বেখেয়ালি ভালবাসা ২ও ৩ পর্ব
গল্পঃ #বেখেয়ালি_ভালবাসা
লেখাঃ #সাবেরা_সুলতানা_রশিদ
(#পর্ব_৩
৭.
হঠাৎ মেঘের মনে হয় কে যেন তাকে শরীরে ঝাঁকুনি দিয়ে ডাকছে।
মেঘ চোখ মেলে দেখে ঝিনুক দাড়িয়ে আছে
—ভাবি উঠো তাড়াতাড়ি নিচে চলো দেখ কি হচ্ছে।
মেঘ ধড়ফড় করে উঠে এদিক ওদিক তাকিয়ে সৈকত কে খুজতে থাকে।
একটু আগেই তো সৈকত ওর কাছে ছিল । কপালে চুমু দিল আর কানের কাছে মুখ নিয়ে কি যেন বলেছিল। মুহূর্তের মধ্যে সৈকত কোথায় চলে গেল। ও মানুষ না অন্যে কিছু!!
মেঘ একটু সামলে বললো তোমার ভাইয়া ছিল না এখানে কোথায় গেল??
—ভাইয়া!!??ভাইয়া এখানে কোথা থেকে আসবে ভাইয়া তো নীচে হল রুমে । সেই যে দুপুরে বেরিয়ে ছিল আর কেবল ফিরলো। ফিরেই দেখ কি শুরু করেছে।
—মানে!!?
মেঘ মনে মনে ভাবে তাহলে আমি এতক্ষন যা দেখলাম সবটা স্বপ্ন!!??
সৈকত আসে নি কিন্তু আমার এই কপালে দেওয়া চুমু বলেই নিজের অজান্তে কপালে হাত দেয় মেঘ।
—কি হলো ভাবি কি ভাবছো??তাড়াতাড়ি চলো বাসার অন্যে সবাই জেগে যাওয়ার আগে।
—কি হয়েছে সেটা তো বলবে।
—আগে চলো তারপর নিজের চোখে দেখবে। আমার খুব ভয় করছে ভাবি।
—কেন??
—বাবা যদি ভাইয়াকে এ অবস্থায় দেখে তাহলে লঙ্কাকান্ড হয়ে যাবে।
মেঘ ছুটে দরজা খুলে বের হতেই সৈকতের কন্ঠস্বর শুনতে পেল।সৈকত জোরে জোরে চিৎকার করছে। কিন্তু কি এমন হলো ওর যে এমন জোরে জোরে চিৎকার করছে।
মেঘ সিড়িঁ দিয়ে নেমে নীচে হল রুমে পা দিতেই চোখ পড়লো জিনিসপত্র এলোমেলো এখানে ওখানে ছড়ানো ছিটানো। হল রুমটা সুন্দর করে সাজানো গোছানো ছিল দামি দামি দেশী বিদেশী সোপিচ দিয়ে সেসব ভেঙ্গে চুরে একাকার ।
সৈকত চিল্লাচ্ছে চৌধুরী সাহেব কোথায় আপনি বেরিয়ে আসুন। আজ আপনাকে আমার সব প্রশ্নের জবাব দিতেই হবে।
মেঘ দৌড়ে সৈকতের কাছে গিয়ে বললোঃ
— কি হয়েছে আপনার এভাবে চিৎকার করছেন কেন??
—এই চুপ ,একদম চুম । কথা বলবে না।
—আচ্ছা বলবো না। চলুন রুমে চলুন।
—না আমি কোথাও যাবো না। আমার সব
প্রশ্নের উত্তর চাই ।
—কি প্রশ্ন কিসের উত্তর ?
—যার কাছে প্রশ্ন করবো সেই তো মুখ লুকিয়ে আছে তোমার শ্রদ্ধেয় শ্বশুর।
হঠাৎ ঘড়িতে ঢংঢং করে চারবার ঘন্টা বাজার শব্দ হলো। মেঘ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে চারটা বাজে। তারমানে সৈকত মধ্যে রাতে মদ খেয়ে ফিরে এখন এখানে দাড়িয়ে মাতলামি শুরু করেছে।
মেঘের রাগটা চরমে পৌছে গেল।
—এই আপনার সমস্যা কি??এই মধ্যে রাতে মদ খেয়ে বাসাই ফিরে গলা ছেড়ে চিল্লাচিল্লি করছেন। সারাদিন পরিশ্রম করে সবাই একটু ঘুমাচ্ছে আর আপনি!!??বাবা যদি এখন আপনাকে এ অবস্থায় দেখে তাহলে বুঝতে পারছেন তার মনে কেমন প্রভাব পড়বে?
—এই তুমি কত টাকার মাইনে নেওয়ার চুক্তি করেছ হ্যা। তুমি কার হয়ে এত কথা বলতে এসেছো এখানে?
—মানে কি বলছেন আপনি!!?
—আমি কিছু বুঝিনা ভেবেছো । একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে তুমি। তা জানা সত্বেও চৌধুরী সাহেব তার নিজের স্ট্যাটাস তার সামাজিক সম্মান ভুলে তোমাকে এ বাড়িতে আমার বউ করে এনেছে। নিশ্চয় তার পেছনে বড় কোন কারণ আছে। না এ বিয়েতে তোমার মতামত নিয়েছিল ,না আমার!!
বুঝলাম তুমি এত বড় বাড়ি, গাড়ি,শাড়ি ,গহনা পেয়ে সব ভুলে নিজেকে মানিয়ে নিছ। কিন্তু আমি!!??
সৈকত মেঘ কে এভাবে অপমান করবে মেঘ ভাবতেও পারছে না। মেঘ মনে মনে সৈকত একটু একটু করে ভালবাসতে শুরু করেছিল তা কি সৈকত একটুও বুঝতে পারে নি!!??
আর সৈকত সে সব বুঝবার চেষ্টা না করেই মেঘের ভালবাসা কে পণ্যের দামে বেচে দিল!!??
মেঘের ভালবাসা নাকি বাড়ি ,গাড়ি,শাড়ি আর গহনার জন্যে!!!
মেঘের মনে মনে হাসি পাচ্ছে । খুব হাসি পাচ্ছে। তবে সে হাসিটা জীবনের সবচেয়ে পরাজয়ের হাসি।
তার বাবা তাকে এমন একটা মানুষের সঙ্গে বিয়ে দিল যে তাকে এ কদিনে একটা বারের জন্যে ও বুঝবার চেষ্টা না করে প্রতিনিয়ত উঠতে বসতে অপমান করে চলছে। নিজের ইচ্ছা মত কথা সাজিয়ে কি র্নিদ্বিধায় বলে ফেলছে। একটা বারের জন্য ভাবছে না যে তার এই কথা গুলো অন্যে মানুষটার বুকের মধ্যে এফোড় ওফোড় করে দিচ্ছে।
মেঘ না চাইতেও ওর চোখ দিয়ে দরদর করে পানি ঝরতে লাগলো।
হঠাৎ মেঘ নিজের কাধে কারো স্পর্শে পিছন ফিরে তাকায় ।
—বাবা আপনি? বলে মেঘ নিজেকে সামলে নিয়ে চোখের পানি মুছে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে।
—হ্যা আমি। আমি সব শুনেছি ।
—আপনি কেন শুধু শুধু এই মাঝরাতে উঠে আসতে গেলেন।
চৌধুরী সাহেব আস্তে করে সৈকতের সামনে গিয়ে দাড়ালেন। তারপর সৈকতের পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভাল করে নিরিখ করে দেখে বললেনঃ
—এতদিন আমি তোমার এই কাজ গুলো তোমার আচারন গুলোকে শুধু ছেলে মানুষী ভেবে পাত্তা দেয়নি। ভেবেছি সময়ের সাথে সাথে তুমি পাল্টে যাবে। নিজেকে শুধরিয়ে নেবে ।
কিন্তু ,না।
আমার সে ধারনা ভুল।
মানুষ শুধুমাত্র স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেই তার মন মানসিকতা উন্নত হয় না । সেটা তুমি নিজে প্রমান করলে।
আমার সঙ্গে তোমার মনের ভিতরে যে সব জিনিস নিয়ে দ্বন্দ্ব ,সে সব প্রশ্নের জবাব তুমি ঠিক একদিন পেয়ে যাবে। আর তখন তুমি এই দিনটার জন্য আফসোস করবে। এই ভেবে যে তুমি নিজের মনগড়া কল্পকাহিনী নিয়ে এতদিন পড়েছিলে। কখনও অন্যের মন দিয়ে ভাবার অন্যের চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করো নি।
আচ্ছা সেসব বাদ দিলাম এখন বলো
এই মেয়েটার কি দোষ??
কেন শুধু শুধু তাকে কষ্ট দিচ্ছ? কেন কথায় কথায় ছোট করছো?
শুধুমাত্র এ জন্যেই যে আমি নিজে পচ্ছন্দ করে তাকে এ বাড়িতে বউ করে এনেছি??
