বেখেয়ালি ভালবাসা পর্ব ৯

 গল্পঃ #বেখেয়ালি_ভালবাসা

লেখাঃ সাবেরা সুলতানা রশিদ

#পর্ব_৯

২৫.


সৈকতের এতদিনের মনের মধ্য তিল তিল করে গড়ে তোলা নিজের  পৃথিবীটা আজ একনিমিষে সব এলোমেলো হয়ে গেল । 

মনে হচ্ছে কোন এক সুনামি এসে মুহূর্তের  মধ্যে তার তান্ডব খেলা দেখিয়ে সব লন্ডভন্ড করে দিল। 


সৈকত কাঁদছে ,চিৎকার  করে কাঁদছে বুকের ভিতরের জমাট কষ্টগুলো আজ চোখ দিয়ে ঝরছে। 

কে বলছে পুরুষ মানুষ শতকষ্টেও কাঁদতে পারে না !!!?

আজ সৈকতের চারিপাশের  প্রকৃতি স্বাক্ষি। এই রাত,এই রাতের আকাশ,আকাশের বুকে জ্বল জ্বল করে জ্বলতে থাকা তারাগুলি সবাই আজ স্বাক্ষী। 

সবাই আজ সৈকতের ব্যথায় ব্যথিত  হয়ে যাচ্ছে। 


সৈকত কিছুসময় পর নিজেকে একটু সামলে বাইকে উঠে বসে । 


সৈকত বাড়ি ফিরে নিজের রুম থেকে কিছু জিনিস নিয়ে তাড়াতাড়ি  করে আবার বেরিয়ে যায় । 


মেঘ একা একা বসে আছে নার্সিং হোমের কেবিনে। বার বার ডাক্তারদের কাছ থেকে  খবর নিচ্ছে বাবা এখন কেমন আছে??

দুই তিনজন বড় ডাক্তার সবসময় চৌধুরী সাহেবের পাশে আছে। 

ডাক্তার সব খবরই মেঘকে দিচ্ছে। 

অনেক রাত হয়ে গেছে মেঘের মনের ভিতর কেমন যেন অস্থিরতা কাজ করছে । 

ভাল লাগছে না। কেবলই শুধু মনে হচ্ছে বাবার আজকের এই অবস্থার জন্য শুধুমাত্র আমিই দায়ী। 

কেন যে হুট করেই এমন সব করতে গেলাম!!?

এখন যদি বাবার কিছু হয়ে যায় তাহলে যে আমি  নিজেকেই কোনদিন ক্ষমা করতে পারবো না। 


যে করেই হোক বাবাকে সুস্থ করতে হবে। 


মেঘ ওযু করে এসে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তে দাড়িয়ে যায় । 

দীর্ঘ সময় নিয়ে আস্তুে আস্তে নামাজ পড়ে। 

নামাজ শেষ করে মোনাজাতের মাধ্যমে কান্না করতে করতে আল্লাহর কাছে সাহায্য  চাই। 


মোনাজাত শেষ করে জায়নামাজ থেকে উঠে দেখে সৈকত দাড়িয়ে আছে। 


মেঘ জায়নামাজ টা রেখে সৈকতকে বলেঃ

—এতো রাতে আপনি এখানে??

—------


মেঘ সৈকতের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখে চোখ দুটো লাল আর ফুলে আছে। দেখে মনে  হচ্ছে অনেক কান্নাকাটি করেছে। 

—কি হলো কথা বলছেন না কেন??কি হয়েছে আপনার ??আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেন??


তারপরও সৈকতের মুখে কোন কথা নেই। 


মেঘ সৈকতের হাত ধরে একটা ঝাঁকি দিয়ে বলেঃ

—কি হলো ??শুনতে পাচ্ছেন না??


মেঘের ঝাঁকুনিতে সৈকত একটু থতমত খেয়ে যেন বাস্তবে ফিরে আসে । মনে হচ্ছে কোন এক গভীর ভাবনায় ডুবে গিয়েছিল। 


মেঘ শান্ত কন্ঠে বলে কি হয়েছে আপনার কথা বলছেন না কেন?সব ঠিকঠাক আছেতো ?


—না কিচ্ছু ঠিক নেই। সব শেষ হয়ে গিয়েছে,সব শেষ। 

—মানে কি বলছেন আপনি!!?


মেঘ মনে মনে ভয় পেয়ে যায় তাহলে কি বাবা আর নেই!!?

একটু আগেও তো মেঘ খোজ নিয়েছিল তখন তো সব ঠিক ছিল। 

নামাজ পড়তে যতটুকু সময় তার ভিতরে----


মেঘের কন্ঠ বুজে আসে। 

বাবা বলে দৌড়ে বের হতে যায় ,সৈকত পিছন থেকে মেঘের হাতটা টেনে ধরে । 


আমাকে ছাড়ুন , বাবার কাছে যেতে দিন। 

সব দোষ আমার । আমি কেন যে সেদিন আপনাকে ওসব কথা বলে ছিলাম!!

