বেখেয়ালি ভালবাসা পর্ব ৬

 #বেখেয়ালি_ভালবাসা

লেখাঃ #সাবেরা_সুলতানা_রশিদ

#পর্ব৬


১৬.


মেঘ চুপচাপ শুয়ে পড়ে আর কোন কথা না বলে। সৈকত ও লাইট অফ করে শুইয়ে পড়ে। 


একটু পরে মেঘ শুনতে পায় সৈকতের নিশ্বাস  টা ভারী হয়ে গেছে। তারমানে সে এখন ঘুমাচ্ছে। মেঘ বালিশে মুখ গুজে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। 

সৈকত প্রথম থেকে যেভাবে ছিল তাও ভাল ছিল ওর আচরণে কষ্ট পেলেও আশে পাশেই থাকা যেত। কিন্তু হঠাৎ করে মানুষটা ভালবাসায় সিক্ত করে আবার দূরে ঠেলে দিচ্ছে না এটা কে দূরে বলা যাবে না,ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে।  


মেঘ কি করবে !!?কিভাবে সবটা সামলাবে বুঝতে পারে না। 

কান্না করতে করতে কখন যে একটু ক্লান্ত চোখটা বুজে এসেছিল মনে নেই । হঠাৎ আযানের শব্দ কানে আসতেই ঘুম ভেঙ্গে যায় মেঘের। নিঃশব্দে উঠে এসে ওযূ করে অশান্ত মনটাকে একটু শান্ত করার জন্য নামাজে দাড়িয়ে পড়ে। 

নামাজ শেষ করে মোনাজাতে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাই প্রাণ খুলে। 

তারপর বেলকনিতে দাঁড়িয়ে  বাইরে পাখির কিচিরমিচির  ডাক শুনতে থাকে । 

নামাজ পড়ার পর মেঘের মনটা অনেকটাই হাল্কা হয়ে যায় । 


মেঘ রুমে এসে সৈকতের  অফিসে যাওয়ার ড্রেস গুলো সব বের করে নীচে চলে যায়। 


সবাই ঘুম থেকে ওঠার আগেই কিচেনে গিয়ে নিজ হাতে সবার জন্য নাস্তা তৈরি করে । 

ঘড়ির কাটা সাতটা বাজতেই রুমে এসে সৈকতকে ঘুম থেকে ডেকে দেয়। 

সৈকত উঠতে না চাইলে মেঘ রাতের কথা মনে করিয়ে দেয়। 

 যখন বললো আপনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন যে কয়দিন আমি এ বাড়িতে থাকবো আপনি বাবার কথামত চলবেন। 

সৈকত ঘাড় নাড়িয়ে হ্যা বলে তাড়াতাড়ি  করে উঠে পড়ে। 


রেডি হয়ে নীচে আসবেন।  আজ বাসার অন্যেদের সঙ্গে বসে নাস্তা করবেন। 


সৈকত কোন কথা না বলে বাথরুমে ঢোকে। 


মেঘ মনে মনে ভাবে যাক আমার যাওয়ার কথা শুনেও অন্তত উনি বাবাকে খুশি করতে পারলে আমি তাতেও সুখী। 


মেঘ বিছানা গুছিয়ে ফুলের টবের ফুল গুলো পাল্টে দেয়। এলোমেলো জিনিস গুলো সব গুছিয়ে রুম টাকে সুন্দর করে সাজায়। 


বাসার অন্যে সবাই ততক্ষনে উঠে গেছে। 


রোজি তাড়াহুড়ো করে ঘুম থেকে উঠে এসে অবাক হয়ে যায় তার বলার আগেই সবার নাস্তা রেডি দেখে। 

কাজের লোককে ডেকে জিঙ্গাসা করতেই বলে সব ছোট ম্যাডাম করছে। 

রোজি মনে মনে খুব খুশী হয়। 


এই কয়েক দিন অনির অসুস্থতার জন্য ক্লিনিকে থাকতে ভাল করে ঘুমাতে পারেনি। তাই আজ সকালে তার ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরি হয়েছে। 


মেঘ নীচে নামতে রোজি এগিয়ে বললোঃ

—কিরে আজ এত সকাল সকাল উঠে এসব করেছিস কেন?

—কেন ভাবি আমি কি করতে পারিনা?

—ধূর পাগলী তা কখন বললাম?আমাকে ডাকলেই তো পারতি আমি ও সঙ্গে করে দিতাম। তোর কষ্ট কম হতো। 

—আর কষ্ট!!এ আর এমন কি কষ্ট??

বলতেই মেঘের বুকের ভীতর  থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। 


রোজি মেঘের মুখের দিকে ভাল করে তাকিয়ে বলেঃ

—সত্যি করে বলতো কি হয়েছে??

—কই ভাবি ?কিছু হয়নি তো। 

—আমার থেকে লুকোচ্ছিস??

—কি যে বলো না!!কি লুকাবো??

—তাহলে তোর চোখমুখ এমন দেখাচ্ছে কেন ??

—এমনি। 

—সৈকত কিছু বলেছে তোকে?

—না,কি বলবে?

—সত্যি করে বল। 


সবাই নাস্তা করার জন্য টেবিলে এসে বসলো। 

মেঘ এগিয় গিয়ে সবাইকে খাবার এগিয়ে দেয় । 


রায়হান চৌধুরী বলেঃ

—সিলেট কেমন লাগলো রে মা?? 