সৈকত আর কোন কথা বলতে পারে না। মনে হচ্ছে যেন জোকের মুখে লবণের ছিটে পড়েছে। এতক্ষন যে চিল্লাচিল্লি করে সারা বাড়ি মাথায় তুলছিল আর সে এখন চুপ করে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে।
চৌধুরী সাহেব ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে বললো যা ওকে ঘরে পৌছে দে।
ঝিনুক মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলে সৈকতের কাছে এগিয়ে বললো চল ভাইয়া ঘরে চল।
সৈকত ঝিনুকের হাত সরিয়ে দিয়ে বললো আমার কাউকে লাগবে না। আমি একাই চলে যেতে পারবো।
চৌধুরী সাহেব মেঘের কাছে এসে বললোঃ
—কাঁদিস না মা,দেখবি একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। যে আজ তোর ভালবাসার কোন দাম দিচ্ছে না একদিন সেই সর্বোচ্চ মূল্য দিয়ে তোর ভালবাসা কিনতে চাইবে।
তোর ভালবাসা পাবার জন্য পাগল হয়ে যাবে ।
মেঘ কোন কথা বলতে পারে না। চুপ করে দাড়িয়ে থাকে।
————**——**——**————
মেঘ আর সৈকতের সামনে যায় না।
ঝিনুকে দিয়ে রুম থেকে কাপড় আনিয়ে ঝিনুকে বলেঃ
—আমি যদি তোমার রুম ব্যবহার করি তাহলে কি তোমার সমস্যা হবে?
—কি যে বলো না ভাবি। আমার কেন সমস্যা হবে??
—অনেক ধন্যবাদ ।
—ভাবি এটা ঠিক না। তুমি আমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছ।
আচ্ছা শোন আমি কলেজে যাচ্ছি ফিরে এসে কথা হবে।
মেঘ মাথা নাড়িয়ে সায় দেয়।
ঝিনুক বুঝতে পারে মেঘের মনটা খারাপ । ভাইয়া যে তখন কেন এমন সব কথা বললো কে জানে!!?ঝিনুক ছোট বেলা থেকে খেয়াল করছে সৈকত তার অন্যে দু ভাইয়ের থেকে অনেক আলাদা। সৈকত ঝিনুককে অনেক ভালবাসে । ঝিনুক ও তার দু ভাইয়ের থেকে সৈকত কে অনেক বেশী ভালবাসে । কিন্তু সৈকত যে কেন এমন তা ঝিনুক ও বুঝতে পারেনা।
ঝিনুক চলে যাওয়ার পর মেঘ বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার টা ছেড়ে মন খুলে কাঁদে । এ দিনে সৈকতের দেওয়া ছোট ছোট আঘাত মেঘ ভুলতে বসেছিল কিন্তু আজকের বলা কথা গুলো মেঘের কানের মধ্যে বেজেই যাচ্ছে। এতচেষ্টা করছে মেঘ কথা গুলো ভুলে যাওয়ার জন্য কিন্তু পারছে না।
সারাদিন মেঘ আর রুম থেকে বের হয়না।
শুইয়ে বসে কাটিয়ে দেয় । তার মার ক্লিনিকে বলা কথা গুলো মনে করে খুব কান্না পায় । আর মনে মনে হ্যা আম্মু তুমি ঠিকই বলেছিলে আমি কপাল গুনে এমন একটা স্বামী পেয়েছি তা না হলে কি!!??
মেঘ ওর বাড়ির সবাই কে খুব মিস করতে থাকে। সবার মুখটা মেঘের চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
মেঘের মন চাই একছুটে বাড়ি গিয়ে ওর আম্মুর গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে।
রোজি এসে অনেক বার জানতে চেয়েছে কি হয়েছে কিন্তু মেঘ কিছুই বলেনি। শুধু বলেছে ওর শরীরটা ভাল লাগছে না।
রোজি অনেক জোরাজুরি করে মেঘের মুখে দু-তিন বার খাবার তুলে দিয়েছে ওতটুকুই। নিজ থেকে আর খায়নি।
মেঘ মনে মনে ঠিক করে ওর শ্বশুর রাতে বাসায় ফিরলে অনুমতি চাইবে বাড়ি যাওয়ার জন্য।
মেঘ একটা বারের জন্যেও সৈকতের খোজ নেয় নি। ওর রুমে ও যায় নি।
সৈকত ও মেঘের কোন খোজ নেয়নি। মেঘ বাসায় আছে না রাগ করে চলে গেছে তা সৈকত জানেনা।
————**——**——**————
চৌধুরী সাহেব বাসায় ফিরে আগে মেঘের খোজ করে ।
মেঘ নিজে শ্বশুরের রুমে যায়।
—বাবা আসবো?
—আয় মা ,আয়। বাবার রুমে আসতে কি মেয়ের কোন অনুমতি লাগেরে মা।
—আপনি কোন কাজ করছিলেন কিনা!!?
—জানিস মা এই বাজে অভ্যাস টা আমার কোন দিনও ছিল না,এখন ও নেই। আমি অফিসের কাজ অফিসে করতে ভালবাসি । বাসাকে কখনও অফিস ভাবিনা।
—মেঘ মুখে একটু হাসি টেনে বলে এটা তো খুবই ভালকথা।
—তোর মুখটা এত শুকনা দেখাচ্ছে কেন?সারা দিন না খেয়ে আছিস মনে হয়।
—না বাবা ,আসলে----
হঠাৎ রোজি চায়ের কাপ টেবিলে রেখে বলে। সত্যি বলেছেন বাবা ও আজ সারাদিন ও কিছুই খায়নি। কি হয়েছে তাও কিছু বলছে না। মন খারাপ করে সারাদিন ঘরে বসে ছিল। ওদিকে সৈকতের ও একই অবস্থা।
চৌধুরী সাহেব রোজিকে বললেনঃ
—বড় বৌমা তুমি একটা কাজ করো।
—কি বাবা?
—তুমি চা টা নিয়ে যাও। আমি এখন চা খাব না। তুমি বরং কাউকে দিয়ে আমার আর মেঘ মায়ের খাবারটা রুমে পাঠিয়ে দাও।
রোজি খুশি হয়ে বলে ঠিক আছে বাবা আমি এখনি যাচ্ছি।
রোজি খাবারটা রুমে দিয়ে যায়।চৌধুরী সাহেব খাবার নিয়ে নিজ হাতে মেঘের মুখে তুলে খাইয়ে দেয়। মেঘ ছোট্ট বাচ্চাদের মতো চুপচাপ খাবার খেতে শুরু করে।আর চোখ বেয়ে পানি পড়ে।
চৌধুরী সাহেব বলেঃ
—জানি রাতে সৈকতের ঐ কথা গুলো শুনে তুই অনেক কষ্ট পেয়েছিস। ওর কথায় মন খারাপ করিস না । ও মন থেকে এসব বলেনি। দেখেছিস তো বাইরে থেকে কিসব গিলে এসে ঐভাবে কথা বলছিল।
ওর মনটা না এখনো বাচ্চাদের মতোই রয়ে গেছে। ও যে মন থেকে কি চায় সেটাই ও আজ পর্যন্ত ঠিক করতে পারে না। এখন এটা ভাবে তো আরেকটু পর ওটা।
আমি যেদিন তোকে দেখে ছিলাম সেদিই বুঝেছিলাম তুই ছাড়া আর কেউ ওকে ভাল করতে পারবে না। আমার সৈকতের জন্য যে শুধু তোকে দরকার । তুই ওকে ছেড়ে কোথাও যাস না মা।
—কিন্তু বাবা!!
—কি মা বল।
—আমি কিছুদিনের জন্য বাড়ি যেতে চাই।
—জানি তোর খুব বাড়ির জন্য মন খারাপ লাগছে। কিন্তু মা তুই যদি এসময় বাড়ি যাস তাহলে সবাই অন্য কিছু মনে করতে পারে। তুই এখনও ভাল করে সুস্থ হোসনি এক্ষনি বাড়ি গেলে তোর আব্বু আম্মু কি মনে করবে।
মেঘ ভাবে সত্যিই তো এখন যদি আমি বাড়ি যায় তাহলে সবার মনে অনেক প্রশ্ন জাগতে পারে।
৮.
মেঘ খাবার খেয়ে তার শ্বশুরের রুম থেকে কিছুক্ষন পর চলে আসে ঝিনুকের রুমে।
ঝিনুক বসে বই পড়ছিল। মেঘ কে দেখে বলেঃ
—তুমি এখনও মন খারাপ করে আছো ভাবি?
—আরে না ,
—তুমি কিন্তু মিথ্যা বলছো। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি তোমার মন খারাপ ।
মেঘ কি যেন ভেবে ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে বলেঃ
—আচ্ছা ঝিনুক তুমি আমার একটা উপকার করবে?
ঝিনুক কিছুটা অবাক হয়ে বলেঃ
—কি উপকার ভাবি!!??
—তেমন কিছু না আবার----
—আহঃ হাঃ বলোই না। এত সংকোচ করতেছ কেন?
—না ,সংকোচ না। তবে ভাবছি ।
—এত ভাবাভাবির দরকার নাই। চটপট বলে ফেল।
—আমি তোমার কাছে কিছু জানতে চাই।
—বলো কি জানতে চাও?
—যদি তুমি সঠিক টা জানো তাহলেই উত্তর দিবে । কোন কিছু নিজের ভাবনা থেকে বলবে না। আর হ্যা কেন আমি প্রশ্ন করছি সেটাও জানতে চেও না।
—আচ্ছা বাবা ঠিক আছে। যেটা জানি শুধু সেটাই বলবো। আর তোমাকে ও কোন প্রশ্ন করবো না।
মেঘ একটু সময় নিয়ে বলেঃ
—তোমার মায়ের কোন কথা তোমার মনে আছে?
—না ভাবী । আমার মায়ের কোন স্মৃতি আমার মনে পড়ে না।
—কোন কিচ্ছু মনে পড়ে না?
—না। যখন মা মারা যায় তখন আমার বয়স তিন কি সাড়ে তিন। তবে ভাইয়াদের মুখে শুনেছি,মা যখন মারা যায় তারপর থেকে আমি নাকি মা মা করে খুব কান্না করতাম।
—এখন তোমার বয়স কতো?
—উনিশ ।
—আচ্ছা ভাইয়াদের কাছ থেকে আর কি শুনেছ?