যদি না বলতাম তাহলে আজ এমনটা হতো না বলে মেঘ কান্না শুরু করে । 


সৈকত কোন কথা না বলে মেঘের হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যায় । 

মেঘ ভাবে সৈকত  হয়তো বাবার কাছে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যখন দেখলো সৈকত তার হাত ধরে টেনে সিঁড়ির দিকে যাচ্ছে তখন মেঘ বললো কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে ??

ছেড়ে দিন আমি বাবার কাছে যাবো---


সৈকত কোন কথা না বলে মেঘকে ছাদে নিয়ে যায় । 


সৈকত মেঘের হাত ধরে ছাদের একপাশে দাড় করিয়ে অন্যহাতে থাকা ব্যাগ থেকে কিছু জিনিস বের করে ছাদের মাঝেখানে রাখে । 


মেঘ দেখে আরে এগুলোতো শ্বাশুড়ী মায়ের জিনিস । যেগুলো এত দিন সৈকত তার নিজের কাছে খুব যত্নসহকারে  গুছিয়ে রেখেছিল । 

মেঘ মনে মনে উনি এসব জিনিস কেন এখানে এনেছেন। কি করবে এগুলো দিয়ে ??


সৈকত জিনিস গুলো রেখে ব্যাগের অন্য পাশ থেকে একটা বোতল বের করে পানির মত তরল কিছু জিনিসপত্রের চারিদিকে ছিটিয়ে দেয় । 


বাতাসে মেঘের নাকে গন্ধ যেতেই মেঘ বুঝতে পারে যে এটা অন্য কিছু নই পেট্রলের গন্ধ। 

মেঘ হতবাক হয়ে যায় । কি করতে চাইছেন উনি!!এতবছর ধরে সযত্নে রাখা মায়ের স্মৃতি গুলোকে তিনি কি আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে চাইছেন!!?

কিন্তু কেন??

কি এমন হল হঠাৎ বাড়ি যাওয়ার পর যে উনি এরাকম পাগলামি শুরু করেছেন। 


সৈকত পকেট থেকে ম্যাচটা বের করে একটা কাঠি বের করে আগুন জ্বেলে জিনিসপত্রের উপর ছুড়ে ফেলে দেয় । দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে শুরু করে । 

সৈকত পিছনে সরে এসে মেঘের পাশে এসে দাড়ায় । 


মেঘ সৈকতের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করে । 

সৈকত আগুনের দিকে তাকিয়ে আছে । আগুনের লাল আভায় সৈকতের চোখ মাঝে মাঝে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। 

হয়তোবা আগের সেই ভয়ের জন্য। তবে আজ আর সৈকত আগুন দেখে আগের মত ভয় পাচ্ছে না । 

ধীরে ধীরে নিজের ভিতর থেকে ভয়টা কে বিলীন করে দিচ্ছে । 

সৈকতের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে । চোখ দিয়ে অঝর ধারায় গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু ।   


মেঘ কিছুই বুঝতে পারছেনা!!বোঝা না বোঝার মধ্য দুলছে। 


দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা আগুন এখন সব কিছু পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে । 

হঠাৎ হাটু গেড়ে বসে পড়ে সৈকত । 

মেঘ সামনে এসে দাড়াতেই জড়িয়ে ধরে জোরে জোরে কাঁদতে শুরু করে । 

এতক্ষন বুকের ভিতরটা গুমড়ে মরছিল আর এখন একটা অবলম্বন পেয়ে সেটা  বুক ফেটে বেরিয়ে আসছে । 


মেঘ এবার কিছুটা বুঝতে পারে । 

নিশ্চয় উনি সত্যটা জেনে গেছেন হয়তোবা মুখোমুখি ও হয়েছেন তাই হয়তো-----


মেঘ কি করবে এ মুহূর্তে কি বলেই বা সৈকত কে সাত্বনা দিবে  বুঝতে পারে না। 


মেঘ আস্তে করে সৈকতের মাথার উপর তার হাত রাখে । 

মেঘ সৈকতকে কাঁদতে বাধা দেয় না। যতটা পারে  কান্না করুক আজ কান্না করে যদি সে নিজের মনের কষ্টটা ভুলতে পারে । 


মেঘ সৈকতের হাত ছাড়িয়ে দিয়ে সৈকতের মুখোমুখি বসে । 


—আমার দিকে তাকান। 


সৈকত নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে । 


মেঘ নিজের হাত দিয়ে সৈকতের মুখটা  উঁচু করে দেয়। 


সৈকত মেঘের চোখের দিকে তাকাতেই মেঘ বলেঃ

—আপনি নিশ্চয় আপনার এতদিনের সব না পাওয়া উত্তর পেয়ে গেছেন?

