বেখেয়ালি ভালবাসা ৮

 গলঃ #বেখেয়ালি_ভালবাসা

লেখাঃ #সাবেরা_সুলতানা_রশিদ


#পর্ব_৮


২২.

সৈকত অফিসে আসার কিছুক্ষন পরই সুইটি সৈকতের অফিস রুমে আসে। 

এমনিতে সকাল থেকে সৈকতের মন মেজাজ ভাল নেই  । তার উপর সুইটি কে দেখে সৈকতের মেজাজটা আরো বিগড়ে গেল। সৈকত চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় ।

 

—এখানে কেন এসেছো তুমি??

—আমি তোমাকে সরি বলতে এসেছি। 

—সরি!!?

—হ্যা সরি। 

—তোমার কি মনে হয় সরি বললে সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে??

—আমি জানি ঠিক হবে না। কিন্তু মনে তো  একটু সাত্বনা পাব যে অন্তত তোমাকে সরি বলার সুযোগ টুকু পেয়েছি। 

—তোমার লজ্জা করছে না এ কথা গুলো বলতে !!?নিজে এত কিছু করলে আর এখন বুক ফুলিয়ে আমার সামনে এসে ন্যাকামি করছো। 


সুইটি একটু কান্না জড়িত  কন্ঠে বলে 

আসলে দোষ সব আমার । আমি যদি সেদিন তোমাকে জোর না করতাম তাহলে  হয়তো এমন কিছু ঘটতো না। কোথা থেকে যে সেদিন কি হয়ে গেল ---

আর তুমিও আমাকে এমন ভাবে ----


—শাট আপ সুইটি । আর একটা কথাও বলবে না তুমি। আচ্ছা ঠিক আছে মেনে নিলাম যে আমি মেঘ ভেবে তোমার কাছে গিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি কি করলে !!??

—কি করেছি আমি!??

—আবার জিঙ্গাসা করছো কি করেছো??

আসলে তোমরা মেয়েরা না সব পারো । ক্ষনে ক্ষনে রঙও পাল্টাতে পারো। সারা পৃথিবী ধ্বংস করে এসেও তোমরা এমন ভাবে বলো যে“ কি করেছি আমি ”মনে হয় যে এর মত নিষ্পাপ আর পবিত্র  মেয়ে বুঝি আর দ্বিতীয়টি নেই। 

—আচ্ছা সৈকত সেদিন রাতের ঘটনার পর কি একবারের জন্য তোমার মনে হয়নি যে, আমার মনের ভিতরেও কতটা খারাপ লাগছে ?একটা মেয়ে হয়ে আমি কিভাবে এই বিষয়টাকে নিজের ভিতরে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি?ঐ রাতের ঘটনা যে আমাকে প্রতিনিয়ত দুঃস্বপ্নের মত তাড়া করে বেড়াচ্ছে। 

—দুঃস্বপ্ন!??ওহ রিয়েলি!!তুমি নিজে যেটা প্লান করে করলে সাকসেস ও হলে আর এখন বলছো দুঃস্বপ্ন!!?

হাউ ফানি!!

—কি বলছো তুমি সৈকত এসব??

—ও এখন আমি তোমাকে কি বলতে চাইছি সেটা তুমি বুঝতে পারছো না!?

নাকি বুঝতে চাইছো না??!তোমার কাছে সেদিনের ঘটে যাওয়া ঘটনা যদি অপ্রতাশিত হওয়ারই ছিল তাহলে এগুলো কি !!??বলে সৈকত ল্যাপটপ টা ঘুরিয়ে সুইটির সামনে ধরে সেদিন রাতের তাদের দুজনের ঘনিষ্ঠ কিছু ছবি দেখায় যেটা অপরিচিত একটা ইমেল আইডি থেকে এসেছিল। 


ছবি গুলো দেখে সুইটির চোখ বড় বড় হয়ে যায় । 

—এই ছবি গুলো!!এই ছবি গুলো তোমাকে কে দিল??