—বুঝলাম না।
—মানে তখন তো তুমি খুব ছোট ছিলে । আমার শ্বাশুড়ী মা মারা গেল তখন তোমাকে দেখাশোনা করতো? আই মিন তোমাদের সবাইকে কে দেখাশোনা করতো?
—বাবা তার এক ফুফু কে এনে রেখেছিল আমাদের বাড়িতে তার নিজের কোন ছেলে মেয়ে ছিল না। বাবা তাকে নিজের মায়ের মত মনে করতো।তিনি সম্পর্কে আমাদের দাদী হতো। ছেলে মেয়ে না হওয়ার কারণে দাদা তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তারপর থেকে সে আমাদের সঙ্গে থাকতো। আর বাবাও তখন খুব মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েছিল। আমাদের কথা চিন্তা করে আমাদেরকে সময় দেওয়ার জন্যে বাবা নাকি রাজনীতি ও ছেড়ে দিতে চেয়েছিল।
—আচ্ছা তোমার ভাইয়াদের বয়সের পার্থক্য কেমন?
—বড় ভাইয়ার থেকে মেঝ দু বছরের ছোট। আর মেঝ ভাইয়ার থেকে সৈকত ভাইয়া আরো দু বছরের ছোট।
—আর তুমি সৈকতের থেকে পাঁচ বছরের ছোট তাইতো?
—হ্যা।
মেঘ মনে মনে একটা হিসাব করে ।
—সৈকতের বয়স যখন আট তখন মা মারা যায়?
—হ্যা।
—আচ্ছা তোমরা কি সবাই এক সঙ্গে থাকতে?
—না। বড় আর মেঝ তখন বাইরে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করতো। আমি আর সৈকত ভাইয়া বাড়ি তে থাকতাম।
—ও। আর মা মারা যাওয়ার পরে??
— মা মারা বাবা বড় আর মেঝ কে বাসায় নিয়ে চলে আসে । যাতে সবাই একসঙ্গে থাকলে মন খারাপ না হয়।
—আচ্ছা আমার শ্বাশুড়ী মা কেমন ছিলেন??
—হুম। বাবার মুখে শুনেছি মা নাকি অনেক ভাল ছিলেন। অনেক সংসারী ছিলেন। অনেক হিসেবি ও ছিলেন। নিজের সংসারের কোন জিনিস তিনি নষ্ট বা বেহাত হতে দিতেন না। আর বাবা নাকি তখন একটু বেহিসাবী ছিলেন। নিজের ইচ্ছামত ঘুরতেন ফিরতেন। নিজের কাজটাকে বেশি ভালবাসতেন।
—আচ্ছা এ কথা গুলো তুমি কার কাছ থেকে শুনেছো??
—বাবা নিজের মুখে বলতেন। এখনও বলে মাঝেসাঝে ।
—আর তোমাদের সে দাদী??
—মা মারা গেছে ষোল বছর। দাদী আমাদের সঙ্গে একসাথে সাত/আট বছর ছিল। তারপর বাবা ভাল ছেলে দেখে দাদীর দ্বিতীয় বিয়ে দেন ।দাদী কে সৈকত ভাইয়ার পচ্ছন্দ হতো না। সবসময় রেগে কথা বলতো। একদিন দাদী মা কে নিয়ে কি যেন বলেছিল ভাইয়া রেগে দাদীর মাথায় দূর থেকে গুলতি দিয়ে ইটের টুকরা মেরেছিল। দাদীর কপাল কেটে অনেক রক্ত বেরিয়ছিল।
—তারপর!!?
—তারপর বাবা যখন ফিরে সব জানতে পারে তখন ভাইয়াকে দুই টা চড় মেরেছিল । ভাইয়া ঙ্গান হারিয়ে ফেলে। আর দাদীকে ও বাবা কি যেন বলেছিলেন। তারপর থেকে উনি যতদিন আমাদের সঙ্গে ছিলেন মা কে নিয়ে কোন কথা বলতো না।
—আচ্ছা তোমার সে দাদীর কোন খবর জানো??
—না।
— উনি কি বেচে আছেন?? নাকি----
—মনে হয় বেচে আছে। তা না হলে নিশ্চয় বাবার মুখে তার মারা যাওয়ার সংবাদ শুনতাম।
—তোমাদের তার সঙ্গে আর দেখা হয়নি??
—না । আর দেখা হয়নি।
—আচ্ছা আরেকটা কথা।
—কি কথা বলো?
—তুমি যে একটু আগে বললে বাবা শ্বাশুড়ী মা মারা তোমাদের জন্য রাজনীতি ছেড়ে দিতে চেয়েছিল,তারপর কি হলো?? উনি তাহলে রাজনীতি তে এখনও জড়িয়ে আছেন কি করে??
—বাবা রাজনীতি থেকে নিজের নাম কেটে দিয়ে এসেছিল। পার্টি অফিসে ইস্তাফা জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু যখন এটা সবাই জানাজানি হয়ে গেল তখন বাবার দলের লোকেরা সাধারণ জনগন যারা বাবাকে মম থেকে ভালবাসতো তারা এক হয়ে সব অনশন শুরু করে। বাবা রাজনীতি খুব ভাল বুঝতো। আর তারচেয়ে বড় কথা উনি সকল পেশার সকল শ্রেণীর লোকদের ভালবাসতেন আর এখন ও বাসেন। বাবাকে শুধু নিজের দলের লোকেরাই না ,বিরোধী দলের লোক ও খুব ভালবাসে , শ্রদ্ধা করে, সম্মান করে।
ঝিনুকের কথা শুনে মেঘের মনে আরো অনেক প্রশ্ন উুঁকি দিতে শুরু করে।
কিন্তু এর বেশী প্রশ্ন এখন ঝিনুক কে করা ঠিক হবে না বলে চুপ করে থাকে।
—কি হলো চুপ হয়ে আছো যে?
—না এমনি।
—তোমার প্রশ্ন করা শেষ?
—হ্যা,আজকের মত।
—তাহলে আমি এখন স্টাডি রুমে গিয়ে একটু বই নিয়ে বসি । কাল আমার একটা পরীক্ষা আছে। তুমি লাইট অফ করে ঘুমিয়ে পড়ো।
—এখানে পড়ো আমার সমস্যা হবে না।
—না ভাবী তুমি একটু ঘুমাও। তোমার এখন ঘুমের খুব প্রয়োজন । আমি পড়া শেষ করে তারপর আসবো।
—আচ্ছা ঠিক আছে। তবে বেশী রাত জেগে থেকে না যেন।
—ঠিক আছে।
ঝিনুক নিজের বই নিয়ে বের হওয়ার জন্য দরজার কাছে পৌছাতে মেঘ বলেঃ—ঝিনুক শোন।
—হ্যা ভাবী বলো।
—আচ্ছা তোমার ভাইয়ার কি কোন পচ্ছন্দ করা মেয়ে আছে??
—ইউ মিন ভাইয়ার কোন মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আছে কিনা??
মেঘ কাপাকাপা কন্ঠে বলেঃ
—হ্যাঁ ।
ঝিনুক কপাশ টা ভাজ করে একটু ভেবে বলে আমি এটা শিওর হয়ে তোমাকে কিছু বলতে পারছি না। কারণ আমি ঠিক সঠিক ভাবে কিছু জানি না। তবে ভাইয়া ভার্সিটি তে পড়ার সময় অনেক মেয়ে যে ভাইয়া কে পচ্ছন্দ করতো তা জানি।
অনেকে লাইন মারার জন্য আমার সঙ্গেও যোগাযোগ করতো । কিন্তু----
মেঘ একটু জোরের সাথেই বলে
—কিন্তু কি!!?
—আমি ভাইয়ার সামনে কোনদিন কোন মেয়ের সম্পর্ক সাফাই গাইতে পারিনি। ভাইয়া আমাকে যেমন ভালবাসে আমি ঠিক তার থেকে দ্বিগুণ ভাইয়া কে ভয় ও পায়।
—আচ্ছা তুমি এখন যাও। আমি নিজেই না হয় এটা জেনে নেয়ার চেষ্টা করবো।
—ওকে ভাবী।
ঝিনুক চলে যেতেই মেঘ লাইট অফ করে শুইয়ে পড়ে। মাথার মধ্যে তার হাজার টা
প্রশ্ন কিলবিল করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু হিসাব মেলাতে পারছে না কোনটার।
সৈকত তার মায়ের মৃত্যুর জন্য কেন তার বাবাকে দোষী মনে করে!??
মেঘ মনে মনে একটা হিসাব করে তার শ্বশুরের বয়স এখন পঞ্চাশ কি পঞ্চান্ন বছর । এখন থেকে আরো ষোল বছর আগে শ্বাশুড়ী মা মারা যায়। তখন তার বয়স ছিল ৩৪/৩৯ বছর।
মেঘ ভাবে।
আচ্ছা একটা মেয়ে বারো বছর সংসার করে চার সন্তানের জননী হয়ে কোন পর্যায়ে গিয়ে সুইসাইডের মত এত জঘন্যতম পথ টা বেছে নেই!!??
মানুষ কখন সুইসাইডের কথা ভাবতে পারে!!?
মেঘ ঠান্ডা মাথায় ভাবতে থাকে। কি হতে পারে । কেন মা তার এত সুন্দর সাজানো গোছানো সংসার ,তার স্বামী সন্তান রেখে
ঐরাকম এক যন্ত্রণাময় মৃত্যু কে আলিঙ্গন করে নিল।
মেঘ প্রথম দিন সৈকতের মুখে শুনেছিল তার মা গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে ছিল। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল কিন্তু তিনি মুখে একটা শব্দ ও করেন নি।
তাহলে কি তার বুকের ভিতরে আগুনে শরীর ঝলসে যাওয়ার থেকেও বড় কোন যন্ত্রণা ছিল!!??যার জন্য এমন একটা পথ বেছে নিয়েছিলেন।
সে যন্ত্রণাটা কি হতে পারে ??