সৈকত ছোট্ট বাচ্চাদের মত ঘাড় দোলায় । 


মেঘের চোখ দুটো খুশিতে ছলছল করে ওঠে। 

মেঘ আনন্দে সৈকতকে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে । 

আমি জানতাম আপনি একদিন সব সত্যিটা জানতে পারবেন। কিন্তু সেই দিনটা যে এত তাড়াতাড়ি আসবে সেটা বুঝতে  পারিনি। 


সৈকত কোন কথা বলে না । চুপ করে মেঘের বলা কথা গুলো শুনতে থাকে । 


একটু পর মেঘ সৈকত কে ছেড়ে দিয়ে বলেঃ

—সরি । আসলে খুশিতে না বুঝে ------

—ইটস ওকে । তবে তুমি যেটা বললে সেটা ভুল। 

—কোনটা ভুল?

—তাড়াতাড়ি ভুল বুঝতে পেরেছি !!সেটা। 

আমার জন্য এটা অনেক দেরি হয়ে গেছে । আমাকে এই সত্যেটা আরে অনেক আগেই জানার দরকার ছিল। 

আগে জানলে হয়তো আমি এতোটা খারাপ হতাম না। 


—কে বলেছে আপনি খারাপ??

—আমি জানি এটা আর কাউকে বলার প্রয়োজন নেই। 


মেঘ কি যেন ভেবে 

হঠাৎ বসা থেকে উঠে দাড়ায় । 


তারপর সৈকতের হাত ধরে বলে চলুন আমার সাথে । 

 —কোথায়?

—কোন প্রশ্ন করবেন না।  যা বলবো তাই করবেন । 

সৈকত আর কোন কথা না বলে উঠে মেঘকে অনুসরণ করে। 


মেঘ সৈকত কে আই সি ইউ এর সামনে দাড় করিয়ে বলে আপনি এখানে দাড়ান আমি একটু আসছি। 


সৈকত তাকিয়ে দেখে মেঘ ডাক্তারদের কাছে গিয়ে কথা বলছে। 

দূর থেকে কোন কথা বোঝা যাচ্ছেনা তবে দেখে যতটুকু মনে হচ্ছে তাতে মেঘ ডাক্তারদের যা বলছে তারা  মাথা নাড়িয়ে মেঘের কথায়  অসম্মতি জানাচ্ছে । 


মেঘ হাসিমুখে সৈকতের দিকে ছুটে আসছে। বোঝাই যাচ্ছে

অনেকক্ষন কথা বলার পর অনেক রিকুয়েস্ট করার পর ডাক্তাররা মেঘের কথাই রাজি হয়েছে । 


মেঘ সৈকতের কাছে এসে বলে আমি যেটা বলছি মন দিয়ে শুনুন। 

আপনি এখন বাবার কাছে যাবেন। 


সৈকত বিস্ময় চোখে মেঘের দিকে তাকাই। 

মেঘ বলে ভয় নেই আপনার সঙ্গে কেউ যাবে না।  আপনি একাই ভিতরে যাবেন। 

আমার বিশ্বাস আপনার স্পর্শে আর আপনার কথায় আল্লাহ চাইলে বাবা সুস্থ হয়ে যেতে পারেন। আমি শিওর নই তবে আমার মনটা কেন জানিনা  এই কথায় বলছে। 


একটা নার্স এসে সৈকতকে একটা ড্রেস দিয়ে বলে এটা পরে নিন। 


সৈকত মেঘের দিকে তাকাই। 

মেঘ মাথা নেড়ে হ্যা বলে । 


সৈকত ড্রেসটা পরে নেয় । 

মেঘ কাছে এসে বলে আপনি ভিতরে যান আমরা বাইরে আছি। 


সৈকত মেঘের চোখের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে ভেতরে চলে যায় । 


মেঘ চোখ বন্ধ করে মনে প্রানে আল্লাহকে ডাকতে থাকে । 


সৈকত যত ধীর পায়ে চৌধুরী সাহেবের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ততোই হৃদকম্পনটা জোরে জোরে হচ্ছে। 


সৈকত এগিয়ে গিয়ে দেখে চৌধুরী সাহেব খুব আস্তে আস্তে নিশ্বাস  ফেলছেন আর নিচ্ছে। 

নিশ্বাসের সাথে সাথে বুকটা উঁচু আর নিচু হচ্ছে। 

মনে হচ্ছে নিশ্বাস টা নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে । 

সৈকত চৌধুরী সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে । 

এই ষোলবছরে একটি বারের জন্যও সৈকত চৌধুরী সাহেবের দিকে ফিরেও তাকায়নি।  যদিও বা কথা বলছে অন্যদিকে চোখ রেখে কথা বলেছে। 

এই ষোলবছরে মানুষটা যে এতটা পরিবর্তন হয়ে গেছে সৈকত না দেখলে বুঝতে পারতো না। 


সৈকত আস্তে করে  চৌধুরী সাহেবের বুকের উপর রাখা হাতের উপর নিজের হাতটা রাখে । 

মুহূর্তে সৈকতের চোখদুটো ঝাপসা হয়ে যায় । বুকের ভিতরে এক আদ্ভুত রকমের ভাললাগা কাজ করতে শুরু করে । 