—ভাল বাবা। 

—এই দুই দিনে তেমন কি বা দেখেছিস। হঠাৎ অনির একসিডেন্ট হল তাই তোদের কেও চলে আসতে হলো। 

—যতটুকু দেখেছি ঘুরেছি অনেক ভাললেগেছে। 


হঠাৎ পায়ের শব্দে শুনে মেঘ দেখে সৈকত আসছে। 

মেঘ কোন কথা না বলে সৈকতের বসার চেয়ার টা টেনে দিয়ে একটু সরে দাড়ায় । 

সৈকত চুপচাপ এসে চেয়ারে বসে । 


নাস্তার টেবিলে বসা সবার চোখ যেন কপালে ওঠে। এত বছরে যেটা কেউ দেখেনি আজ সেটা হচ্ছে। 

ঝিনুক মেঘের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে আর বিড় বিড় করে বলে ভাবি ইউ আর গ্রেট। 


রায়হান চৌধুরীর খুশিতে চোখে পানি এসে যায়। মেঘের দিকে তাকিয়ে উনি বিশ্বজয়ের হাসি হাসেন। 

মনে হচ্ছে আজ রায়হান চৌধুরী বিশ্বজয় করে ফেলেছেন। 

মেঘের প্রতি তার অঘাধ বিশ্বাস ছিল যে ঐ পারবে তার সৈকত কে ভাল করতে । আর আজ সেটাই প্রমাণিত  হল। 

তিনি মানুষ চিনতে ভুল করেন না। শুধু একবার সেই ভুল টা হয়ে ছিল। আর সেই ভুলটার জন্যই সব ----------


সৈকত খেয়াল করে সবাই হা হয়ে আছে । 

তাই গলাটা কেশে একটু নড়েচড়ে বসে বলেঃ

কি হলো সবাই হা করে কি দেখছো ??

আমি কি মানুষ?না চিড়িয়াখানার কোন চতুষ্পদী  জন্তু??


ঝিনুক বলেঃ

—আমি বুঝতে শেখার পরে কখনো তোকে আমাদের সঙ্গে বসে খাবার খেতে দেখিনি। আজ তোকে এভাবে দেখে আমার কি যে আনন্দ হচ্ছে বলে বোঝাতে পারবো না। 


মেঘ এগিয়ে এসে সৈকতের প্লেটে খাবার দিত গিয়ে চোখ পড়ে সৈকতের হাতে। সৈকত মেঘের দেওয়া হাতঘড়িটা তাহলে পরেছে। অবশ্য মেঘ সৈকত কে বলেনি যে সে ওটা নিজে পচ্ছন্দ  করে তার জন্য এনেছে।  

রাতে সৈকতের মুখে কথা গুলো শোনার পরে আর গিফট গুলো  দেওয়া হয়েছিল না।  

তাই মেঘ সকালে সৈকতের ড্রেসের সাথে হাতঘড়ি টা রেখে আসে। আর কোর্টের পকেটে মোবাইল টা রেখে দেয়। ডায়েরিটা সৈকতের আলমারি  তে রেখে দেয়। কোন না কোন সময় নিশ্চয় সৈকতের চোখ পড়বে ওটার উপর। 

 

মেঘ মনে মনে খুব খুশি হয় সৈকত তার দেওয়া ঘড়িটা পরেছে বলে। 


রাফি(সৈকতের বড় ভাই)বলেঃ

—সৈকত তোর মনে আছে আগে যখন আমরা তিন ভাই একসঙ্গে খেতে বসতাম তখন খাবার কাড়াকাড়ি করতাম ঠিক এই ভাবে বলেই সৈকতের প্লেট থেকে এক টুকরো মাংস তুলে নেয়। 


রাকিব (মেঝ ভাই)হো হো করে হাসতে শুরু করে । 


সৈকত বলে আর ঠিক আমি তখন মেঝ ভাইয়ের পিঠে চিমটি দিতাম আর মেঝ ভাই মনে করতো তুমি দিয়েছ। শুরু হতো তোমাদের দুজনের মারামারি আর ততক্ষনে তোমাদের প্লেটের কিছুকিছু খাবার আমার পেটে ঢুকে যেত। 


এতগুলো বছর পর সেই পুরাতন স্মৃতি রায়হান সাহেবের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। চোখ দুটো হঠাৎ করেই ঝাপসা হয়ে যায়। 


সবার স্মৃতিপটে তখন আগের দিনের সুখি পরিবারের ছবি ভেসে ওঠে। 


ঝিনুক উঠে এসে বলে আজ আমাদের সবার একটা গ্রুপ সেলফি হয়ে যাক। 

মেঘ বলে না সেলফি না। রিয়েল ছবি। ঝিনুকের হাত থেকে আই ফোন টা নিয়ে মেঘ কিছু ছবি তোলে । ছবি তে সবাই আছে শুধু মেঘ বাদে। 


আজ বাড়িতে যেন চাঁদের হাট বসেছে। 

বাড়ির প্রত্যেকটি মানুষ খুব খুব খুশি। 

কাজের লোকগুলোও এ খুশিতে সামিল হলো। 


সবাই খাওয়া শেষ করে অফিস যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় । 


রায়হান চৌধুরী মেঘের কাছে এগিয়ে এসে মাথায় হাত রেখে বলে আমি জানতাম তুই পারবি। 

আমি তোকে প্রান ভরে দোয়া করি মালিক যেন তোর মনের সকল ইচ্ছা আকাংখা গুলো পূরণ করে দেয়। 


মেঘ ছলছল নয়নে বলেঃ

—দোয়া করবেন বাবা আমি যেন আমার কাজে সফল হতে পারি। সামনে যে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ঐ পরীক্ষায় হেরে গেলে যে 

আমি ----------------


—আমি জানি তুই কখনো কোন পরীক্ষায় হারবি না। এই ভরসা আমার আছে। 

এখন আমি অফিসে যায় তোর গিফট টা আমি পরে দেব। 

—কিসের গিফট!!?

—তুই যে আজ এত দিনের অসাধ্য সাধন করলি তার পারিশ্রমিক  । 

—আমার কিছু লাগবে না বাবা। শুধু

 আপনি দোয়া করবেন। 

—সেটা তো সবসময় করি। আর যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন করবো। 

আচ্ছা শোন আমি মনে হচ্ছে একটা কাগজ ভুল করে আমার রুমে রেখে চলে এসেছি। 

—কিসের কাগজ বাবা??

—পার্টি অফিসের একটা জরুরী কাগজ। 

—আচ্ছা আমি এখনি এনে দিচ্ছি। 

—আমার আলমারির ভিতরে বাম পাশের ড্রয়ারে রাখা আছে। 


আচ্ছা বলে মেঘ দ্রুত তার শ্বশুরের রুমে ঢুকে আলমারি  খুলে ড্রয়ার থেকে কাগজ টা বের করতেই সাথে নীচে একটা খাম পড়ে যায়। 


ও পাশ থেকে রায়হান চৌধুরী বলে পেয়েছিস??