তাহলে কি ---??
না না এ আমি কি ভাবছি!!?
ঝিনুকের কথা অনুযায়ী আর নিজের চোখে বাবাকে এ’কদিনে বাবাকে যতটুকু দেখেছি চিনেছি তাতে সে নিজের মানুষ নিজের পরিবার ছাড়া তৃতীয় কোন ব্যক্তিকে তার জীবনে ভালবাসাতে পারে না। আর তার যদি সত্যি অন্য কোন মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতো তাহলে শ্বশুড়ী মা মারা আর কেন বিয়ে করলো না??
তাহলে কি হতে পারে ??
উুহ আর ভাবতে পারছি না।
তাহলে কি শ্বাশুড়ী মায়ের নিজের কোন ভুল ছিল??
তাও তো না। মা নাকি খুব ভাল মানুষ ছিলেন । নিজের স্বামী ,সন্তান আর সংসারকেই তিনি ভালবাসাতেন।
মেঘ বিছানা থেকে উঠে পায়চারি করে আর ভাবে । কোথাও না কোথাও সমস্যা একটা আছেই। তা না হলে এমন হবার কথা নয়। মায়ের মৃত্যুর পিছনে নিশ্চয় বিশেষ কোন কারণ আছে । তা না হলে অন্যে কোন রহস্য লুকিয়ে আছে এ মৃত্যুর পিছনে।
কিন্তু সেটা কি??
না এ মুহূর্তে আর আমার বাড়ি যাওয়া চলবে না।
এখানে থেকে আমাকে সবটা জানতে হবে। যতদিন না সৈকত আর বাবার মধ্যে সৃষ্ট ব্যবধানের কারণ টা জানতে পারছি ততদিন আর শান্তি নেই।
সৈকত আমাকে ভালবাসুক আর না বাসুক ওর পাশে থেকে আমাকে সব জানতে হবে। ওর মুখ থেকেও আমাকে আরো কিছু জানতে হবে।
ধূর এতক্ষন তো ভালই ছিলাম হঠাৎ সৈকতের কথা মনে হতেই বুকের ভিতরটা কেমন করে মোচড় দিয়ে উঠলো।
আচ্ছা এই মানুষটাই বা এমন কেন।
ও যত বেশি আমাকে কষ্ট দিচ্ছে আর আমি ততই যেন ওর দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়ছি। ও কি একটু ও আমাকে ভালবাসে না। আমি কি এতটাই বাজে দেখতে!!?
না দেখতে তো খারাপ নই। দেখতে যদি খারাপ হতাম তাহলে নিজের এলাকার ছেলে গুলো কেন আমার পিছনে লাইন মারতো। কথা বলার জন্য পাগল হয়ে যেত। আর রাকিব !?? রাকিব ই বা কেন তাহলে আমার জন্য হাতের শীরা কেটে সুইসাইড করতে গিয়েছিল!!?
মেঘ নিজের মাথায় নিজে একটা চড় দিয়ে বলে কোন ভাবনায় ছিলি আর কোথায় হারিয়ে গেলি।
সৈকত যেমন রহস্যময় তেমনি এ বাড়ি টিও পুরো রহস্য দিয়ে ঘেরা।
তবে সব রহস্য আমি উদঘাটন করেই ছাড়বো। আর ওই চেনা আচেনার মাঝে থাকা লোকটা কেও আমি জয় করেই ছাড়বো।
মেঘ শুয়ে পড়ে আর হারিয়ে যায় ঘুমের রাজ্য । আর সেখানে গিয়েও স্বপ্ন দেখে তার ভালবাসার মানুষ টিকে নিয়ে।
————**——**——**————
সকালে সবাই নাস্তা শেষ করে অফিসে চলে গেছে। ঝিনুক ও কলেজে। ডলি তো দিনে বাসাই থাকে না। মেঘ তাকে সেই দিন দেখেছে তারপর আর তার দেখা হয়নি। রোজি ও একটু আগে অনি কে সঙ্গে নিয়ে কোথায় যেন গেছে।
সৈকত হয়তো নিজের রুমে আছে আর নই সেও বেরিয়েছে।
মেঘ আর সৈকতের কোন খোজ নেই নি। ইচ্ছা করে তার ঘরে ও ঢোকে নি।
মেঘ দূরে থেকে বুঝতে চাই আসলে সৈকতের ওর উপর কোন টান আছে কি না!!
মেঘ বসে ভাবছে কি করা যায় কোথা থেকে কি শুরু করবে কিছু বুঝতে পারছে না।
কাজের লোক গুলো যার যার মত কাজ করছে।
মেঘ উঠে দাড়ায় । সারা বাড়িটা তার ভাল করে দেখা দরকার।
যে ভাবা সেই কাজ।
মেঘ সারা বাড়িটা মন দিয়ে অনেক সময় নিয়ে ঘুরে ঘুরে খুটায় খুটায় দেখে । কিন্তু না কোথাও তার শ্বাশুড়ী মায়ের কোন ছবি নেই।
সৈকত যে পরিমাণ তার মাকে এখনও ভালবাসে । তাতে করে এ বাড়িতে কোথাও না কোথাও তার মায়ের পুরাতন কিছু স্মৃতি থাকার কথা । কিন্তু নেই কেন!!?
মেঘের মনে অনেক প্রশ্ন কিন্তু উত্তর মিলছে না এক টার ও।
কি করবে??
না আর ভাবা যাবেনা এতকিছু।
মাথার শিরা গুলো কেমন ব্যথা করতে শুরু করেছে।
————**——**——**————
চৌধুরী সাহেব রাতের খাবার খাওয়ার সময় মেঘ কে ডেকে মেঘের হাতে একটা খাম তুলে দেয়।
—কি বাবা এটা??
—খুলে দেখ ।
মেঘ খাম খুলে দেখে দুটো এয়ার টিকিট ঢাকা টু সিলেট।
মেঘ অবাক হয়ে বলে বাবা এটা কেন??
—তুই আর সৈকত আগামীকাল রাতের ফ্লাইটে ওখানে যাবি। ওখানে আমার একটা বাঙ্গলো তোদের জন্য বুক করা আছে সেখানে গিয়ে দু চার দিন থেকে সব ঘুরে দেখে আসবি মন টা ভাল লাগবে।
—কিন্তু বাবা---
—কোন কিন্তু না। আমি সৈকত কে বলে দেব।
বলতে না বলতেই সৈকত বাসায় ঢোকে ।
মেঘ সৈকত কে দেখে মাথা নিচু করে অন্য দিকে সরে দাড়ায় ।
চৌধুরি সাহেব সৈকত কে ডেকে বলেঃ
—নিজের ব্যাগ গুছিয়ে রেখ। আগামিকাল মেঘ মা কে সঙ্গে নিয়ে সিলেট যাবে।
—না আমি যেতে পারবো না।
—কেন কি এমন কাজ করো তুমি ?যে যেতে পারবে না। নিজের অফিসেও তো ঠিকমত বসো না। আমি আছি বলেই তোমার সব কিছু চলছে। আর আমি যখন থাকবো না তখন বুঝবে পৃথিবী টা কত কঠিন জায়গা। নিজের স্বার্থে মা ও কখনো সন্তানের কথা ভাবে না। আর তুমি তো------
কথা গুলো বলতে চৌধুরী সাহেবের আজ কেন যানি গলাটা বুজে এলো।
মেঘ পাশ থেকে বললোঃ
—বাবা থাক না। কেউ যখন যেতে চাইছে না তখন জোর করার দরকার নেই। কারো উপর কোন জিনিস না চাপিয়ে দেওয়ায় ভালো। আর তাছাড়া আমার উনাকে নিয়ে কেন যানি ভরসা পায় না।
সৈকত মেঘের কথা শুনে আড়চোখে মেঘের দিকে তাকায় । মেঘ দেখেও সেটা না দেখার ভান করে দাড়িয়ে থাকে।
—হুম । তুই ঠিকই বলেছিস। ওকে ভরসা করা যায় না। তাহলে কি করি বলতো??
ভরসার কথা শুনে সৈকতের ইগোতে একটু আঘাত লাগলো।
—আচ্ছা ঠিক আছে আমি আমার ব্যাগ টা গুছিয়ে রাখবো । বলেই দ্রুত ওখান থেকে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।
চৌধুরী সাহেব মেঘের দিকে তাকিয়ে বললো তোর ওষুধে কাজ হয়েছে।
—বাবা আমার একটা কথা ছিল।
—বল কি কথা।
—আমি ট্রেনে যেতে চাই।
—কেন?
—আমার ট্রেনে জার্নি করতে ভাল লাগে।
— আচ্ছা ঠিক আছে।
—আরেক টা কথা।
—কি?
—ঝিনুক ও আমাদের সঙ্গে যাক।
রোজি এসে বললো হ্যা বাবা ঝিনুক ওদের সঙ্গে যাক। বোঝেনইতো সৈকতের কোন কান্ডঙ্গান নেই । কোথায় কি করবে তার কোন ঠিক নেই।
আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে ঝিনুক কে ওর কোন ফ্রেন্ড কেও সঙ্গে নিতে বলো। আর যাবার ডেট আমাকে বলো। আমি ট্রেনের দুটো কেবিন বুক করে রাখবো।
আচ্ছা বাবা।
চৌধুরী সাহেব খাওয়া শেষ করে উঠে যায়----------
৯.