—ওয়াও গ্রেট সুইটি এই না হলে -----

—সৈকত তুমি আমাকে ভুল বুঝতেছ। দেখ আমি নিজেও জানিনা এ ছবিগুলো কে তুলেছে আর কখনই বা তুলেছে । আমি বাসায় আসার পর কে যেন এই একই ছবি গুলো আমারও ইমেল আইডি তে পাঠিয়েছে । এই দেখ বলে সুইটি নিজের ফোনটা বের করে সৈকত কে ইমেল থেকে ছবি গুলো দেখায় । 

সৈকত ছবি গুলো দেখে অবাক তার থেকে আরোও বেশী অবাক হয় দুটো লাইন লেখা দেখে

“এখন তো কেবল ছবি পাঠালাম,সময় মত টাকা না দিলে ভিডিও টা জায়গা মত --------। যখন বলবো যতটাকা দিতে বলবো টাকা দেওয়ার জন্য রেডি থাকিস। ”

সৈকত অবাক হলো কারণ এরাকম কোন ডিমান্ড তার কাছে করা হয়নি।

সৈকতের কাছে কেবল ছবি গুলো পাঠিয়েছে। 


সুইটি কান্নাকাটি শুরু করে দেয় । 

সৈকত কি করবে বুঝতে পারে না। 

রাগে আর বিস্ময়ে অধের্য্য হয়ে ওঠে। 

ওহ শীট!!হাউ ইজ ইট পসিবল!??

তার মানে এটা তৃতীয় কারো কাজ?

কিন্তু কি করে এটা সম্ভব??


সুইটি চোখ মুছতে মুছতে বলে এটা আমিও তো সেদিন থেকে ভেবেই চলেছি । 

আমার মনে হয় এটা সম্পূর্ণ ওর কাজ!!। 


—এই ওটা কে!!?

—আমার এক্স হাজবেন্ড। 

—সেটা কি করে সম্ভব??আর সেই বা কেন এগুলো করবে??

—ওকে তুমি চেনোনা সৈকত ও খুব খারাপ মানুষ। আমি ছেড়ে চলে আসার পর থেকেই ও  সবসময় আমার

ক্ষতি করার সুযোগে থাকে । 

২৪ ঘন্টা আমার উপর নজরদারি করে । কোথায় যায় কি করি ,কি খায় -----সব। 

এমন কি আমি কোথায় কার আন্ডারে চাকরি করি সবটাই জানে। 


—কিন্তু তার এগুলো করে লাভটা কি সেটাই তো বুঝলাম না!!। 

—কেন টাকা। এটাই তো তার দরকার । 

তুমি জানোনা  প্রতি মাসে আমার বেতন থেকে অর্ধেক টাকা ওকে দিতে হয় । 


—কেন!!?

—জানো সৈকত আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা কোথায় ??

ওর মত মানুষকে ভালবেসে বিয়ে করা। আর ও আমার ভালবাসার  সুযোগ নিয়ে প্রতিনিয়ত আমাকে ব্লাকমেইল করে যায়। 

ও এতোটাই নীচ যে আমাদের দুজনের কিছু বিশেষ মুহূর্তের ভিডিও করে প্রতিনিয়ত  ভয় দেখায় । আর তার জন্য আমাকে টাকা দিতে হয় । 

—সে কি করে জানলো যে তুমি আমার সঙ্গে আউটে যাচ্ছো??

—ঐ যে বললাম সবসময় আমার উপর নজরদারি করে । কিন্তু সৈকত তুমি বলো আমার দোষটা কোথায় ??

—এত দিন তুমি আমাকে এ কথা গুলো জানাওনি কেন?

—কি করে জানাতাম সৈকত!!এমনিতে আঙ্কেলের বিনা অনুমতিতে তুমি আমাকে তোমার কোম্পানিতে একটা চাকরী দিয়ে ছিলে । তারপর আবার প্রায়  আমার পরিবারের  সব ভার তুমি বহন করো । 

তাই আর এসব বলে তোমাকে নতুন করে আর দুশ্চিনায় ফেলতে চাইনি। 

—এখন কি করবে?কিন্তু আমার একটা কনফিউশন ------

সে যদি তোমার থেকেই টাকা গুলো ডিমান্ড করবে তাহলে আমাকে ই-মেইল করার কি দরকার ??

আমার কাছে তো তার কোন ডিমান্ড নেই তাহলে এই পিক গুলোই বা কেন দিল???

—আমিও তো সেটা বুঝতে পারছিনা। 


হঠাৎ  সুইটির ফোনে ম্যাসেজ রিংটোন বাজে । সুইটি ভয়ে ভয়ে ফোনটা দেখতেই দেখে নতুন একটা ই-মেইল সেই আইডি থেকে। 

সৈকত এই দেখ “আজ বিকাল চারটায় ৫০হাজার টাকা নিয়ে রেডি থেক। যেকোন সময় টাকা গুলো চেয়ে নিব। ”


সৈকত ই-মেইল টা দেখে বলে এতো রীতিমত বড় রকমের একটা ক্রাইম। 


—সৈকত চলো আমার সাথে । 

—কোথায়?

—পুলিশ স্টেশনে। 

—হোয়াট!!?