মেঘ ফ্লোরে পড়া খামটা না উঠিয়ে দ্রুত বের হয়ে বলেঃ

—হ্যা বাবা এইতো। 


চৌধুরী সাহেব খামটা নিয়ে বেরিয়ে যায়। 


মেঘ শ্বশুর কে বিদায় জানিয়ে দরজা আটকে শ্বশুরের রুমে যায় আলমারি  টা আটকাতে । 

ফ্লোরে পড়ে থাকা খামটা হাতে নিয়ে দেখে 

এটা একটা বিয়ের কার্ড। 

মেঘ কার্ডটা খুলে দেখে পাশাপাশি হবু বর কনের ছবি দেওয়া। নীচে ঠিকানা দেওয়া। 

কনের বাবা মায়ের নাম দেখে মেঘের মনে হলো নাম টা তার পরিচিত। কোথায় যেন কনের মায়ের নাম টা শুনেছে। 


মেঘ কার্ড টা তুলে ড্রয়ারে রাখার সময় নজর পড়ে একটা ছবির উপর। 

ছবি টা তুলে হাতে নিয়ে দেখে তার শ্বশুরের পাশে এক ভদ্রমহিলা । মেঘ মনে মনে ভাবে ইনি তাহলে শ্বাশুড়ীমা । 

দুজনের অল্প বয়সের ছবি এটা। শ্বাশুড়ি মা দেখতে তো অনেক সুন্দরী ছিলেন। এ জন্যই বোধহয় তার ছেলে মেয়ে গুলো এত সুন্দর। 


মেঘ জিনিস গুলো যেমন ছিল ঠিক সেভাবে গুছিয়ে নিজের রুমে চলে যায়। 


————**——**——**————


সৈকত মন দিয়ে অফিসের কাজ করছে। 

হঠাৎ তার অফিস রুমে ফোনের রিং বাজার শব্দ শুনে এদিক ওদিক তাকাতে লাগলো। 


তার অফিস রুমে টেলিফোন আছে কিন্তু মোবাইলের রিংটোন-----


সৈকত এদিক ওদিক তাকিয়ে উঠে দাড়াল। ফোন টা ততক্ষনে কেটে গেছে। 

একটু পর আবার বাজতে শুরু করলো। 

সৈকত অফিসে এসে কোর্ট টা খুলে রেখেছিল। 

সৈকতের মনে হল শব্দটা তার কোর্ট থেকেই আসছে । 


সৈকত কোর্ট হাতে নিয়ে পকেট চেক করতেই ফোন টা পেয়ে গেল। 

সৈকত দেখে মেঘ নাম ভেসে উঠেছে। 

এটা তাহলে ওর কাজ!!


সৈকত ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মেঘের কন্ঠস্বর ভেসে এলো। 

—দুপুরের খাবার খেয়েছেন??

—না ,একটু পর খাবো। 

—দুইটা পার হয়ে গেছে খেয়ে নিন। 

—তার আগে বলো এটা কি ??

—কোনটা??

—এভাবে আমার কোর্টের পকেটে মোবাইল  রাখার!!

—কে বললো ওটা মোবাইল??

—তাহলে!!?

—ওটা তো সাইরেন। 

—হা হা হা । আমার কথা আমাকে বলছো। তা আমাকে কেন এটা দিলে, আমি এটা পচ্ছন্দ করি না। 

—জানি । আমার পচ্ছন্দ  হলো আর মন বললো এটা আপনার দরকার তাই দিয়েছি । বাকি টা আপনার ইচ্ছা। 

—হুম। 

—ধন্যবাদ 

—আমাকে ধন্যবাদ!!?কেন??

—সকালে ঘড়িটা পরার জন্য। 


সৈকত তোমার লাঞ্চ রেডি। খাবে এসো। 

আসছি “সুইটি”!!!!-------


১৭.


মেঘ ফোনের ওপাশে মেয়ের কন্ঠ শুনেই আর কোন কথা না বাড়িয়ে ফোনটা রেখে দেয়। 

ভাবনার জগৎ টা আজ বড্ড বেশী উচ্ছৃখল বড্ড বেশী বেখেয়ালি হয়ে গেছে। 

কোন ভাবেই মনের জগৎ থেকে সৈকতকে বের করতে পারছে না। কে হতে পারে যে সৈকতকে নাম ধরে ডেকে লাঞ্চ করার কথা বললো!!?

এ কি সেই মেয়েটা?

যে সৈকতের সাথে শপিংমল আর গাড়িতে ছিল। 

কে সে??

আর জেনেশুনে সৈকতের সাথেই বা কেন এমন করছে?

কি সম্পর্ক তার  সৈকতর সাথে??

ভালবাসা না অন্যেকিছুর!!?

না,আমি আর ভাববো না এসব কিছু। 

কি লাভ এসব ভেবে?

আমাকে তো আমার সব মায়া কাটিয়ে কিছুদিন পর চলেই যেতে হবে। 

তাহলে শুধুুশুধু কেন এত চিন্তা করছি??

যদি মেয়েটা সত্যি সৈকতের তেমন কিছু হয় তাহলে হয়তো সে  নিজেই সৈকতের অনেক খেয়াল রাখবে । 

আমার আর সৈকত কে নিয়ে ভাববার কিছু নেই। 

হাতে সময় কম । এখন আমার বাকি কাজ গুলো তাড়াতাড়ি শেষ করে এখান থেকে চলে যেতে হবে। 

হ্যা চলে যাব অনেক দূরেই চলে যাবো। 

এই শহর ,এই বাড়ি ,এই বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষকে ছেড়ে আমি চলে যাবো। 

কথা গুলো ভাবতে ভাবতে চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে ওঠে মেঘের। 


—ভাবি আসবো??

ঝিনুকের কন্ঠ পেয়ে মেঘ চোখ মুছে স্বাভাবিক হয়ে বলেঃ

— হুম এসো। আমার কাছো আসার জন্যে আর অনুমতি নেওয়ার কি আছে?