দিন তারিখ ঠিক করে মেঘ চৌধুরী সাহেব কে জানিয়ে দিল। চৌধুরী সাহেব তাদের জন্য সবচেয়ে সেরা দুটো কেবিন বুকিং করে দিলেন।
আজ মেঘ দের সিলেট যাবার দিন।
মেঘ ও ঝিনুক নিজেরদের জিনিস গুছিয়ে রেডি হয়ে হল বসে সৈকতের জন্য অপেক্ষা করছে । নয়টাই ট্রেন ছাড়ার কথা। এখন আটটা বেজে পনেরো মিনিট । বাসা থেকে স্টেষন পৌছাতে বিশ থেকে ত্রিশ মিনিট সময় লাগে।
কিন্তু সৈকতের আর দেখা নেই।
ঝিনুক সকালে সৈকত কে ঘুম থেকে ঢেকে দিয়ছিল রেডি হওয়ার জন্য কিন্তু কি করছে কে জানে। মেঘের মনে মনে খুব রাগ হতে শুরু করলো। না জানি আজ যাওয়াটা কেনসেল করতে হয়।
ঐদিনের পর মেঘ আর সৈকতের সাথে কোন কথা বলেনি। এমনকি খুব বেশী সামনেও যায় নি। মনে মনে ভেবে ছিল সৈকত হয়তো তার ভুল টা বুঝতে পেরে তার কাছে এসে অন্তত আগে কথা বলবে। কিন্তু না। সৈকতের মত মানুষের কাছ থেকে এমনটা আশা করাও ভুল।
মেঘ ঝিনুককে বললো তোমার সে ফ্রেন্ড কোথায় ?
—ভাবি মিতু স্টেশনে ঠিক সময় মত পৌছে যাবে তুমি চিন্তা করো না।
—আর চিন্তা!!চিন্তা তোমার ফ্রেন্ড কে নিয়ে না। তোমার ভাইয়া কে নিয়ে । দেখ আজ নিশ্চিত তার জন্য আমরা ট্রেন টা মিস করবো।
হঠাৎ টমি ঘেউ-ঘেউ করতে করতে উপর থেকে নীচে নেমে এসে মেঘ এর কাছে এসে দাড়াল।
—কি হয়েছে এমন করছিস কেন??
তোর মালিক কই সেকি যাবে না ??
সিড়িঁতে পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল।
মেঘ তাকিয়ে দেখে সৈকত নীচে নামছে। সৈকতের দিকে তাকিয়ে যেন মেঘের চোখ আটকে গেল। একে ফর্সা মানুষ তার উপর কালো শার্ট আর নীল রঙের জিন্স!! উুহঃ সেই রকম মানিয়েছে।
মেঘ সৈকতকে দেখে আবার প্রেমে পড়লো। মেঘের মনে যে লাড্ডু ফুটলো সেটা মেঘ আর বাইরে প্রকাশ করলো না। নিজের মনের মধ্যেই রেখে দিল সঠিক সময় আর স্থানের জন্য।
সৈকত আড় চোখে মেঘকে একনজর দেখে ও না দেখার ভান করে ঝিনুককে বললো কিরে যাবি না বাসায় থাকবি??
রোজি এসে বললো এই দাড়া । শুভ কাজে যাচ্ছিস একটু মিষ্ট মুখ করে যা।
মেঘ অবাক হয়ে বললোঃ
—ভাবি যাচ্ছি ঘুরতে এখানে শুভ কাজ কি করে এলো!!?
—হুম শুভ কাজই তো। শোন এই চার দেয়ালের মধ্যে এতদিন যা হয়েছে সব ভুলে যা। বাইরে যাচ্ছিস দুজন মিলেমিশে থাকবি। ঘুরে বেড়াবি আনন্দ করবি। ওখানে গিয়ে ও যেন এরাকম মন খারাপ করে থাকবি না।
—ভাবি তুমি এমন ভাবে বলছো মনে হচ্ছে সবটাই আমার দোষ ??অন্যে কারো কিছু না!!?
—ধুর পাগলী তা হতে যাবে কেন?
আর শোন।
—হুম বলো।
—জোরে বলা যাবেনা। আস্তে বলতে হবে শুধু তোকে।
মেঘ একটু এগিয়ে এসে বললোঃ
—এবার বলো।
রোজি মেঘের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কি জেন বললো।
মেঘ লজ্জা পেয়ে বললো ভাবি তুমি না----------
হঠাৎ সৈকত বললোঃ
— তোমাদের কথা কি শেষ হয়েছে?যদি হয় এবার গাড়িতে উঠতে হবে । সময় অল্প।
রোজি মেঘ আর ঝিনুকের মুখে একটু করে পায়েস দেয়। সৈকতের মুখে দেওয়ার সময় বললো শোন সম্পূর্ণ নতুন জায়গায় যাচ্ছিস। অচেনা সবকিছু ,অজানা পরিবেশ। ওখানে গিয়ে একদম পাগলামি করবি না। ওদের সবার খেয়াল রাখবি, দেখে রাখবি। সবসময় ওদের সাথে সাথে থাকবি।
—আচ্ছা ।
মেঘ আর ঝিনুক বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো সাথে টমি ও।
ঝিনুক বললোঃ
— ভাইয়া টমি কি যাবে আমাদের সঙ্গে??
—হ্যা যাবে।
টমিকে গাড়িতে উঠিয়ে
সৈকত এসে সামনে ড্রাইভারের পাশে সিটে বসে আবার কি মনে করে ড্রাইভার কে সরিয়ে নিজের জায়গা দিয়ে নিজে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসলো।
গাড়ি চলতে শুরু করলো।
মেঘের ফোনটা বেজে উঠলো শ্বশুর ফোন করেছে। ফোনটা রিসিভ করতেইঃ
—কিরে মা কোথায় তোরা?
—এই তো বাবা কেবল গাড়ীতে উঠলাম।
—আচ্ছা তাড়াতাড়ি আয় ।
—চিন্তা করতে হবে না। ঠিক পৌছে যাব।
—আচ্ছা।
গাড়ি যখন স্টেশনে পৌছাল তখন নয় টা বাজতে আর পাচ মিনিট বাকি।
গাড়ি থামানোর সঙ্গে সঙ্গে স্টেষন থেকে দু তিন জন লোক ছুটে এসে গাড়ি থেকে লাগেজ গুলো নিয়ে কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল।
মেঘ দেখলো তার শ্বশুর তাদের কেবিনের বাইরে দাড়িয়ে আছে।
মেঘ ছুটে গিয়ে বললোঃ
—মনে মনে খুব খারাপ লাগছিল । যাবার সময় একটা বারের জন্য আপনাকে দেখতে পারলাম না তাই।
চৌধুরী সাহেব মুচকি হেসে বললেনঃ
—মা মনে করবে আর ছেলে এসে হাজির হবে না তা কি কখনও হয় !!?
—মেঘের চোখে আনন্দে পানি এসে গেল।
—কোথাও যাবার আগে কাদতে নেই।
সৈকত কোন কথা না বলে কেবিনে গিয়ে বসলো। ঝিনুক তার বাবার সঙ্গে একটু কথা বলে মিতু কে নিয়ে ওদের কেবিনে চলে গেল।
চৌধুরী সাহেব মেঘের মাথায় হাত রেখে বললেনঃ
— দোয়া করি মা তোর সব ইচ্ছা যেন পূরণ হয়।
—জানিনা বাবা কি হবে?তবে খুব ভয় করছে। জানিনা আপনার ছেলে ওখানে গিয়ে আবার কিছু করে না বসে।
—ভয় নেই । তুই নিশ্চিন্ত মনে যা।
চৌধুরী এদিক ওদিক তাকিয়ে বললেন
—সৈকত কোথায় গেল ?ওকে তো দেখছি না।
—বাবা আপনার ছেলে মনে কেবিনের ভিতরে আছে।
—ঠিক আছে তুই এখানে একটু দাড়া। আমি ওর সঙ্গে কিছু কথা বলে আসি।
—আচ্ছা।
চৌধুরী সাহেব সৈকতের সঙ্গে কথা বলে বেরিয়ে এলেন।
ট্রেন হুইসেল বাজালো। এখনি ট্রেন ছাড়বে।
চৌধুরী সাহেব মেঘ ছেলেটার খেয়াল রাখিস জানি আমি না বললেও তুই ওর খেয়াল রাখবি তারপরও বললাম। কিছু হলে আমাকে ফোন করবি বলে বিদায় জানালেন।
মেঘ হ্যা সূচক মাথা নেড়ে ট্রেনে উঠলো।
মেঘ ট্রেনে উঠতেই ট্রেনটা ছেড়ে দিল।
মেঘ হাত নাড়িয়ে শ্বশুর কে বিদায় দিয়ে কিছুক্ষন দরজার কাছেই দাড়িয়ে যতক্ষন তার শ্বশুর কে দেখা গেল। মেঘ মনে মনে ভাবে নিজের বাবা,মা,ভাইয়ের পর মনে হয় এই মানুষটা আমাকে সবচেয়ে বেশী ভালবাসে । নিজের মেয়ের জন্য মনে হয় এতটা ভাবেন না। যতটা আমাকে নিয়ে চিন্তা করে ,আমাকে নিয়ে ভাবে। আমি কি সত্যিই এই মানুষটার কথা রাখতে পারবো। আমি কি সত্যি সৈকত কে আমার ভালবাসায় বেধে রাখতে পারবো। পারবো ওর মনে নিজের জন্য একটু জায়গা করে নিতে !!?