—হ্যা। এ ছাড়া আর কোন উপায় নেই আমাদের হাতে । 

—তুমি কি পাগল হয়ে গেছ!!?

—কেন??সৈকত তুমি বুঝতে পারছো না দিন দিন ওর ডিমান্ড টা বেড়েই চলছে। আর আমার মনে হয় এখন যদি আমি ওকে না থামায় তাহলে হয়তো ও আরো বেশী -----

—তুমি জানো পুলিশের কাছে গেলে এখন কি হবে??সবাই সবটা জেনে যাবে । পুলিশ এসে তোমাকে আমাকে একের পর এক জিঙ্গাসা করবে। আমার অফিসের সবাইকে জিঙ্গাসা করবে দুজনের মধ্য সম্পর্ক কেমন সেটা জানার চেষ্টা করবে। তারপর আমাদের বাড়িতে । 

—সৈকত আমি জানি। কিন্তু এ ছাড়া আর তো কোন অপশন আমি পাচ্ছি না। 

আচ্ছা পুলিশ তো জানে যে তুমি স্বনামধন্য ও সুপরিচিত রাজনৈতিক নেতা রায়হান চৌধুরীর ছেলে তারা নিশ্চয় তোমার কোন সুনাম নষ্ট হতে দিবে না। 

—তুমি ভাল করেই জানো যে আমি তার পরিচয় বহন করে কোন কিছু করতে চাইনা। নিজের চেষ্টায় নিজের যতটুকু পরিচয় আছে তা দিয়েই কাজ করতে আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। 

আমি কোন নেতার পরিচয় নিয়ে বেশী সুযোগ সুবিধা পেতে চাইনা। আমি এদেশের একজন সাধারণ নাগরিকের মত নিজের জীবনটাকে সাধারণ ভাবে উপভোগ করতে চাই। 

—কিন্তু এখন আমি ---

—চিন্তা করো না। টাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আর হ্যা আমি যে তোমাকে লেটার টা টাইপ করে আনতে বলেছিলাম সেটা এনেছো?

—হ্যা এই যে আমার রেজিগনেশন লেটার । 

—সৈকত লেটার টা হাতে  নিয়ে ছিড়ে ফেলে বলে সরি সুইটি। আমি জানতাম না যে তুমি এতোটা প্রবলেমের মধ্যে আছো। আর এগুলো দেখে আর আর সেদিনকার রাতের ঘটনার কথা মনে করেই রাগে আমি তোমাকে চাকরি থেকে ইস্তাফা দিতে বলি। 

—ইটস ওকে সৈকত। আমি তোমার জায়গায় হলে হয়তো এটাই করতাম । আর নয়তো এর থেকেও বেশী রিএ্যাক্ট করতাম। আর তুমি তো শুধু চাকরি ছাড়তে বলে ছিলে । আর সবচেয়ে বড় কথা হলো তুমি যে আমার কথা গুলো শুনে আমাকে বুঝে আমাকে মেন্টালি  সার্পোট দিচ্ছ এটাই অনেক। 

এখন কার সময় এতটা কেউ কারো জন্য করে না। 

—থাক হইছে এখন তুমি যাও। কাজ শুরু করো । 

—সুইটি চোখ মুছে বলে ওকে। 

আর শোন---

—হ্যা বলো। 

—অফিস শেষ করে টাকাটা ম্যানেজারের

কাছ থেকে নিয় নিও। আমি বলে রাখবো। 


—সৈকত কি বলে যে তোমাকে---

—থাক হইছে এবার যেতে পারো। 


সুইটি মুচকি হাসি দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। 


আর সৈকত সুইটির বিছানো জালে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে পড়ে। 


————**——**——**————


মেঘের মনের ভিতর কেমন যেন সকাল থেকেই অস্থিরতা কাজ করছে । কিন্তু কেন এমন হচ্ছে সেটা মেঘ বুঝে উঠতে পারে না। 

বার বার মনে সৈকতের জন্য ভয় হতে থাকে ওর কোন বিপদ হলো নাতো??

মেঘ বার বার ওর মোবাইল টা হাতে নিয়ে সৈকতের অফিসের টেলিফোন নম্বরটা ডায়াল করে আবার কল ঢোকার আগেই কেটে দেয়। 

মন চাইছে একটা ফোন করে কথা না বললেও তার কন্ঠস্বর টা একটু শুনতে । কিন্তু কোথায় যেন একটা বাধা কাজ করছে । 


আচ্ছা আমি যে তার জন্য এতটা ভাবছি তার জন্য এতো চিন্তা করছি ,তার কি একটি মুহূর্তের জন্য আমার কথা মনে পড়ে না??