—তারপরও । আমি তো ভাবলাম তুমি ঘুমাচ্ছো। 

—না,

ঝিনুক নিজেরাত দুটো পিছনে রেখে বলে—ভাবি চোখ  বন্ধ করো।

—কেন!!

—করোই না ,তারপর বলছি। 


মেঘ চোখ বন্ধ করে। 

ঝিনুক পেছন থেকে হাত মেঘের  সামনে এনে বলে এবার চোখ খোল। 


মেঘ চোখ খুলতেই অবাক হয়ে যায় । 

—আরে এই ছবি তুমি কোথায় পেলে?

—উুহহু। আইডিয়া করো। 

—তুমি কখন তুলেছিলে এটা?

—যখন তুমি পড়ে যাচ্ছিলে ভাইয়া তোমাকে ফিল্মের নায়কের মত করে ধরে ফেললো। তোমরা হারিয়ে গিয়েছিলে কিছুটা সময়ের জন্য অদৃশ্য কল্পনায় । ঠিক তখনি আমি ছবিটা তাড়াতাড়ি  করে তুলে ছিলাম। 


মেঘ ছবিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষন ধরে দেখে। সত্যি সেদিন মেঘ সৈকতের চোখে কিছু একটা দেখেছিল । কিন্তু তার সেই দেখা চোখে এখন যে অন্যে কিছুর ইঙ্গিত  করছে। 


—ভাবি তোমার জন্য আরেকটি গিফট আছে। 

—আরেকটা গিফট!!কি সেটা?


ঝিনুক মেঘ কে একটি ডিজিটাল ফটো ফ্রেম গিফট করে ।

—ভাবি এটাতে তোমাদের বিয়ের কিছু ছবি আর জাফলং থেকে তোলা কিছু ছবি আছে। এগুলো যত্ন করে রেখে দিবে । ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। 

—কি কাজে লাগবে শুনি?

—বা----রে আমি যখন ফুফি হবো তখন পিচ্চি দের এ ছবি গুলো দেখাতে হবে না। 


মেঘ কোন কথা বলে না। চুপ হয়ে যায়। 

—এই ছবিটা কেন বড় করে এনেছি জানো?

—না, কেন??

—কারণ এই ছবিটা এখন থেকে দেওয়ালে লাগানো থাকবে। বলেই মেঘের হাত থেকে ছবিটা নিয়ে ঝিনুক দেওয়ালে ঝুলিয়ে দেয়। 

এবার দেখ কি সুন্দর লাগছে। দেখ ছবি দেখে ভাইয়া নির্ঘাত আজ অবাক হবে। 


—হ্যা ঠিকই বলেছ। শুধু অবাক না শকড ও হবে। 

আচ্ছা এসব বাদ দাও। তুমি আমাকে একটা কথা বলতো। 

—কি কথা??

—আচ্ছা তোমার সেই দাদির নাম টা মনে আছে??

—কোন দাদি?

—আরে যে শ্বাশুড়ী মা মারা যাওয়ার পর তোমাদের কাছে ছিল। 

—ও আচ্ছা। হ্যা মনে আছে। কিন্তু কেন??

—কি নাম?

—রেহানা । 


মেঘ মনে মনে যা ভেবেছিল ঠিক তাই হলো। তাহলে ঐ কার্ডে ওনার নাম দেওয়া ছিল। নিশ্চয় ওটা তার মেয়ের  বিয়ের কার্ড। 

কিন্তু তার তো ছেলে মেয়ে ছিল না। তাহলে!??


—আচ্ছা ঝিনুক পরে যার সাথে ওনার বিয়ে হয়ে ছিল তার ও কী আগে কোন বিয়ে হয়ে ছিল। 

—হ্যা। দাদা আগের স্ত্রী মারা যায় একটা ছেলে আর একটা মেয়ে রেখে। তাই তো বাবা উনাকে বিয়ে দিয়েছিলেন। 

কিন্তু তুমি আজ হঠাৎ এসব জানতে চাইছো??

—না,এমনি। 

—আচ্ছা ভাবি তুমি রেস্ট করো আমি যায়। 

—ঠিক আছে। 


ঝিনুক রুম থেকে বের হতেই মেঘ তাড়াতাড়ি করে রেডি হয়ে রোজিকে একটা কাজ আছে বলে বেরিয়ে পড়ে । 

বাড়িতে গাড়ি থাকা সত্বেও মেঘ কোন গাড়ি না নিয়ে রাস্তায় এসে একটা ট্যাক্সি ভাড়া নেয় । 

ট্যাক্সি ড্রাইভার কোথায় যাবে জানতে চাইলে একটা ঠিকানা বলে দেয়। 

ট্যাক্সি চলতে শুরু করে । 

আর মেঘের মাথার মধ্যে অনেক গুলো প্রশ্ন এলোমেলো হয়ে ঘুরে বেড়ায়। 

মেঘ জানেনা সে যেখানে যাচ্ছে আদেও সেখানে গিয়ে তার কোন লাভ হবে কিনা!!

তবুও মেঘ একবুক আশা নিয়ে যাচ্ছে। 

মেঘ জানে যে উদ্দেশ্য নিয়ে সে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে সেটা তার জন্য অনেক কঠিন হতে পারে । 


ট্যাক্সি  ড্রাইভার  পথে দুই বার গাড়ি থামিয়ে লোকের কাছে মেঘের দেওয়া ঠিকানার কথা জিঙ্গাসা করেছে। 


হঠাৎ গাড়িটা একটি দোতলা বাড়ির সামনে এসে থামে। মেঘ ভাড়া পরিশোধ করে ধীর পায়ে গেটের ভিতরে প্রবেশ করতেই  এক বয়স্ক লোক এগিয়ে আসে। 

—কে তুমি?এখানে কি চাও??

মেঘ সালাম দিয়ে বলেঃ

—জ্বী আমি রেহানা দাদীমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি চৌধুরী বাড়ি থেকে। 

—তুমি চৌধুরী বাড়ি থেকে এসেছ!!?কে মা তুমি?