পারবো কি ওর মনে আমার জন্য ভালবাসা জাগাতে।
এগুলো ভাবতেই মেঘের বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
নিজর জন্য কিছু না পারলেও আমাকে যে বাবার জন্য কিছু না কিছু পারতেই হবে। তার যে অঘাধ বিশ্বাস আমার উপর।সেই বিশ্বাস টা আমি কিছুতেই ভাঙ্গতে দিব না।
সৈকত আর বাবার মাঝে সৃষ্ট দেওয়াল আমাকে ভাঙ্গতেই হবে। যে করেই হোক সব রহস্যের সমাধান আমাকে করতেই হবে। সিলেট থেকে ফিরে এসে আমাকে কাজে লেগে পড়তে হবে।
#১ম_পর্বের_কথা_মনে_না_থাকলে_বুঝতে_অসুবিধা_হবে।
মেঘ কেবিনে ঢুকে দেখে সৈকত চোখ বন্ধ করে হেলান দিয়ে বসে আছে। আর টমি পাশে শুয়ে ঝিমাচ্ছে।
আচ্ছা ট্রেন টা ছেড়ে দেওয়ার পর ও এতক্ষন পরও যে আমি কেবিনে আসি নি । তাতে কি উনার আমার জন্য একটুও চিন্তা হয়নি!!?
আমি কোথায়?আদেও ট্রেনে উঠতে পারলাম কিনা??
ধুর কাকে নিয়ে কি ভাবছি!!?
এই মানুষটা যে কি দিয়ে তৈরি তা উপরওয়ালা ভাল জানে??
মেঘ কোন কথা না বলে চুপচাপ নিজের সিটে গিয়ে বসে।
হঠাৎ সৈকত বলেঃ
—কোথায় ছিলে এতক্ষন?
মেঘ সৈকতের কথায় অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকাই। সৈকত এখনো আগের মত চোখ বন্ধ করেই আছে তাহলে কি করে বুঝলো যে সে এখানে!!?
—আমি কিছু জানতে চেয়েছি।
মেঘ বলেঃ
—দরজার কাছে দাড়িয়ে ছিলাম। কেন!!?
—এমনি। অনেক্ষন তো ট্রেন ছাড়লো কিন্তু তোমাকে দেখছিলাম না তাই।
—তাতে আপনার কি??আমি আসলে কি আর না আসলেই বা কি!!?আপনি কি কখনও আমার জন্য ভাবেন?
—------------।
—কি হলো কথা বলেছেন না কেন??নাকি আবার আপমান করবেন তাই খুজচ্ছিলেন। এ কয়দিন নিশ্চয় মনে মনে আরো অনেক কিছুই আমার হজম হবে না তেমন অনেক কথায় জমিয়ে ফেলছেন??
—একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না??
—বেশি??ও রিয়েলি!!?হা হা হা। আপনার মনে হয় আমি বেশী বলছি??
—এমনটা না করলেও পারতে।
সৈকতের এই ন্যাকামি কথা শুনে
মেঘের রাগ আস্তে আস্তে বাড়তে শুরু করলো।
নিজের সিট থেকে উঠে সৈকতের সামনে এসে বললোঃ
—কি করেছি আমি??
—এই যে শুরু করলে।
—খুব লাগছে না??আর আপনি যখন শুরু করেন তখন!!?
—সেদিন রাতে তোমাকে অনিচ্ছাকৃত ভাবে যা বলে ছিলাম তার জন্য আমি সরি।
—সরি!!জাস্ট সরি!!?
এবার সৈকতের হুট করে রাগ হয়ে গেল। রেগে বললোঃ
—তাহলে কি চাও??আমি তোমার পায়ে ধরি ?পা ধরে ক্ষমা চাই?যদি তাই চাও তাহলে ঠিক আছে এই যে ,বলে সৈকত
উঠে মাথা নিচু করতে গেল।
সৈকতের কান্ড দেখে মেঘের রাগে শরীর জ্বলতে শুরু করলো । দ্রুত ওখান থেকে সরে গিয়ে আবার নিজের সিটে গিয়ে বসলো। মনে মনে ভাবেছে
কথা বলাই ভুল হয়েছে। এই মানুষটার সাথে যত কম কথা বলা যায় ততোই ভাল। তাই দূর দৃষ্টি দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে । আর নিজের ভাগ্যের কথা ভাবছে।
সৈকত তার স্যুটকেস থেকে বোতল বের করে ঢকঢক করে খাওয়া শুরূ করলো।
কিছুক্ষনের মধ্যে পানির বোতলের সব পানি ও শেষ হয়ে গেল।
মেঘের দিকে তাকিয়ে জিঙ্গাসা করলো তার কাছে কোন পানি আছে কিনা?
মেঘ মাথা নাড়িয়ে না বলে দিল।
—এখন কি করি?আমার নেশা টাও তো তেমন হলো না।
—এতই যখন নেশার দরকার তাহলে বসে আছেন কেন?
—তাহলে কি করবো?
—বোতল নিয়ে বাথরুমের ট্যাপ থেকে পানি নিয়ে আসুন।
সৈকত চোখ বড় বড় করে বলে কি বললে তুমি !!?
—কেন শুনতে পান নি? আবার বলবো?
—এই তুমি জানো বাথরুমের পানিতে কত জীবাণু থাকে?
—না জানিনা। আর জানার প্রয়োজনও মনে করি না।
কথা বলতে বলতে ট্রেন টা একটা স্টেশনে এসে দাড়াল।
ট্রেন থামতেই সৈকত বললোঃ
—ঠিক আছে জানতে হবে না। তাহলে একটা কাজ করো।
—কি কাজ!!?
—ঐই যে বাইরে দোকান দেখা যাচ্ছে তুমি দোকানে গিয়ে একটা মিনারেল পানির বোতল নিয়ে আসো।
—কি ??আমি!!হুম। আমি যাবো পানি আনতে??তাও আবার আপনার মদ খাওয়ার জন্যে??মোটেও না। পারবোনা আমি। পারলে নিজে গিয়ে নিয়ে আসুন।
—ওকে ঠিক আছে। তবে আমি না ফিরে আসলে কিন্তু আমার দোষ না।
—মানে??
—মানে কিছু না। আমি গেলাম বলে সৈকত উঠে চলে গেল।
টমি টা এতক্ষন ট্রেন চলার তালে তালে ঘুমাচ্ছিল। ট্রেন থামতেই ওর ঘুমটা ভেঙ্গে গেল।
মেঘ ফোনটা বের করে ওর আম্মুর সাথে আর ভাইয়ের সাথে কথা বলে।
তারপর রোজির নম্বরে ফোন দিয়ে কথা বলতে বলতে হঠাৎ ট্রেন ছাড়ার শব্দ হয় । মেঘ দ্রুত ফোনটা রেখে দরজার কাছে গিয়ে দাড়ায় সৈকত কে দেখার জন্য। ততক্ষনে ট্রেনের গতি বাড়তে শুরু করছে।
মেঘ এখন কি করবে বুঝতে পারছে না।
হতোচ্ছড়া বর টা যে সত্যিসত্যিই এরাকাম করবে মেঘের বিশ্বাস হচ্ছে না।
যা বলে ছিল “যদি আসতি না পারি”
সেটাই করলো। ফোন ও ব্যবহার করে না যে একটা ফোন করবে।
হঠাৎ ইমাজেন্সি চেন টানার কথা মনে পড়ে। চেন টানতে যাবে তখনই পেছন থেকে সৈকতের কন্ঠ শুনতে পায়ঃ
—কি?? তাহলে নিজের স্বামীর থেকে সিকিউরিটি বড় তাইনা???
মেঘ কোন কথা না বলে বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে সৈকতের দিকে চেয়ে থাকে।
—কি হলো মুখে তালা কেন?
—আপনি জানেন আমি কতটা টেনশনে ছিলাম?
—হা হা হা। সেটা কি আমি করতে বলেছি ??
—আমি বুঝতেই পারছিলাম না যে কি করবো। আর আপনার ফোন ও নেই যে ফোন করবো।
—আমার জন্য কিছু না। সব তোমার নিজের জন্য।
—মানে!!?
—এত দুঃশ্চিন্তা হচ্ছিল সেটা আমাকে নিয়ে না। তোমার নিজের জন্য দুঃশ্চিন্তা হচ্ছিল। কারণ এখানে তো আমাকে সিকিউরিটি হিসাবে পাঠানো হয়েছে। তাই হয়তো তুমি-------
—আপনি না আসলেই একটা--------
—জানি তা আর বলার দরকার নেই।
—এরাকম একটা পরিস্থিতিতে পড়লে সেদিন বুঝবেন। তার আগে না।
সৈকত আর মেঘের কোন কথায় কান না দিয়ে নিজের মত করে আবার বোতল আর পানিতে মন দিল।
মেঘ চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষন নিজের ভাবনায় ডুব দিল।
হঠাৎ দুড়ুম করে শব্দ হল। শব্দ টা কানে যেতেই মেঘ চোখ খুলে দেখে সৈকত নীচে পড়ে আছে।
মেঘ উঠে গিয়ে সৈকত কে আস্তে করে আবার সিটে তুলে দিয়ে নিজের জায়গায় এসে বসে।
আরেকটু পরে আবার সৈকত দুড়ুম করে পড়ে যায় ।
মেঘ আর সৈকতকে তুলে না দিয়ে চুপচাপ নিজের জায়গায় বসে থাকে। কারণ সৈকতের এখন যে অবস্থা তাতে তুলে দিলে আবার পড়ে যাবে। আর তখন হাত অথবা ঘাড়ে আঘাত লাগার সম্ভাবনা বেশী।
পর্ব৪
১০.
