ধরে দাঁড়িয়ে আছি।আকাশে মস্ত এক চাঁদ ওঠেছে।ছাঁদের পাশে কিছু সুপারি গাছের মেলা...তাদের মধ্যে খুব জড়োসড়োভাবে বেঁড়ে ওঠেছে চিকন একটা বাঁশ গাছ...ছোট্ট বেলায় চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে  কবিতা আওড়াতাম,"বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই..." আজ কবিতার লাইনটা ভীষণ মনে পড়ছে।।কোনো এক দশকে যতীন্দ্রমোহন বাগচী হয়তো আমার মতোই কোনো এক বিষন্ন রাতে বাঁশের পাতার ফাঁকে খেলে ওঠা চাঁদের সৌন্দর্যটাতে মুগ্ধ হয়ে  কবিতাটা লিখেছিলেন।। সত্যিই বাঁশের পাতার ফাঁকে চাঁদের সৌন্দর্যটা যেনো একটু অন্যরকম...একদম গ্রামীন।এই ইট পাথরের শহরে বাবা কি মনে করে যে এই রোগা বাঁশ গাছটা বাগানের কোনেই লাগিয়েছিলেন কে জানে?হয়তো তার গ্রামসত্তাটাকে ধরে রাখার এটা একটা ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা!!আমি একদৃষ্টিতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছি...মনে কেমন একটা ভীষন্নতা ভাব চলে এসেছে...রাঁতের নিস্তব্ধ আঁধারে চাঁদের এই সৌন্দর্যে কেমন একটা দুঃখী দুঃখী ভাব থাকে।।ঝিরিঝিরি বাতাসে মনে যেমন প্রশান্তি এনে দেয়....তারসাথে লুকিয়ে থাকা কান্নাগুলোকেও যেনো টেনে বের করে আনে..সেই গহীন অতিত থেকে।।তাই হয়তো চাঁদের দিকে তাকালে কবিরা হয় উদাসীন!! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছাঁদের রেলিং এ হাত রেখে দাঁড়ালাম...চাঁদটাকেও আজ নিঃসঙ্গ লাগছে খুব....তারারা বুঝি রাগ করেছে আজ,? নাকি আমার মতো তাদেরও আজ মন ভার???হঠাৎই কেউ একজন নিঃশব্দে এসে দাঁড়ালো আমার সামনে....রেলিং এ ঠেস দিয়ে আমার দিকে মুখ করে দাঁড়ালো সে!!চাঁদের দিকে একবার তাকিয়েই মুখ ঘুরিয়ে তাকালো আমার দিকে।কি নিঃসংকোচ দৃষ্টি!! চাঁদের আবছা আলোয় সেদিকে না তাকিয়েও মানুষটাকে চিনতে পারলাম আমি...শুভ্র ভাই!!আমি আগের মতোই ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছি, উনার দিকে তাকাতে ইচ্ছে করছে না মোটেই, উনি চলন্ত এক মাথাব্যথা। এখনি নিশ্চয় উদ্ভট সব কথা বলে উলট পালট করে দিয়ে যাবেন আমায়?আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে খুবই শান্ত গলায় বলে উঠলেন উনি-

.

মন ভালো করে দে আমার...কোথায় যেনো খুব কষ্ট হচ্ছে রে!!

.

আমি অবাক চোখে তাকালাম। কি অদ্ভুত নিঃসংকোচ আবেদন "মন ভালো করে দে" যেনো উনার মন ভালো করে দেওয়াটাই আমার জন্মানোর মোক্ষম উদ্দেশ্য।।আচ্ছা?উনারও মন খারাপ হয় বুঝি?কই কখনো তো মুখ ফুলিয়ে থাকতে দেখি নি উনাকে....যে সবসময় অন্যের মন খারাপের কারণ তার  নিজেরও কি কখনো মন খারাপ হতে পারে??আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে আবারও বলে উঠলেন উনি- 

.