—আমি চৌধুরী বাড়ির ছোট বউ। 

লোকটার চোখে মুখে খুশির ছাপ ফুটে ওঠে। এসো ,এসো ,ভিতরে এসো  । 

বলে লোকটা আগে আগে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে । 

মেঘ তার পিছুপিছু যায় । 


—দেখ রেহানা দেখ কে এসেছে তোমার সঙ্গে দেখা করতে। 

তুমি বসো। তোমার দাদী মনে হচ্ছে নামাজ পড়ছে। আমি ভিতরে গিয়ে দেখে আসি বলে লোকটা একটা রুমের ভিতরে চলে গেল। 


মেঘ ড্রয়িং রুমে 

ঘরে ঢুকে ওয়ালের দিকে তাকাতেই দেখে অনেক ছবি ঝুলছে । তার মানে এতক্ষন যে কথা বলছিল উনি সৈকতের দাদা হন। 


মেঘ ছবি গুলো দেখে চুপচাপ বসে থাকে। 

একটু পরে দুজন একসঙ্গে মেঘের সামনে এসে দাড়ায় । 

মেঘ দুজনকে সালাম করে । 


রেহানা মেঘের মাথায় হাত রেখে বলে যেমন সুন্দর আমার নাতি ঠিক তেমন সুন্দরী নাত বউ হয়েছে। 

—কি নাম তোমার?

—মেঘ

—সুন্দর নাম। আচ্ছা তুমি যে এখানে এসেছ সেটা কি কেও জানে?

—না। 

—তাহলে তুমি আমার কথা জানলে কি করে ??আর ঠিকানায়  বা কোথায় পেলে?

—সে অনেক কথা। বলতে গেলে অনেক দেরি হয়ে যাবে। তবে আপনাকে সংক্ষেপে বলি আপনি বুজতে পারবেন। বলে। মেঘ দাদীকে ঝিনুকের কাছ থেকে শোনা কথা গুলো বলে। আর ঠিকানা বিয়ের কার্ড থেকে পেয়েছে সেটাও বলে। 


রেহানা বেগম মেঘের মুখ থেকে সব শুনে মেঘ কে বলেঃ

—আমার কাছে কি জানতে চাস?

—দাদীমা আমি ঐবাড়ির সত্যিটা জানতে চাই। আপনি তো জানেন বাবা আর সৈকতের মাঝে একটা দেওয়াল তৈরি হয়ে আছে। আমি তাদের দুজনের মধ্যকার  সেই দেওয়াল টা ভাঙ্গতে চাই। 

আমি বাবা আর সৈকত কে এক করতে চাই। 

—আমি তোকে কিছু বলতে পারবো না। 

— কেন বলতে পারবেন না দাদীমা?

—কারণ রায়হান নিজে আমাকে সেটা অন্যেদের না জানানোর জন্য কশম দিয়েছিল। আমি ওকে কথা দিয়েছিলাম যে কাউকে বলবো না। 


—দাদীমা আপনি কি চান না ,য বাবা আর ছেলে মিলে যাক। সৈকতের মনে বাবাকে নিয়ে যে ভুল ধারণা আছে তা ভেঙ্গে যাক। 

দাদীমা আমি তো ঐ বাড়িতে বেশীদিন বৌ হয়ে আসি নি। তবুও এ কদিনে আমি বাবাকে যতটুকু জেনেছি বুঝেছি বাবা খুব নরম মনের মানুষ। বাবা ভিতরে ভিতরে দিন দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে । কিন্তু সেটা প্রকাশ করতে পারছে না। 


—আমি জানিরে । রায়হান কে আমার থেকে ভাল আর কে জানবে। আমি ওকে ছোটবেলা থেকে দেখেছি জেনেছি। 

নিজের ক্ষতি হয়ে যাক কিন্তু ও অন্য কারোর কোন ক্ষতি হতে দেয় না। 


—বাবা খুব কষ্ট পাচ্ছে দাদীমা। বাবা মনে মনে আমার উপরে ভরসা করে থাকে আমি সৈকতের মনের সব ভুল ভাঙ্গিয়ে সঠিক পথে নিয় আসবো বলে । কিন্তু আমি যদি সবটা না জানি তাহলে কি ভাবে তা সম্ভব ??

—আমি সব জানি। রায়হান গত পরশু এসেও আমার কাছে কান্না করছে সৈকতের কথা বলে। সৈকত যে তাকে কখনও বাবা বলে ডাকেনা এটাই ওর সবচেয়ে বড় কষ্ট। 

—প্লিজ দাদীমা আমাকে সব খুলে বলো। আমি কাউকে বুঝতে দেব না যে তোমার থেকে সবটা জেনেছি। আমি খুব সতর্কতার সাথে বিষয়টা ধীরে ধীরে সবার সামনে নিয়ে আসবো। 

—না,খবরদার এমন ভুল করিস না। তাহলে রায়হান একেবারে শেষ হয়ে যাবে। রায়হান চাইনা তার ছেলে মেয়ে সব সত্যিটা জানুক। তারা এতদিন যা জেনে এসেছে তাই জানবে । তুই জানিস কেন আমি আর ও বাড়িতে যায় না??

—কেন দাদীমা?

—কারণ রায়হান আমাকে যেতে নিষেধ করেছে বলে। ওর ভয় হয় যদি আমি ওর সন্তানদের সব সত্য টা বলে দিই তাই। 

—তাহলে আমার কি করা উচিত দাদীমা আপনিই বলুন!!


—তুই শুধু সৈকত আর রায়হানের মাঝের দেওয়াল টা ভেঙ্গে দে। অন্যে সবাই যে যেমন আছে তাদের সে ভাবেই থাকতে দে।

—কিন্তু সেটা কিভাবে??!