একটা মিনিট ও কি আমার অনুপস্থিতি তাকে কষ্ট দেয় না??

আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য তার কি একটুও ইচ্ছা হয় না??


মেঘ পানি খাওয়ার জন্য পানির গ্লাসে পানি নিয়ে তুলে মুখে দেওয়ার আগেই গ্লাস টা হাত থেকে পড়ে চুর মার হয়ে গেল। 

এবার মেঘের মনের মধ্যে কেন জানি অশনি সংকেত বেজে উঠলো। বুকের ভীতরটা কেমন ব্যথায় মোচড় দিয় উঠলো। 

তাহলে সত্যিই কি কারো কোন বিপদ আসতে চলেছে!??


মেঘের আম্মু কাচ ভাঙ্গা শব্দে রান্নাঘর থেকে ছুটে আসে। 

—কিরে কিসের শব্দ হলো?

—কিছুনা আম্মু।পানি খেতে গিয়ে  হঠাৎ পানির গ্লাস টা হাত থেকে পড়ে ভেঙ্গে গেছে। 

—ওও। তোর কোথাও লাগেনি তো । 

—না আম্মু। বলে মেঘ নিচু হয়ে কাচের টুকরা গুলো তুলতেই খচ করে একটা কাচের টুকরো মেঘের হাতে ফুটে গেল। 

মেঘ ব্যথায় উুহ করে ওঠতেই মেঘৈর

আম্মু  তাকিয়ে দেখে মেঘের হাত থেকে রক্ত পড়ছে। 


—তুই না ইদানিং অনেকটাই আনমনা হয়ে গেছিস। 

হঠাৎ  করে মেঘদের বাসার টেলিফোন টা বেজে ওঠে । 

মেঘ দৌড়ে গিয়ে টেলিফোন তুলতেই-----------


২৩.


মেঘ টেলিফোন টা রিসিভ করতেই ওপাস থেকে রোজির কান্না জড়িত কন্ঠ ভেসে আসে। 

—কি হয়েছে ভাবি কাঁদছো কেন??

বাড়িতে সবাই ভাল আছেতো ??

—মেঘ বাবা--

—বাবা!!বাবার কি হয়েছে ভাবি??

কথা  বলছো না কেন বলো বাবার কি হয়েছে ?

—মেঘ বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বাবা এখন আই সি ইউতে ভর্তি আছে। 

—কখন কিভাবে??

—সকালে, এখন এত কিছু বলা সম্ভব না। 

—কোন ক্লিনিকে আছে ?

—অনি কে নিয়ে যে ক্লিনিকে ছিলাম সেটা। 

—ঠিক আছে ভাবি আমি এখনি আসছি। 

—আচ্ছা। 


মেঘ ফোনটা রেখে দিয়ে ওর আম্মুকে ডেকে সবটা খুলে বলে । 

—ঠিক আছে তুই রেডি হয়ে নে । আমিও তোর সঙ্গে যাবো। 


কিছুক্ষণের  মধ্যে মেঘ তার আম্মুকে সঙ্গে নিয়ে ক্লিনিকের উদ্দেশ্য রওনা হয়। 


————**——**——**————


সৈকতের অফিসরুমের টেলিফোনটা বেজেই যাচ্ছে । কিন্তু কেউই ফোনটা তুলছে না। 

সৈকত একটা মিটিংয়ে ব্যস্ত ।

মিটিংটা শেষ করে নিজের কেবিনে ঢুকতেই ফোনের শব্দ শুনে টেলিফোনটা রিসিভ করে শোনে চৌধুরী সাহেব অসুস্থ। 


কিন্তু কি হয়েছে কখন হয়েছে সৈকত আর কিছু সেসব জিঙ্গাসা করে না। 

সৈকত সকালে চৌধুরী সাহেবকে দেখে মনে মনে এই আশংকায় করে ছিল যে এত কিছু শোনার পর যেভাবে রিএ্যাক্ট করলো তাতে প্রেসার হাই না হয়ে যায় । 

কিন্তু যেহেতু তিনি আই সি ইউতে আছেন তারমানে বড় কোন সমস্যা দেখা দিয়েছে। 


সৈকত চেয়ার টা টেনে বসে ভাবতে থাকে-

আচ্ছা এই সংবাদ টা শোনার পর আমার কি খুশি হওয়া উচিত না দুঃখ পাওয়া উচিত!!?