আমার কথা কি শুনতে পাচ্ছিস না তুই?এভাবে থম মেরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন শুনি?এই লকডাউনের সময়ও তো ফুল ফ্যামিলি নিয়ে জেলায় জেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছিস।।দাঁত বের করে হাসছিস...আর আমার সময়ই কানে কালা?কেন?

.

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উনার দিকে তাকালাম।সাদা আর গোলাপীর মিশ্রনে একটা সুঁতি পাঞ্জাবি পড়েছেন উনি...বুকের উপরের দুটো বোতাম খোলা...পাতার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলোর টুকরোগুলো এসে পড়ছে উনার চুলে...কি মায়াময় লাগছে সে মুখ খানা!!হালকা বাতাসে কপালে পড়ে থাকা চুলগুলো একবার উড়ে যাচ্ছে তো আবারও জাপটে পড়ছে কপালে।।মনের মধ্যে একটা ভয়ানক ইচ্ছে জেগে উঠছে বার বার,,,ইচ্ছেটাকে কোনোরকম প্রশ্রয় না দিয়ে একটা ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে বলে উঠলাম আমি-

.

আমরা মোটেও জেলায় জেলায় ঘুরছি না।।দু'দিনের জন্য শেরপুর গিয়েছিলাম জাস্ট!!সেখান থেকে আবারও ময়মনসিংহ.. 

.

তো সেখানেই বা যেতে হলো কেন?মৃত দাদির কবর জিয়ারত করতে গিয়ে নিজেরাও কি মরে ভূত হতে চাস নাকি??বাপ মেয়ে এক টাইপ....যা মনে হবে তাই করা চাই....চাই-ই চাই।।অদ্ভূত!!

.

উনার কথায় মেজাজ খারাপ হচ্ছে আমার....এই রাতে উনি আমায় এই কথাগুলো বলতে এতোটা ছুটে এসেছে?আসতেও পারে...উনার কাজই হলো হুটহাট এসে আমার মাথাব্যথা বাড়িয়ে দেওয়া....আমি শান্ত গলায় বললাম-

.

আপনি কি এসব বলতে এসেছেন আমায়?

.

নাহ..মন ভালো করতে এসেছি...তুই আমার মন ভালো করে দে...আমি চলে যাই।

.

আশ্চর্য!! আমি কি মন ভালো করার ঔষধ নিয়ে বসে আছি নাকি?যে আপনি বলবেন আর আমি এক শিশি ঔষধ খাইয়ে আপনার মন ভালো করে দিবো!!

.

কি দিবি, না দিবি জানি না.... আমি শুধু জানি তুই আমার মন ভালো করে দিবি ব্যাস...আমি খেতে পারছি না,,ঘুমোতে পারছি না,,মনটাকে খুব অসুস্থ লাগছে বুঝলি?মনে হয় ভীষন জ্বর তার...একটু শীতলতা প্রয়োজন।একটু আরাম!!

.

উনার কথায় অবাক হলাম আমি।আচ্ছা?মনেরও কি জ্বর হয়?আগে তো কখনো শুনি নি.....অদ্ভুত!! চিন্তিত মুখে বলে উঠলাম আমি-

.

মনেরও কি জ্বর হয় শুভ্র ভাই?

.

হ্যা হয়।ভীষণ রকম জ্বর হয়।নয়তো আমার হলো কিভাবে শুনি?

.

আমি বিপুল উৎসাহ নিয়ে বলে উঠলাম -

.

মনে জ্বর হয় কেন??শরীরে তো ঠান্ডা লাগলে জ্বর হয়...তাহলে মনের জ্বরটা হয় কেন??আপনার জ্বরটা কেন হয়েছে শুভ্র ভাই?

.

উনি হাসলেন। 

.

একটা মেয়ে!!বুঝলি রোদু?একটা মেয়ের জন্য ভয়ঙ্কর জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে আমি!!

.