—আমি যা বলছি মন দিয়ে শোন। পরে তুই যেভাবে পারবি নিজের মত করে সৈকতের সামনে জিনিষটা উপস্থাপন করবি। 

দাদীমা চৌধুরী বাড়ির সত্যি ঘটনা একটু  একটু করে বলতে থাকে আর মেঘ ততই যেন বিস্মিত আর বাকরুদ্ধ  হয়ে যায় । 

————**——**——**————


মেঘ দাদীমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি পৌছাতে অনেক টা দেরি হয়ে যায়। 

ততক্ষনে সবাই অফিস শেষ করে বাসায় ফিরেছে । 

হল রুমে বসে আড্ডা দিচ্ছে। 

মেঘ বাসায় ঢুকতেই রোজি এগিয়ে যায়

—কিরে এতক্ষন কোথায় ছিলি?

—একটা কাজের কথা বলেছিলাম সেটা করতেই দেরি হয়ে গেল। 

—ঠিক আছে তুই ফ্রেশ হয়ে নে আমি নাস্তা দিতে বলি। 

—না ভাবি আমি এখন কিছুই খাব না। 

—কেন রে?শরীর খারাপ করলো নাকি?

—না,আমি ঠিক আছি । ওনাকে তো দেখছি না । বাসায় ফেরেনি এখনো?

—কার কথা বলছিস বলতো?

—কার কথা আবার বুঝতে পারছো না,কার কথা বলছি?

—না, বুঝতে পারছি না। বলে মিচকি হাসতে থাকে রোজি

—তাহলে থাক আর বুঝতে হবে না। বলে মেঘ সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে যায়। 


রোজি নীচ থেকে মেঘ কে শুনিয়ে একটু জোরে জোরে বলে তবে যায় বলিস তুই কিন্তু অসাধ্য সাধন করেছিস। কিভাবে করলি সেটা কিন্তু শুনবো। 


মেঘ রোজির কথা শুনে বিড় বিড় করে নিজের সাথে কথা বলেঃ

অসাধ্য আর সাধন করতে পারলাম কোথায়!!?বরং নিজের কপাল নিজেই পোড়াচ্ছি। এমন পোড়াকপাল যে নিজের স্বামীর ভালবাসায় পেলাম না। 


রুমে ঢুকে লাইট অন করে কাপড় চেন্জ করতে গিয়ে মেঘের  নজর পড়ে দেওয়ালে ঝুলানো সেই ছবি টার উপর । 

মনে হচ্ছে সৈকতের ছবির সামনে দাড়িয়ে মেঘ লজ্জা পাচ্ছে। 

মেঘ কাপড় চেন্জ করে ছবিটা ধরে নিজ মনে সৈকতের সঙ্গে কথা বলতে থাকে। 

—আপনি এমন কেন বলুন তো?আপনার কি আমার জন্য একটু ও খারাপ লাগে না?আপনার কি একটুও চিন্তা হয় না যে আপনাকে ছেড়ে আমি কিভাবে থাকবো। আপনাকে ভালবেসে যে আমি একদম নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমার সবটা জুড়ে যে শুধু আপনি। সেটা কেন বুঝতে চান না?


হঠাৎ পিছন থেকে কথার শব্দ আসে

আমি অনেক কিছু বুঝতে চাই ও না। 

সৈকতের কন্ঠ শুনে মেঘ পিছন ফিরে দেখে সৈকত বেলকনির দরজায় দাড়িয়ে আছে। 


—আপনি !!কখন আসলেন?

—অনেক আগে। এসে শুনলাম তুমি কোথায় বেরিয়েছ। 

—একটা কাজ ছিল তাই। 

—আমি তো জানতে চাই নি সেটা। তোমাকে তো আমি মুক্ত করেই রেখেছি । কোন কিছুর জন্য তোমাকে আমার কাছে কখনও জবাবদিহীতা করতে হবে না। 

তুমি কি কাজে গিয়েছিলে বা অন্য কারো সঙ্গে লুকিয়ে দেখা করতে গিয়েছিলে সেটা সম্পূর্ণ তোমার নিজের ব্যাপার। 


সৈকতের শেষ কথা শুনে মেঘ চমকে ওঠে। তাহলে কি সৈকত কোন ভাবে জেনে গেছে যে ও দাদীমার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল!!

না ,সেটা তো অন্যে কারো  জানার কথা নয়। 

তাহলে!!?


মেঘ স্বাভাবিক হয়ে বলেঃ

—কি বলতে চাইছেন আপনি??

—তেমন কিছুই না। হতে পারে তুমি হয়তো তোমার এক্স বয়ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলে। 


সৈকতের ওমন কুরুচিকর  কথা শুনে  মেঘের পা থেকে মাথা পর্যন্ত শরীর জ্বলতে শুরু করে। 

মেঘ আর নিজের রাগ টাকে কন্টোল করতে পারে না। মেঘ একপ্রকার চিৎকার করেই বলে ওঠে 

—জাস্ট সাট আপ। আর একটা কথাও বলবেন না আপনি। আপনাকে ভালবাসি তাই বলে  এই না যে আপনি আমার ভালবাসাকে আমার দূর্বলতা মনে করে যখন যা খুশি তাই বলবেন। আর আমি তা সবটা মাথা পেতে মেনে নেব। 

আপনার কোন অধিকার নেই আমার চরিত্র নিয়ে কথা বলার । আমাকে ভালবাসতে পারবেন না ভালকথা । তাই বলে মিথ্যা অপবাদ কেন দিচ্ছেন মিঃচৌধুরী। 

আগে নিজের দিকে তাকান তারপর না হয় অন্যেকে নিয়ে কথা বলবেন। 


সৈকত মেঘের কথার কোন জবাব না দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। 


সৈকত রুম থেকে চলে যেতেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে মেঘ। 


১৮.