বুকের ভিতরের কলিজাটা যেন তিনগুণ  বড় হয়ে গেছে । 


সৈকত এই কেটে যাওয়া ষোল বছরের কথা মনে করে । কতকষ্টই না দিয়েছি কথার মাধ্যমে এই মানুষটাকে। কত ছোট করেছি অন্যেদের সামনে অথচ তিনি কখনো  কোন দিন জোরে কথা বলেননি,এমনকি কখনো ধমক দিয়েও কথা বলেননি।  

সৈকতের আগের সব কথাগুলো মনে পড়ে যায় কিভাবে তিনি অন্যেভাই বোনদের  আদর করতেন।

সৈকতের কাছে গেলেই সৈকত সেখান থেকে সরে চলে যেত রাগে আর ঘৃনায় । 


সৈকতের চোখের সামনে আজ এত স্মৃতি ভাসছে যে সৈকত কোন কথাই বলতে পারছেনা । 

সৈকত চৌধুরী সাহেবের হাত ধরে ফুঁপিয়ে  ফুঁপিয়ে  কাঁদছে । 


সৈকত তার একটা হাত চৌধুরী সাহেবের মাথায় রেখে বলে আমাকে মাফ করে দিন বাবা । বাবা আমাকে আপনি ক্ষমা করৈ দিন। 

আমি সত্যিটা না জেনে আপনাকে অনেক অপমান করেছি ,অন্যেদের সামনে অনেক ছোট করেছি। অনেক বড় বড় কথা বলে আপনার মনে কষ্ট দিয়েছি । 

আমাকে আপনি মাফ করে দিন। 


সৈকত কাঁদতে কাঁদতে চৌধুরী সাহেবের বুকে মাথা রেখে  দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে কান্না করতে থাকে। 


ডাক্তাররা সবাই বাইরে দাড়িয়ে কাচের ভিতর দিয়ে ভিতরের দৃশ্য দেখে তাড়াতাড়ি করে ভিতরে  ঢুকে যায় । 


সৈকত ডাক্তার দের এভাবে আসতে দেখে চমকে যায় । 

ডাক্তাররা তাড়াতাড়ি করে চৌধুরী সাহেবের   হার্টবিট আর প্রেসার চেক করে অবাক হয়ে যায় । 


সব কিছু স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। 

ডাক্তাররা সবাই অবাক হয়ে যায় ।  


মেঘ ভিতরে ঢুকে ডাক্তারদের কাছে জিঙ্গাসা করতেই ডাক্তার হাসিমুখে বলে 

তিনি এখন বিপদমুক্ত । কিন্তু আমরা ত অবাক হয়ে যাচ্ছি এটা ভেবে যে সারাদিন  আমরা যেটা করতে পারলামনা  সেটা আপনি  কিভাবে করলেন!??


মেঘ লজ্জা পেয়ে বলে আসলে এমন অনেক কিছু ঘটনা আমাদের সামনে ঘটে যার উত্তর আমরা দিতে পারি না। এটা সম্পূর্ন আল্লাহের  ইচ্ছায় সম্পাদিত হয়ে থাকে । 


ডাক্তাররা একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদ্যু হেসে বলে 

ধন্যবাদ  আজ আপনি না থাকলে হয়তো এতকিছু সম্ভব হতো না। 


মেঘ হেসে চৌধুরী সাহেবের দিকে এগিয়ে যায় । 


চৌধুরী সাহেব আস্তে আস্তে চোখ মেলে তাকাতেই সৈকত বাবা বলে জড়িয়ে ধরে । 


চৌধুরী সাহেবের চোখ বেয়ে দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে । 


ততক্ষনে বাইরে থেকে ভেসে আসে ফজরের আযানের সুর । 


চৌধুরী সাহেব বাম হাতদিয়ে সৈকতকে জড়িয়ে ডান হাতটা মেঘের দিকে বাড়িয়ে দেন। 


মেঘ ছলছল চোখে এগিয়ে যায়------- ------------------


২৬.