উনার মুখে "একটা মেয়ে" শব্দটা শুনেই ভ্রু কুঁচকে তাকালাম।।মনটা আবারও বিষাক্ত হয়ে উঠলো।।ইশশ চারপাশটা হঠাৎ এতো অন্ধকার লাগছে কেন ?? চাঁদের আলো কি কমে গেলো??নাকি মেঘেরা ঢেকে দিয়েছে তাকে?? চারপাশটায় কতো বিষাদের ছাঁয়া!!আমি হালকা গলায় বলে উঠলাম -

.

মেয়ে?

.

হ্যা মেয়ে।।মেয়েটা খুবই দুষ্টু বুঝলি?উদ্ভট সব কাজ করে....মনের মধ্যে পা গুটিয়ে বসে হাতের বড় বড় নখগুলো দিয়ে অনবরত চিঁমটি কাটে....কখনো কখনো কাঁমড়েও দেয়...খুব ব্যাথা করে (বুক দেখিয়ে)এখানটায়...

.

এবার চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো আমার।।উনি কি মজা করছেন আমার সাথে??চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়েও এই ঝাপসা আলোই উনার মুখের ভাবটা ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না....কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবারও বলে উঠলেন উনি- 

.

মেয়েটা এত্তো এত্তো জেদী বুঝলি?কিছুতেই মন থেকে সরতে চায় না...বকেও তাড়াতে পারি না তাকে।।এখন তো রক্তের শিরায় শিরায় ঘুরে বেড়াচ্ছে সে...কতোটা ভয়ানক ব্যাপার বুঝতে পারছিস তুই??

.

শুভ্র ভাই?আপনি কি মজা করছেন আমার সাথে?আপনার এসব থার্ডক্লাস গল্প শোনার ইচ্ছে আমার নেই...প্লিজ যান এখান থেকে...মা আপনাকে ডাকছে নিশ্চয়...

.

তোর কাছে মজা মনে হচ্ছে রোদ? লাইক সিরিয়াসলি?? এই সত্যি করে বল তো,, তোর মধ্যে কি মায়া দয়া নামক কোনো বীজ আছে??আমার তো মনে হয় নেই।।তোর একমাত্র মামাতো ভাই মনের জ্বরে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে আর তুই তাকে  এভাবে অপমান করছিস?

.

অপমান কই করছি শুভ্র ভাই?আমি তো জাস্ট আপনাকে যেতে বলেছি....মনে এতো জ্বর তাহলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কেন?মনকে কম্বলে জড়িয়ে রাখলেই তো পারেন।

.

কথাটা বলেই আবারও চাঁদের দিকে ফিরে তাকালাম আমি।উনি হঠাৎই আমার ঠিক সামনে এসে দাঁড়ালেন....উনার এভাবে কাছে  আসায় ভড়কে গেলাম আমি...থতমত খেয়ে গেলাম মুহূর্তেই।।উনি শান্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়েই বলে উঠলেন -

.

কম্বলে নয় তোর ছোঁয়ায় জ্বর কাটবে আমার।।তাইতে এসেছি...একটু ছুঁয়ে দে তো আমায়....এইতো এখানে (বুকে হাত দিয়ে) ঠিক এখানটায়।।তোর হাতে নাকি মন ভালো করার ঔষধ আছে??দে না একটু ধার...কষ্ট হয় আমার...ভীষন কষ্ট!!!

.

আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই ডাক পড়লো উনার....উনি পাঞ্জাবী টেনে ঠিক করে...চুলগুলো পেছনের দিকে ঠেলে দিয়েই সিঁড়ির দিকে হাঁটা দিলেন।আমি সেখানেই ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছি... একবার চাঁদের দিকে তাকাচ্ছি তো একবার হাতদুটোকে দেখছি....সত্যি কি আমার হাতে মন ভালো করার ঔষধ আছে??

.

রোদ-শুভ্রর প্রেমকথন❤

.

রোদবালিকা❤

.

Comments