দুই তিন দিন পার হয়ে যায় মেঘ নিজের মত নিজে থাকে। সৈকতের সঙ্গে আর কোন কথাই বলে না। সৈকত ও মেঘ কে নিজ থেকে কিছুই বলে না। 


সৈকত অফিসে যাবার আগে মেঘ  নিজেই আগে থেকে সৈকতের অফিসে পরে যাওয়ার ড্রেস গুলো বের করে রাখে। সকালের নাস্তাও নিজে তৈরি করে রাখে। পরিবারের সবার সামনে দুজন হাসিখুশি থাকে । কেউ দেখলে বুঝতেও পারে না যে বদ্ধ রুমে চিত্রটা ঠিক এর উল্টো। 


সৈকত অফিস থেকে ফেরার পর খুব প্রয়োজন ছাড়া মেঘ আর রুমে আসে না।

সবার রাতের খাবার শেষ করার পর যখন সবাই ঘুমাতে যায় মেঘ ও ঠিক তখনই রুমে আসে । 

সৈকত ও ততক্ষনে ঘুমিয়ে যায়। 

আবার সৈকত ঘুম থেকে ওঠার আগেই মেঘ রুম থেকে বেরিয়ে যায়।  


এই দুই তিন দিনে সৈকত ও তার ফ্যামিলির সবার অনেকটা কাছাকাছি  চলে এসেছে। কিন্তু সে শুধু তার বাবাকে এভয়েড করে চলে। 

অফিস থেকে ফেরার পর সব ভাই বোন মিলে হল রুমে বসে শুরু করে জমজমাট আড্ডা। কিন্তু চৌধুরী সাহেব বাসায় ঢুকলেই সৈকত সোজা তার রুমে চলে যায়। 


মেঘ দূর থেকে দাড়িয়ে শুধু ভাবে কি করে  সত্যেটা সামনে আনা যায় । 

কি করে ছেলে আর বাবার ব্যবধান টা কমিয়ে আনা যায়। 

দাদীমার কথাই ঠিক । 

শুধুমাত্র সৈকতের ভুল  শুধরে দিতে হবে । অন্যেরা যা জানে সেটা না হয় সেভাবে থাক। 

কিন্তু কি ভাবে!!?

না আর এত সময় নেওয়া চলবে না। 

আজকেই আমাকে সবটা করতে হবে । 

আজ রাতেই আমাকে সৈকত কে সব বলতে হবে। 


———**——**——**————


মেঘ রুমে ঢুকে দেখে সৈকত কিছু অফিসের ফাইল নিয়ে বসে কাজ করছে। 

আজ সৈকত না ঘুমিয়ে কাজ করছে দেখে মেঘ একটু অবাক হল। 


মেঘ কথা গুলো সৈকতকে কিভাবে বলা শুরু করবে বুঝতে না পেরে ইতস্ত বোধ করতে থাকে। 

কিছুক্ষন রুমের মধ্য পায়চারি করে বেলকনিতে গিয়ে দাড়ায়। 

তারপর মনে মনে কথা গুলো সাজায়।  কিভাবে কথা গুলো বললে সৈকত বিশ্বাস করবে । কিভাবে বললে ওর মনে ভুল গুলো ভাঙ্গবে । 

 

মেঘ মনে মনে কথা গুলো সাজিয়ে রেডি হয়ে রুমে ঢোকে। আর ভাবে আজ কোন রকম ভাবে সে সৈকতের সাথে কোন ঝামেলায় জড়াবে না। 

কথা গুলো শোনার পরে সৈকত হয়তো বিরুপ পতিক্রিয়া করতে পারে তাই তার কোন কথা আজ মেঘ তেমন রিএ্যাক্ট করবে না বলে মনে মনে ঠিক করে । 


সৈকত বিছানার উপর বসে কাজ করছিল । মেঘ পাশে গিয়ে দাড়াতেই 

সৈকত   বললোঃ

—কিছু বলবে??

মেঘ একটু অবাক হয়ে যায় সৈকতের কথায় । কিছু বলার আগেই সৈকত এ কথা বললো তাই। 

—হ্যাঁ । আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে। 

—কি বলবে বলো। 

—আপনার কাজগুলো যদি শেষ হয়ে থাকে তাহলে কথা গুলো বলতে চাই। 

—বলো সমস্যা নেই। আমি শুনছি। 

—যে কথা গুলো আপনাকে এখন বলবো সেগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ তাই----

—এই কাজ গুলোও আমার খুব গুরুত্বপূর্ণ । নতুন একটা প্রজেক্ট এর কাজ । সব যদি ঠিক থাকে তাহলে আমাকে আগামিকাল আমি একসপ্তাহের  জন্য ঢাকার বাইরে যাব। 

—ঠিক আছে তাহলে আমি না হয় আপনি ফিরে এলেই কথা গুলো বলবো। 

—না,না । তার দরকার নেই। তুমি কিছুদিনের সময় চেয়েছিলে আমিও সেটাই দিয়েছি।তার থেকে বেশি সময় আমি দিতে পারবো না। 

—মেঘ সৈকতের কথা শুনে একটু চুপ হয়ে থাকে। 

—আমাকে দশ মিনিট সময় দাও হাতের কাজ গুলো শেষ করে নিই। তুমি বরং এই  ফাঁকে কফি করে নিয়ে এসো। যদিও বা জানি আমার কোন অধিকার নেই এখন তোমাকে দিয়ে কিছু করানোর। 

—আপনার জন্য কিছু করার সুযোগ হওয়া আমার জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার বলে মেঘ বেরিয়ে যায়। 


কিছুক্ষন পর দুজনেই মুখোমুখি বসে থাকে। মাঝে দুটো ধোয়া ওঠা কফির মগ নিয়ে । 

সৈকত কফির মগে চুমুক দিয়ে বলে 

 —বলো কি বলতে চেয়েছিলে। 


মেঘ কফির মগটা হাতে নিয়ে লম্বা করে একবুক নিশ্বাস  টেনে নেই তারপর এক চুমুক কফি পান করে বলে

—আপনার মা বেঁচে আছে। 


—----------------!!কি বললে তুমি!!??তুমি কি আমার সঙ্গে মজা করছো??আর ইউ কিডিং মি??আর ইউ ক্রেজি মেঘ?তুমি কি জানো তুমি কি বলছো??