বাসার সবাই  চৌধুরী সাহেবের সুস্থতার কথা শুনে একে একে সবাই এসে ক্লিনিকে পৌছায় । 

পরিবারের সবার ভিতরে যেন আনন্দের বন্যা বইতে শুরু করে । 


সৈকতের মনের ভিতর যে ঝড় উঠেছিল আর সেই ঝড়ে তার গোছানো গোটা পৃথিবীটা যে তছনছ করে দিয়েছিল  সেটা সৈকত আর মেঘ ছাড়া তৃতীয় কোন ব্যক্তি জানেনা। 

তবে ঝড়টা উঠে বোধহয় ভালই হয়েছিল তাইতো সৈকতের রং বিহীন ধূসর অগোছালো  জীবনটা এবার নানা রঙে সুসজ্জিত  হল। 


সৈকতের মুখে বাবা ডাক শুনে পরিবারের সবাই খুব অবাক হয়ে যায় । 

রোজি আর ঝিনুক মেঘের কাছে এসে মেঘকে জড়িয়ে ধরে আনন্দে কেঁদে ফেলে। রোজি বলেঃ

—আমরা জানি এই অসাধ্য সাধনের পিছনে তোর হাত আছে । তাছাড়া যে এটা কোন ভাবেই সম্ভব হতো না। 

—না ভাবি আমি কিছু করিনি। একটা কথা কি জানো, যা হয় ভালোর জন্যই হয় । আর আল্লাহ কখন কি করে সেটা বোঝা বড় দায় । 

—হুম সত্যি বলেছিস। তাইতো তোর মত লক্ষী আর গুনবতী মেয়েকে সৈকতের যোগ্য জীবন সঙ্গি হিসেবে পাঠিয়েছে । 


—ভাবি !!?

—হ্যা বল। 

—বাবা এখন পুরোপুরি সুস্থ। ডাক্তাররা অবশ্য বলেছে এখানে আরো দুদিন থেকে  যেতে । কিন্তু বাবা এখানে থাকতে একদমই রাজি হচ্ছে না।তাই বাবার জোরাজুরিতে ডাক্তার বাবাকে বাসায় যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। 

—হ্যা জানি। আসলে বাবা বাড়ির বাইরে কোথাও থাকতে চাইনা । তাই এমন করছে । 

—হ্যা। 

মেঘ তাকিয়ে দেখে তিন ছেলে মিলে তাদের বাবাকে ঘিরে ধরে আছে । 

সবার মুখে হাসি । সৈকত বাবার ডান পাশে বসে আছে মাথা নিচু করে । ছোট বাচ্চারা যেমন লজ্জা পেলে মাথা নিচু করে রাখে ঠিক সেভাবে সৈকত বসে আছে তার বাবার ডান হাতটা কোলে নিয়ে । 


এ দৃশ্য দেখে মেঘের মনটা আনন্দে ভরে ওঠে। 


মেঘ বলেঃ

—ভাবি এখন আমি আসি!!?

—কোথায় যাবি তুই??

—এখন আমারতো যাওয়ার জায়গা একটাই। 

—আর পাগলামি করিস না মেঘ চল বাড়ি ফিরে চল। 

—না ভাবি । এখনো আমার বাড়ি ফিরে যাওয়ার সময় হয় নি। 

—কে বলেছে হয়নি!?হয়েছে ,তুই দেখছিস না তোকে ছাড়া আমাদের পরিবারটা একয়দিন কেমন অপূর্ন ছিলাম। তুই না থাকলে বাড়িটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগেরে । 


—আমি জানি ভাবি। তারপরও বলছি এখন আমার ও বাড়িতে ফিরে যাওয়ার সময় আসেনি।যেদিন সে সময়টা আসবে সেদিন আর তোমাদের কাউকে কিছু বলতে হবে না । আমি নিজেই আসবো। 

আমার জীবনের আরোও একটা পরীক্ষা যে এখনো বাকি থেকে গেছে । জানিনা সে পরিক্ষায় আদেও উত্তীর্ণ  হতে পারবো কিনা!!?

—তুই পারবি মেঘ। দেখিস তোর সব ইচ্ছা গুলো আস্তে আস্তে পূরণ হবে । জিত তোর হবেই হয় আজ আর নয় কাল। 

—সে আশাইতো  আছি ।

—তুই এখন চলে গেলে বাবাকে কি বলবো?

—কিছু বলতে হবে না। তুমি শুধু বাবাকে এই চিঠিটা দিও মেঘ একটা চিঠি রোজির হাতে দেয় । 


রোজি চিঠিটা হাতে নিয়ে বলে, সৈকত কি জানে তুই চলে যাচ্ছিস তা??


মেঘ ঘাড় ঘুরিয়ে সৈকতের দিকে একবার  তাকাই,তারপর বলে না আমি বলিনি। 


তুই চলে যাওয়ার পর যদি বলে কেন  তোকে আমি যেতে দিলাম তখন কি বলবো?


কিছু বলতে হবে না। কারণ উত্তরটা তার জানা। 


ঝিনুক বলে না ভাবি তুমি যেও না। তুমি চলে গেলে আবার কোন না কোন ঝামেলা হবে । 


না ঝিনুক, আর কোন ঝামেলা হবে না। 


কিন্তু----

কোন কিন্তু না ঝিনুক। আমাকে বাধা দিও না। যখন তোমার ভাইয়ার মনে হবে যে আমি তার যোগ্য সেদিন আমি ফিরে আসবো তোমার ভাইয়ের হাত ধরে । যখন তোমার ভাইয়া আমাকে মিস করবে ,যখন আমার ভালবাসার  গভীরতা তাকে ছুঁয়ে দিবে তখন আমি আসবো । 

রোজি আর ঝিনুক মেঘ কে আর কিছু বলে না। 

বুঝতে পারে মেঘ মনের মধ্যে পুষে রাখা অভিমান থেকেই কথা গুলো বলছে। 


মেঘ বিদায় নিয়ে চলে আসে । 


ক্লিনিকের সব ফরমালিটি শেষ করে যখন সবাই বাড়ি ফিরবে তখন চৌধুরী সাহেব বলেঃ

—মেঘ মা কোথায়??তাকে তো দেখছি না?