মেঘ দের সিলেট পৌছতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল। স্টেশন থেকে গাড়িতে করে বাঙ্গলোয় পৌছাতে আরও কিছু সময় পেরিয়ে গেল।
ঝিনুক আর মিতু ওদের রুমে চলে গেল।
মেঘ নিজের রুমে গিয়ে কোন রকম ড্রেসটা চেন্জ করে ফ্রেশ হয়েই বিছানায় শরীর এলিয়ে দিল।
মেঘের একটা বড় সমস্যা সেটা হলো সে অন্যেদের মত জার্নি করার সময় ঘুমাতে পারে না। হোক সেটা লং জার্নি তবুও কেন জানি মেঘের ঘুম পায় না।
সৈকত ফ্রেশ হয়ে টমি কে নিয়ে একটু বাইরে যায়। স
নিজের বাম হাতটা তার স্বামীর ডানহাতের মধ্যে রেখে কথা গুলো বলবে।”
কিন্তু----------
মেঘের কোন আশায় পূরণ হলো না।
বিয়ের প্রথম দিন সৈকতের আচারণ দেখে মেঘ আর তার ডায়েরীটা সৈকতকে দেয় নি।
ডায়েরী লিখতে লিখতে মেঘ ঘুমিয়ে পড়ে। সকালে দরজার খটখট শব্দে মেঘের ঘুম ভেঙ্গে যায়। চোখ মুছে দরজা খুলে দেখে সৈকত দাড়িয়ে আছে ।
—কোথায় ছিলেন আপনি সারা রাত?
—এখন তোমার কোন প্রশ্নের জবাব দিব না। সরো আমি ঘুমাবো।
—আপনি আগে বলুন কোথায় ছিলেন?
—জানোই তো বাইরে ছিলাম তাহলে এত প্রশ্ন করার কি আছে?
—আমরা সবাই চিন্তায় ছিলাম সেটা কি আপনি বুঝতে পারেন না??
—হুম ।
—তাহলে?
—একটা কাজে আটকে গিয়ে ছিলাম।
—ভাল।
—এখন সরে যাও আমি ঘুমাবো।
—আপনি এখন ঘুমাতে পারবেন না।
—কেন!!?
—আপনি ঘুমালে আমাদের ঘুরতে নিয়ে যাবে কে??
—গাড়ি রিজার্ভ করা আছে । যেখানে যেতে চাও ড্রাইভার কে বলে দিও নিয়ে যাবে।
—আপনি তো আজিব। এখানে এসেছি সবাই মিলে এক সঙ্গে ঘুরতে আর আপনি কিনা আমাদের অচেনা পরিবেশে তিন জন মেয়েকে অন্যের ভরসায় ছেড়ে দিচ্ছেন!!?
—কেন তোমরা কি বাচ্চা নাকি যে হারিয়ে যাবে??
—আপনার কি কোন বিষয়ে কোন মাথাব্যথা নেই!!?
—না নেই।
মেঘ আর কথা না বাড়িয়ে দরজা থেকে সরে দাড়াল।
————**——**——**————
ঘুরতে যাওয়ার আগে ঝিনুক এসে সৈকত কে ওদের সাথে যাওয়ার জন্য অনেক রিকুয়েস্ট করল। অবশেষ সৈকত ঝিনুকের কথায় ওদের সাথে ঘুরতে বের হলো।
ঘোরার জায়গা হিসাবে সিলেক্ট করা হল জাফলং ।
চা বাগান ঘুরে দেখে তারপর ঝর্না সেখান থেকে জিরো পয়েন্ট। সবাই মিলে সারাদিন অনেক ঘোরাঘুরি করে অনেক মজা করলো। ঝিনুক আর মিতু সৈকত আর মেঘের সাথে অনেক ছবি আর সেলফি তুললো।
মেঘের ইচ্ছা করছিল একা সৈকত কে সঙ্গে নিয়ে কিছু ছবি তুলতে । কিন্তু সৈকতের হাবভাব দেখে সৈকতকে নিজে সরাসরি আর কিছু বললো না।
ঝিনুক মেঘের মনোভাব কিছুটা বুঝতে পেরে সৈকত কে মেঘের পাশে দাড় করিয়ে দিল।
সৈকত প্রথমে ছবি তুলতে নিষেধ করলেও পরে কিযেন ভেবে আর কোন কথা না বলে চুপচাপ মেঘের পাশে গিয়ে দাড়াল।
মেঘ সৈকতের দাড়ানো দেখে মনে মনে ভাবছে“ মনে হচ্ছে পরের বউয়ের সঙ্গে দাড়িয়ে ছবি তুলছে। নিজের রেজিস্ট্রি করা জিনিস তাও মাঝে একহাত ফাঁকা জায়গা।”
মনে কত আশা ছিল বর খুব রোমান্টিক হবে। অন্যান্য যুগল দের মত তারাও খুব রোমান্টিক মুডে ছবি তুলবে কিন্তু--------
তার নিজের মনের কোন আশা ,কোন স্বপ্নই পূরণ হলো না।
ছবি তোলা শেষ করে সবাই গাড়িতে উঠার জন্য পা বাড়াল। বিকাল হয়ে এসেছে।লাল রঙের সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছ।
এমনিতে মেঘের আগে থেকে কখনো শাড়ি পরার অভ্যাস নেই। আজ ঝিনুকের অনুরোধ শাড়িটা পরে ঘুরতে বেরিয়ে টের পাচ্ছে শাড়ি পরে হাটা কত কষ্টের।
পাথরের উপর দিয়ে হাটার সময় হঠাৎ মেঘের পা স্লিপ করলো।
মেঘ মনে মনে ভাবলো এই বার বুঝি শেষ।
আঃ আঃ বলে চোখ বন্ধ করে চিৎকার দেয়ার জন্য মুখ খোলার আগেই নিজের কোমরে শক্ত এক জোড়া হাতের স্পর্শ পেল।
মেঘ তাকিয়ে দেখে ---------
১১.
মেঘ তাকিয়ে দেখে সৈকত ওর মুখের দিকে ঝুকে পড়েছে। মেঘ সৈকতের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। সৈকতের গভীর কালো চোখের চাহনীতে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে।
কিছু টা সময় যেন এভাবে চোখে চোখে কথা হল। ওদিকে মিতু আর ঝিনুক খিলখিল করে হেসে উঠলো।
ওদের হাসিতে দুজনের ভাবনার ছেদ হলো।
সৈকত ওর বাম হাত টা দিয়ে মেঘের ডান হাত ধরে স্বাভাবিক ভাবে দাড় করিয়ে একটু ঝাড়ির সাথে বললোঃ
—যেটা পরে হাটতে পারো না সেটা পরার কি দরকার??
—না মানে,ইয়ে
—কি ইয়ে ইয়ে করছো?পড়ে গেলে কি অবস্থা হতো বুঝতে পারছো??তাকিয়ে দেখ পিছনেই বড় একটি পাথর।
মেঘ তাকিয়ে দেখে সত্যি বড় একটা পাথর। আর পড়লে মাথাটা ঠিক পাথরটার উপরই পড়তো।
—দেখে শুনে হাটো। যদি পারো জুতা খুলে হাটো তাহলে পা স্লিপ কম করবে।
—আচ্ছা।
মেঘ জুতো জোড়া খুলে হাতে নিয়ে আস্তে আস্তে হাটতে থাকে।
বাসায় ফিরতে আটটা বেজে যায়।
সবাই এক সাথে বসে খাওয়া দাওয়া শেষ করে । মেঘ আর মিতু মেঘের কাছে এসে গল্প করে । সৈকত সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে বাইরে চলে যায় ।
আজ পূনিমা চাদের আলোয় চারিদিক কেমন ঝলমল করছে। দূরের সব কিছু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
ঝিনুক আর মিতু দু’জনে প্লান করে মেঘকে একটা শাড়ি পরিয়ে খুব সুন্দর করে নববধূর সাজে সাজিয়ে দেয়। তারপর ঘরের মধ্যে মোমবাতি জ্বালিয়ে
আলো আধারির মত করে দেয় ।
—এগুলো কি করছো ঝিনুক??
—চুপ একদম কথা বলবে না তুমি।
—তোমার ভাইয়া এসব দেখলে রাগ করবে।
—মোটেও না। ভাইয়া তোমাকে দেখে আজ অবাক হয়ে যাবে।
—তুমি তোমার ভাইয়া কে জানোনা।
—আমি ভাল করেই জানি। তুমি জানোনা। আজ আমি ভাইয়ার চোখে তোমার জন্য ভালবাসা দেখেছি। ভাইয়া তোমাকে ভালবাসে কিন্তু সেটা মুখে প্রকাশ করতে পারে না।
—ভালবাসা না ছাই। সে তো পুরুষ মানুষ তাহলে তার বলতে সমস্যা কোথায়?
—ভাবি সবাই একরকম হয় না। বুঝলাম ভাইয়ার দোষ। তাহলে ,তুমি কেন নিজের থেকে ভাইয়া কে কিছু বলো না??
—ঝিনুক এবার কিন্তু একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে।
—মোটেও না। এখন এ মুহূর্তে আমি তোমার বড় ভাবির রোল করছি সো কোন কথা বলবে না।
—কি বললে তুমি??