—হ্যা আমি সত্যি বলছি।  আমি জানি আপনি আমার কথা বিশ্বাস করবেন না। কিন্তু এটাই সত্যে।

 

—হোয়াট??কি বলছো তুমি!!কে বলেছে তোমাকে এই পাগলের প্রলাপ  ??(রেগে)


—আপনি প্লিজ উত্তেজিত হবেন না।  আগে আপনি আমার সব কথা শুনুন তারপর না হয় ---


—না । আমি কিছু শুনতে চাই না। 


—আপনাকে সত্যেটা জানতেই হবে। আপনি দিনের পর দিন এক অন্ধকারের ভিতর ডুবে আছেন। আপনি মিথ্যা টাকে বুকে লালন করে নিজের বাবাকে ঘৃনার সাগরে ডুবিয়ে ফেলেছেন। আপনি চোখে এতটাই কালো কাপড় বেঁধে আছেন যে বাইরের আলো সেই কাপড় ভেদ করে আপনার চোখ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না।


—আমি এত ঙ্গানি কথা শুনতে চাইনি। 


—সত্যি আপনার মা বেঁচে আছে। ছোট বেলায় যাকে আপনি গাঁয়ে কেরোসিন ঢেলে আগুনে জ্বলেপুড়ে  মরতে দেখেছিলেন সেটা ছিল একটা অন্য মানুষের মৃত দেহ। আর এটা শুধুমাত্র লোক দেখানোর জন্য করা হয়েছিল যাতে   সবাই মনে করে উনি মারা গেছেন। আর এ  কাজটি উনি করেছিলেন উনার এক কাজিনের  সঙ্গে মিলে। 


—--------


—আপনার একটা ডাক্তার আঙ্কেল ছিল যে আপনাদের কিছু হলে বাসায় এসে ট্রিটমেন্ট করতো মনে আছে। 


সৈকত একটু ভেবে বলে হ্যা । সুমন নাম ছিল মনে হয় উনার। 


—হ্যা সুমন। উনি আপনার মায়ের কাজিন ছিলেন। আপনাদের বাসায় বেশ যাওয়া আসা করতেন পরে সুমন আঙ্কেল আর আপনার মা মিলে প্লান টা করে যাতে সবাই ভাবে আপনার মা মারা গেছে । আর এই ঘটনা ঘটার পর আপনাদের সেই আঙ্কেল আর কোনদিন আপনাদের বাসায় আসেনি। 


—না আসেনি। শুনেছিলাম উনি দেশের বাইরে চলে গেছে।আমি জানি কথাটা পুরোপুরি মিথ্যা। তারপরও যদি কিছুক্ষনের জন্য মেনেও নি তুমি সত্যে বলছো তাহলে বলো এগুলো করে তাদের লাভ??


—লাভ ক্ষতি কি সেটা আমি জানিনা। তবে উনি চাননি যে তার বেচে থেকে অন্যে কারো সঙ্গে সংসার গড়ার কথা কেউ জানুক। 


—শাট আপ আর একটা বাজে কথাও বলবে না তুমি আমার মায়ের সম্পর্কে । তোমার কি একটুও লজ্জা করছে  না একটা মৃতব্যক্তির নামে মিথ্যা কথা বলতে !!?আমি জানি এসব ব্রেনওয়াশ কথাবার্তা তোমাকে কে বলছে আর কেনই বা বলছে। 

তবে তাকে পরিষ্কার করে জানিয়ে দিও তার মনের আশা কোন দিন পূরণ হবে না। সে যদি মনে করে থাকে তোমাকে দিয়ে আমার মায়ের নামে কুরুচিপূর্ণ কথা বলিয়ে আমার মন বিষিয়ে দিয়ে তার নিজের প্রতি সিমপ্যাথি তৈরী করার চেষ্টা করবে তাহলে সেটা সবচেয়ে বড় ভুল। 

আমি কোনদিনও ঐ ভদ্র  মুখোশ ধারী মানুষটাকে মন থেকে ক্ষমা করতে পারবো না। 


—আপনি অযথা বাবার নামে না জেনে আজে বাজে কথা বলছেন। আমাকে বাবা কিছু বলেনি। আর আপনার কি একবার ও মনে হচ্ছে না যে বাবা এতবছর পর আমাকে কেন এসব কথা বলবে?আর কেনই বা আমাকে দিয়ে আপনার কাছে মায়ের এসব কথা বলে আপনার ন বিষিয়ে দেবে। 


—হ্যা জানি সে এসব কেন করছে। সে কখনও তার লাইফে পরাজিত  হয়নি । শুধু একটা জায়গা ছাড়া আর সেটা হচ্ছে আমার মুখ থেকে তার বাবা ডাকটা না শোনা। কিন্তু জেনেশুনে  আমি কখনই তাকে বাবা বলে ডাকবো না। এই জায়গাটাই আমি তাকে কখনই জিততে দেব না। এটাই হচ্ছে তার আর আমার যুদ্ধ। আর এটা চলতেই থাকবে যতদিন সে আর আমি থাকবো। 


—আপনি ভুল করছেন । আপনি বাবাকে ভুল বুঝছেন। সত্যিই আপনার মা বেচে আছে আর উনি আপনার সেই সুমন আঙ্কেলের সাথেই নতুন করে সংসার গড়েছেন মেঘের মুখের কথাটা শেষ হওয়ার আগেই সৈকত হাতে থাকা কফির মগটা রাগে ফ্লোরে আছড়ে মারল আর তারপরই মেঘের মুখে কষে একটা চড় মারলো। 


মেঘ চড় খেয়ে  কিছুক্ষন চুপ করে বসে ব্যথাটা হজম করে আবার বলতে গেলেই সৈকত বললো আমি বুঝতে পেরেছি তুমি এ বাড়ির মায়া ছেড়ে এত আরাম আয়েশ আর ধন সম্পদের লোভ ছেড়ে

যেতে পারছো না তাই এখন এখানে পাকাপোক্ত ভাবে থাকার জন্য শ্বশুরের হয়ে দালালি করতে এসেছ। কিন্তু শুনে রাখ কোন কিছুতেই কাজ হবে না। 


আর এক্ষনি আমার রুম থেকে বেরিয়ে যাও । আমি এখনকার পরে আর  দ্বিতীয়বার  তোমার ঐমুখ যেন না দেখি।

বলে মেঘের হাত ধরে রুম থেকে বের করে সশব্দে দরজা আটকে দিল। 


(চলবে)

Comments

Post a Comment