সৈকত এতক্ষন খেয়াল করেনি যে মেঘ চলে গেছে । বাবার কথা শুনে এদিক ওদিক তাকিয়ে বলে হয়তো বাইরে আছে । 


ঝিনুক তার বাবার কাছে এগিয়ে এসে মেঘের রেখে যাওয়া চিঠিটা দিয়ে বলেঃ

—বাবা ভাবি চলে গেছে । যাওয়ার আগে তোমার জন্য এ চিঠিটা রেখে গেছে। 


চৌধুরী সাহেব মুখ গম্ভীর করে কোন  কথা না বলে ঝিনুকের হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে ভাজ খুলে পড়ে । 

তারপর মুচকি হেসে বলে মা যে আমার বড্ড অভিমানী । 


মেঘের চলে যাওয়ার কথা শুনে সৈকতের বুকের  ভিতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। যার জন্য এতসব আজ নতুন করে ফিরে পাওয়া আর সেই কিনা-----


চৌধুরি সাহেব চিঠিটা পড়ে সৈকতের  দিকে এগিয়ে দেয় । 

সৈকত তার বাবার হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে ভাজখুলতেই 

“বাবা রাগ করবেন না। আপনি তো জানেন যে আপনার মেয়ের জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা চলছে তাই পরীক্ষা শেষ না করে আগেই পরীক্ষার হল থেকে বের হতে চাই না। আপনি মন খারাপ করবেন না। সময় মত ঔষধ আর খাবার খাবেন। নিজের শরীরের যত্ন নিবেন। আর আমার জন্য দোয়া করবেন যাতে সফল হতে পারি। ”


সৈকত চিঠিটা পড়ে কোন কথা বলে না। খুব স্বাভাবিক ভাবে আচরণ করে মনে হয় ওর কিছুই হয়নি। 

শুধু সৈকত জানে তার বুকের ভিতরটা কেমন যেন শূন্য শূন্য লাগছে । এতক্ষনের ভাললাগার আমেজ টা মেঘ চলে যাওয়ায় মুহূর্তে বিষাদময়  হয়ে ওঠে সৈকতের কাছে । 


২৭.


 মেঘ বাড়ি ফিরে আসার পর মেঘের আম্মু চৌধুরী সাহেব কেমন আছে সেটা জানতে চাই। 

মেঘ বলেঃ

—বাবা এখন ভাল আছে ,ডাক্তার রিলিজ করে দিয়েছে । এতক্ষনে সবাই হয়তো বাড়িতেও চলে গেছে। 


মেঘের আম্মু ভাল করে কিছু সময় নিয়ে মনোযোগ দিয়ে মেয়ের দিকে ভাল করে লক্ষ্য করে বলেঃ

—সত্যি করে বলতো সৈকত আর তোর সাথে কি হয়েছে ?


মেঘ মুখে শুষ্ক হাসি টেনে বলেঃ

—কই কিছু হয়নিতো । 

—মিথ্যা বলছিস!!

—শুধুশুধু মিথ্যা কেন বলবো?

—তোর চোখ বলছে তুই মিথ্যা বলছিস।  দেখ মেঘ আমি তোর মা,আমি সব বুঝি।নিশ্চয় তোর আর সৈকতের মধ্য কোন সমস্যা হয়ছে তা না হলে আগের দিন ক্লিনিকে সৈকত তোকে দেখেও কেন কথা বললো না?আর তুই বা কেন কথা বললি না!?

—উুহ মা!তুমি না!!?আচ্ছা ঐরাকম একটা ক্রিটিক্যাল মোমেন্ট এ কি তখন এসব শোনার কথা বলো??তখন বাবার যে অবস্থা ছিল তখনতো কারোও কোন খেয়াল ছিল না। 

—বুঝলাম। কিন্তু তুই কেন তাহলে সিকিউরিটি অফিসারদের নিজের পরিচয় দিলি না??

কেন বললি না যে তুই ঐ বাড়ির ছোট বউ!


আম্মুর কথার উত্তর দেবার মতো কোন কথা মেঘ আর খুজে পায় না। 

কি বলবে!!?

সত্যিটা কি আম্মুকে বলা উচিত ??

না থাক এসব বললে আবার টেনশন করবে । 


হঠাৎ রাজু এসে বলেঃ

—মেঘ তোর সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে । 

—আসছি ভাইয়া। 


কি হয়েছে রাজু ?তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন?