—হুম বড় ভাবি। বড় ভাবি আমাকে বলেছিল আমি যেন এই কাজগুলি করি। সো এখন তুমি আর কথা বলো না। আমাকে আমার ডিউটি করতে দাও।
—মেঘ মুচকি হেসে বলে আচ্ছা।
ঝিনুক মতি চাচাকে ডেকে কি যেন বলতেই উনি দৌড়ে চলে যায়।
কিছুক্ষন পর হাতে কিছু গোলাপ ফুল নিয়ে ফিরে আসে ।
ঝিনুক মেঘের খোপায় দু’তিনটা গোলাপ গুজে দিয়ে বাকি ফুল গুলোর পাপড়ী ছাড়িয়ে সারা বিছানায় ছিটিয়ে দেয় ।
মেঘ দাড়িয়ে দাড়িয়ে ঝিনুকের পাগলামি দেখে আর সৈকতের কথা ভাবে।
তাহলে কি সত্যিই সৈকত মন থেকে মেঘকে ভালবাসে । ভালবাসলে মানুষের চোখের ভাষা কেমন হয় সেটা মেঘের জানা নেই। তবে আজ সৈকতের চোখের দিকে তাকিয়ে মেঘ যেন কোন অজানা গভীরতায় তলিয়ে যাচ্ছিল। এক অদ্ভূত রকমের ভাল লাগা কাজ করছিল মেঘের মনে। মনে হচ্ছিল সময় টা তখন থমকে গেলেই বোধহয় ভাল হতো।
হঠাৎ মুখের সামনে ঝিনুক তুড়ি বাজিয়ে বললো কি ভাবছো ভাবি??
—কই কিছু নাতো!।
—জানি কি ভাবছো।
—কি জানো!?
—কিছুনা। তবে তোমার জন্য আমার একটা সারপ্রাইজ আছে।
—কি সারপ্রাইজ??
—এখন না । বাসায় ফিরে দেখাবো।
—ঠিক আছে আপেক্ষায় রইলাম।
হুম।তবে এখন তুমি এখানে বসে অপেক্ষা করো ভাইয়ার জন্য বলে মেঘের হাতটা ধরে বিছানায় বসিয়ে দেয় ঝিনুক।
ঝিনুক আর মিতু রুমের লাইট অফ করে টমি কে নিয়ে দরজা আটকে চলে যায়।
মেঘ বসে বসে ভাবে সৈকত দেখলে কেমন রিএ্যাক্ট করবে কে যানে??
কিছু সময় পর দরজার বাইরে পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল।
এইতো মনে হয় সৈকত আসছে।
আস্তে আস্তে পায়ের আওয়াজ টা যত এগিয়ে আসছে মেঘের বুকের ভিতর টাও কেমন যেন হচ্ছে।
হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এক হাত দূর থেকেও যে কেও তার হৃদস্পন্দন শুনতে পাবে।
মেঘ যতটা সম্ভব নিজেকে কন্টোল করার চেস্টা করছে কিন্তু হচ্ছে না।
পায়ের শব্দটা এখন ঠিক দরজার সামনে এসে থেমেছে । মেঘ লজ্জা পাচ্ছে তাই মাথা নিচু করে লাজুক বউয়ের মত বসে আছে।
সৈকত দরজা খুলে ঘরে ঢুকেই যেন পাগলের মত হয়ে গেল।
জোরে চিৎকার করে উঠলো ।
—আগুন ,আগুন কে কোথায় আছো।
মেঘ সৈকতের চিৎকার শুনে ঘাবড়ে গেল। তাড়াতাড়ি করে বিছানা থেকে নেমে সৈকতের কাছে গিয়ে বললো কোথায় আগুন??কি হয়েছে আপনার??
সৈকত আর কথা বলতে পারছে না।
ওর চোখের সামনে ওর মায়ের আগুনে পোড়া শরীর টা ভেসে উঠছে।
সৈকতের চোখ লাল ও বড় হয়ে গেছে।
চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
মেঘ তাড়াতাড়ি করে ঘরের লাইট অন করে দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ঝিনুক কে ডাকলো।
ঝিনুক ঘরে ঢুকে তাড়াতাড়ি করে মোমবাতি গুলো নিভিয়ে দিল।
—ভাইয়া ,ভাইয়া দেখ কোথাও কোন আগেন নেই। আমি সব আগুন নিভিয়ে ফেলেছি।
মেঘ বুঝতে পারছে না কি করবে। সৈকতের কাছে এসে হাত ধরতেই--
সৈকত নিজের হাতটা ছাড়িয়ে মেঘের গালে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিল।
মেঘের মনে হলো চোখ দিয়ে আলো ছিটকে গেল। মাথা টা ভো ভো করে উঠলো । কানের ভিতর শনশন শব্দে হাওয়া বইতে শুরু করলো।
একটার অনুভূতি শেষ হতে না হতেই আরেক টা।
এবার আগের মত।
মেঘের চোখ বেয়ে দর দর করে পানি পড়তে লাগলো।
ঝিনুক কি যেন সৈকতকে বলছে কিন্তু মেঘ কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। কানের মধ্যে বইয়ে যাওয়া ঝড় বাতাসের জন্য।
—ভাইয়া তুই এটা কি করলি? তুই ভাবিকে মারলি।!?
—বেশ করেছি।
—তুই না জেনে শুনে ভাবিকে মেরে ঠিক করিস নি।
—এখন কি তোর কাছ থেকে আমাকে শিখতে হবে কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল??
—ভাবির কোন দোষ নেই। সব দোষ আমার।
—আমি কোন সাফাই শুনতে চায় না । বেরিয়ে যা এ ঘর থেকে আর ওকে ও নায়ে যা সাথে করে।
—ভাইয়া তুই না জেনে রাগ করছিস। ভুলটা আমার । আমি ঘরে মোমবাতি গুলো জ্বেলেছিলাম।আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে তোর আগুন দেখলে ভয় করে ।
ভাবিতো জানেই না । জানলে ভাবি কখনও আমাকে মোমবাতি জ্বালাতে দিত না।
—আমি আর কোন কথা শুনতে চাই না। তুই বের হবি!?নাকি আমি চলে যাবো?
ঝিনুক মেঘের কাছে গিয়ে বলেঃ
—সরি ভাবি,আজ আমার জন্য তোমার শরীরে আঘাত লাগলো বলে চোখ মেছতে মুছতে বেরিয়ে গেল।
সৈকত আর কোন কথা না বলে লাইট অফ করে বিছানায় গিয়ে অন্যদিক মুখ করে শুয়ে রইলো।
মেঘ তখনও দাড়িয়ে আছে আর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।
হঠাৎ সৈকতের মনে মনে খারাপ লাগতে শুরু করলো। তখন ওভাবে মেঘের গায়ে হাত তোলাটা তার ঠিক হয়নি। কারণ মেঘ কিছুই করেনি। ঝিনুক কখনও মিথ্যা কথা বলে না। তারমানে মেঘ র্নিদোষ। কাজটা ঠিক হলো না। রাগের মাথায় এমন একটা কাজ করা ভাল হয় নি। এমনি তে ওকে অনেক কষ্ট দিয়েছি।
এখনই ওর কাছে সরি বলে ক্ষমা চাইতে হবে। সৈকত পাশ ফিরে বললো সরি মেঘ আসলে আমার তখন ঐভাবে না জেনে তোমাকে চড় মারা উচিত হয়নি।
মেঘের কোন সাড়া নেই।
—মেঘ,মেঘ।
কি হলো কথা বলছো না যে। বললাম তো সরি।
সৈকত তবুও মেঘের সাড়া পেল না।
এবার সৈকতের মনে কেমন যেন হলো।
উঠে লাইট অন করে দেখে ঘরের দরজা খোলা মেঘ নেই।
সৈকতের বুকের মধ্যে কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো।
তাড়াতাড়ি উঠে বাইরে বেরিয়ে মেঘ কে খুজতে শুরু করলো।
এদিক ওদিক তাকিয়ে মেঘকে না পেয়ে
ঝিনুকের দরজায় নক করলো। ঝিনুক দরজা খুলতেই সৈকত কোন কথা না বলে ঘরে ঢুকে চারদিকে চোখ বুলালো কিন্তু মেঘ কে দেখলো না।
—কি হয়েছে ভাইয়া?কিছু বলবি।
—হুম । সরি বলতে আসছি। তখন ঐভাবে রিএ্যাক্ট করার জন্য।
—আমাকে সরি না বলে ,যাকে সরি বলার তাকে সরি বল।
—হুম বলবো। তার আগে তোকে বলতে আসছি।
—ভাইয়া আমার মনে ছিল না যে ---
—এসব এখন থাক। তোরা ঘুমিয়ে পড় আমি যাই।
সৈকত আর কিছু না বলে বেরিয়ে আসলো।
ঝিনুক দরজা আটকানোর আগে বললো ভাইয়া সব ঠিক আছে তো?
—হ্যা । তুই দরজা আটকে ঘুমিয়ে যা। গুড নাইট।
সৈকত ইচ্ছা করে মেঘের বিষয়টা ঝিনুক কে বললো না। শুধুশুধু ও চিন্তা করবে তাই।
সৈকত বাঙ্গলোর চারপাশে ঘুরে ঘুরে মেঘ কে খুজতে লাগলো। কিন্তু কোথাও মেঘ কে দেখা যাচ্ছে না।
সৈকতের মনে মনে এবার মেঘের জন্য সত্যিই খুব ভয় হতে লাগলো।
এত রাতে মেয়েটা কোথায় চলে গেল তার উপর রাগ করে । মেঘ যে খুব অভিমানী একটা মেয়ে এ কদিনে সৈকত সেটা ভালভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে।
সৈকত হাটতে হাটতে সেই ছাউনি টার কাছে যেতেই কারো কথা কানে এসে লাগলো। সৈকত আরেকটু এগিয়ে যেয়ে দেখলো মেঘ দাড়িয়ে একা একা বিড়বিড় করছে।
(চলবে)
Comments
Post a Comment