—না মা কিছু হয়নি। আমি ঠিক আছি। 

—আচ্ছা তোরা দু-ভাই বোন কি শুরু করলি বলতো!!?

—কেন মা কি করেছি আমরা?

—কি করেছিস আর কি করিস নি সেটা তোরা ভাল জানিস। তবে দুজন মিলে যে কিছু একটা লুকাতে চাইছিস সেটা বেশ বুঝতে পারছি। 

—কি যে বলো না মা তুমি!!?আচ্ছা এসব বাদ দাও তুমি আমার খাবারের ব্যবস্থা করো খুব ক্ষুধা লাগছে । 

—হ্যা যাচ্ছি । কোন কিছু বলতে চাস না আমাকে ,থাক বলিস না। তবে মনে রাখিস তোরা যখন বাবা,মা হবি তখন বুঝবি সন্তানের জন্য কতখানি দুশ্চিন্তা হয় কথা গুলো অভিমানী সুরে বলে উঠে চলে যায় মেঘের আম্মু। 


মেঘ মুচকি হেসে বলে দেখেছো ভাইয়া আম্মু কেমন অভিমান করলো। 


হুম দেখলাম। 

শোন আমি রুমে যাচ্ছি তুই আই। আমার কিছু কথা আছে। 


—আচ্ছা। 


————**——**——**————


সৈকত বাসায় আসার পর থেকে সবসময় ওর বাবার পাশেই থাকছে। বাবার কখন কি দরকার সেসব খেয়াল রাখছে। 


হঠাৎ চৌধুরী সাহেব সৈকত কে ডেকে পাশে বসতে বললেন। 

সৈকত হাসিখুশি মুখ নিয়ে তার বাবার পাশে গিয়ে বসে । 


—জানো সৈকত এতদিনের আমার মনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়েছে। আমি যে আজ কতটা খুশী তা তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না। 


সৈকত বুঝতে পারে তার বাবা কি  জন্য কথা গুলো বলছে তাই মাথা নিচু করে চুপ করে শুনতে থাকে । 


—আজ এখন যদি আমার মৃত্যু ও হয়ে যায় তবুও আমার নিজের প্রতি আর কোন আক্ষেপ থাকবেনা। 

—এসব কি বলছেন বাবা আপনি। আর কেনইবা বলছেন। আজ এতদিন পর আমি আমার ভুলটা বুঝতে পেরেছি আপনাকে আপন করে পেয়েছি আর আপনি কিনা----


—আমাকে বলতে দাও সৈকত।  

তুমি হয়তো কল্পনাও করতে পারবে না যে আজ আমি এই পৃথিবীর কতটা সুখি মানুষ । শুধু একটা জিনিস আমার অপূর্ণ থেকে গেল। 

—কি বাবা সেটা আমাকে বলুন আমি আপনার সব অপূর্ন চাওয়া গুলো পূরণ করতে চেষ্টা করবো। 


হঠাৎ ঝিনুক এসে বলে বাবা এখন তোমার রাতের খাওয়ার আগে ঔষুধ খাওয়ার সময় । 


সৈকত উঠে গিয়ে ঔষুধগুলো এনে খাবার  খাওয়ার আগের ঔষুধ গুলো চৌধুরী সাহেব কে খাইয়ে দেয় । 


ঝিনুক বলেঃ

—দেখ বাবা তোমার এই ছেলেকে পেয়ে তোমার ঐ মা টাকে যেন ভুলে যেও না। 


সৈকত বলেঃ

—কেনরে তোর হিংসা হচ্ছে বুঝি??

—আমার হিংসা হবে কেন??কষ্ট হচ্ছে। 

—কষ্ট হচ্ছে !!?কিন্তু কেন!!

—ভাবির কথা মনে করে । বেচারি!! শরীরটা পড়ে আছে বাবার বাড়ি আর মনটা এখানে। 

জানো বাবা বাড়ি আসার পর থেকে ভাবি ঘন্টায় ঘন্টায় ফোন করছে । তুমি এখন কেমন আছো, কি করছো ,খাইছো কিনা এসব জিঙ্গাসা করছে শুধু। 

এই যে এখন একটু আগে ফোন করে বলে দিল তোমার খাবার খাওয়ার আগের ঔষুধটা খাইয়ে দিতে। 


চৌধুরী সাহেব হেসে বললো এই না হলে আমার মা!!?

 দুরে বসেও ঠিকই ছেলের খোজ নিচ্ছে। 


চৌধুরী সাহেবের কথাটা শুনে হঠাৎ  সৈকতের মনটা কেন জানি খারাপ হয়ে যায়। 


চৌধুরী সাহেব সৈকতের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে । 


সৈকত ঝিনুককে বলে যা বাবার রাতের খাবারটা কাউকে দিরে যেতে বল। 


ঝিনুক আচ্ছা বলে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। 


—আচ্ছা বাবা একটা কথা জিঙ্গাসা করবো যদি আপনি অনুমতি দেন। 

—হ্যা । 

—আপনি কেন এসব কিছু আমাদের থেকে লুকিয়ে রাখলেন?


চৌধুরী সাহেব সৈকতের কথা শুনে কিছুক্ষন চুপ করে কি যেন ভাবেন। তারপর বলেঃ

—আমি চাইনি সন্তানদের চোখে তাদের মা কে ছোট করতে। 

আমি চাইনি আমার স্ত্রীর মান সম্মান এতটুুকু ও নষ্টহোক। 

—আর সে যে আপনার মান সম্মান নিয়ে খেলা করলো? আপনার সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিতের মুখে ঠেলে দিয়েছিল তখন?

—আমার আর মান সম্মান কোথায় নষ্ট হলো!!তবে তোমাদের ভবিষ্যৎ কিছুটা অনিশ্চিতের মধ্যে দিয়েই কাটছিল। 

আমার ভয় হতো এই ভেবে যে আমি তোমাদের মানুষের মত মানুষ করে গড়ে তুলতে পারবো কিনা। আমার ভয় ছিল তোমরা তোমাদের মায়ের কথা মনে করে তার অনুপস্থিতির কারণে ভুল পথে পা বাড়াও কিনা!! আর এ জন্যেই

আমি তোমাদের তখম বেশি বেশি সময় দিয়েছি। 

—আচ্ছা বাবা আপনি যখন বুঝতে পারলেন যে ওই আগুনে ঝলসানো দেহটা অন্যে কারো ছিল তখন কেন অন্যে কোন পদক্ষেপ নিলেন না?

—যখন জেনে ছিলাম তখন অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছিল। আর এ কথাটা ফরেনসিক রিপোর্টে ধরা পড়ে । যখন একথা শুনেছিলাম তখন আমার শুধু মনে হয়েছিল কেন আমি এখনো বেচে আছি ?কেন তাকে আমার জীবন থেকে এভাবে এত কিছু করে চলে যেতে হলো ?

সে যদি বলতো যে তার জীবনে আমার দরকার নেই তাহলে আমি হাসি মুখেই তার জীবন থেকে হয়তো সরে আসার চেষ্টা করতাম কিন্তু-----

চৌধুরী সাহেবের চোখ দুটো ছল ছল করে  ওঠে। কন্ঠ বুজে আসে । কথা বলতে কষ্ট হয় । 

তারপর  একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে তখন চাইলে অনেক কিছুই করতে পারতাম কিন্তু করিনি। আমি তার সুখের পথের বাধা হতে চাইনি। তাকে দূর থেকে ভালবেসেছি তার ভালথাকার জন্য নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। 


সৈকত আর কিছু বলে না । 

কি বা বলবে!!?

বলার জন্য কোন কথাই খুজে পাই না। 

যে বাবাকে সে এতদিন খুনি,লোভী আর স্বার্থপর ভেবেছিল আর সেই 

কিনা -------!!??

নিজের কথা না ভেবে দিনের পর দিন আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে একা নিঃসঙ্গ ও নিস্বার্থ ভাবে জীবনটা পার করে দিলেন মনের মাঝে একজনকে রেখে। 

আর আমি তাকে কতোটা কষ্ট দিয়েছি দিনের পর দিন আর বছরের পর বছর। 


ঝিনুক খাবার নিয়ে আসে । 

সৈকত খাবারটা নিয়ে  নিজ হাতে চৌধুরী সাহেবের মুখে তুলে খাইয়ে দেয় । 

তারপর বাকি ঔষুধ গুলো খাইয়ে ঘুমানোর  আগ পর্যন্ত তার বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। 


সৈকত যখন বুঝলো তার বাবা ঘুমিয়ে পড়েছে তখন নিঃশব্দে উঠে নিজের রুমে চলে আসে । 


একটা মানুষ যে অন্য একটি মানুষকে এতটা ভালবাসতে পারে তা হয়তো সৈকত বিশ্বাসই করতো না আজ নিজের বাবাকে না দেখলে। 


রুমে ঢুকে দেওয়ালে ঝুলানো মেঘ আর নিজের সেই ছবির দিকে তাকিয়ে সৈকতের বুক থেকে একটি দীর্ঘশ্বাস  বের হয় । 

ছবিটা দেওয়াল থেকে খুলে এনে দুহাতে ধরে অনেকক্ষন সময় নিয়ে মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকে আর ছবিটার সঙ্গে কথা বলে । 

ইচ্ছে করছে অভিমানী মেয়ে টাকে একটু ছুয়ে দেখতে কিন্তু পারছে না। নিজের অজান্তে ছবিটাতে হাত বুলায় সৈকত । মনে হচ্ছে এতদিনে শুষ্ক মরুভূমি কিভাবে  যেন ভিজতে শুরু করেছে--------


(চলবে)

Comments