হুম খুশি হওয়ায় উচিত,কারণ উনি আমার মায়ের খুনি। আর কোন খুনির অধিকার নেই বেশীদিন বেঁচে থাকার। 


আর যদি দুঃখ পায় সেটা হবে পুরোটাই মিথ্যা ইমোশন। জাস্ট লোক দেখানো। যেটা একদমই ডিজগাস্টিং। এসব লোক দেখানো এ্যাক্টিং আমার দ্বারা কখনো সম্ভব না। 

আচ্ছা উনি মারা গেলে কি সত্যিই আমার একটুও কষ্ট হবে না??

যদি কষ্ট না হয় তাহলে উনি হবেন পৃথিবীতে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যবান মানুষ যার মৃত্যের সংবাদ শুনে সন্তান কষ্ট না পেয়ে বরং----------

আচ্ছা থাক এসব নিয়ে না হয় পরেও ভাবা যাবে। 

সৈকত চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ায় ক্লিনিকে যাওয়ার উদ্দেশ্য । 


————**——**——**————


মেঘ ক্লিনিকে ঢুকে উর্ধশ্বাসে দৌড়ে আসতেই পুলিশের দুজন ডিউটিতে থাকা সিকিউরিটির লোক মেঘ কে বাধা দেয় ।

তাদের সাথে অনেকক্ষন কথা বলার পরও তারা বলে যে পরিবারের  বিনা পারমিশনে আমরা আপনাকে ভিতরে যেতে দিতে পারি না । 

মেঘ বলে দেখুন আমি উনার---------- বলতে গিয়ে মেঘের কোথায় যেন বাধে। কি লাভ শুধু শুধু তাদের সামনে নিজেকে চৌধুরী বাড়ির ছোট ছেলের বউ বলে জাহির করে!!?

যাকে সে মনে প্রাণে স্বামী হিসেবে জানে সেই তো তাকে স্ত্রী হিসাবে মানেনা। 

তাহলে কি লাভ!!??


সিকিউরিটির লোক জিঙ্গাসা করে বলুন ম্যাম আপনি উনার কে ??

মেঘ তাড়াতাড়ি বলে আমি উনার মেয়ে মতো। 

সরি ম্যাম আমরা এখন আপনাকে ওদিকে যেতে দিতে পারছিনা। 

আমরা এখন শুধু তার পরিবারের লোককে এল্যাও করছি। 

আপনি এখন যেতে পারেন। 


মেঘের আম্মু মেঘের এমন আচরনে অবাক হয়ে যায়। 

সরাসরি মেঘ কেন বলছে না যে ঐ বাড়ির ছোট বউ। তাহলে তো সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায় । 

এই মেঘ কি হয়েছে তোর ??

তুই কিছু না বলে চুপ করে আছিস কেন??

মেঘ কোন কথা না বলে পিছন ফিরে তাকাতেই দেখে সৈকত দাড়িয়ে আছে । 

সিকিউরিটির দুজন সৈকত কে দেখেয় বলে আসুন স্যার আসুন। 

—এখানে কি হয়েছে ??

—আসলে স্যার এখন আমরা আপনাদের পরিবারের লোককে ছাড়া বাইরের কাউকে এল্যাও করছি না। 

—সৈকত মেঘের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে বললো আপনারা জানেন না “ইনি কে”??

সি ইজ মাই ওয়াইফ। 


সিকিউরিটির দুজন নিজেদের মুখ চাওয়া চায়ি করে তাড়াতাড়ি করে বললো সরি ম্যাডাম আমরা আপনাকে চিনতে পারিনি। 

আমাদের ভুল হয়ে গেছে । মাফ করবেন। 


সৈকতের মুখে ওয়াইফ কথাটা শুনে মেঘ বিস্ময় ভরা চোখে সৈকতের দিকে তাকায় । 

সৈকত কোন কথা না বলে মেঘের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে । দেখে মেঘের চোখদুটো ছলছল করছে । 


সৈকত মেঘের আম্মুর কাছে ভালমন্দ জিঙ্গাসা করে । 

মেঘের আম্মু সৈকতের কথার উত্তর দিয়ে বলে দেখতো বাবা এখন যদি তুমি না আসতে তাহলে মনে হয় আর  ভিতরে যেতে পারতাম না। 


সৈকত কথা বলছে মেঘের আম্মুর সাথে কিন্তু চোখ মেঘের দিকে। 

—কেন আপনারা কি নিজেদের পরিচয়টা দেননি??

—আসলে মেঘ বললো যে চৌধুরী সহেবের মেয়ের মতো কিন্তু তারা বুঝে উঠতে পারেনি যে মেঘ কি বলতে চাইছে। 


সৈকত মিচকি হেসে বলে ও আচ্ছা এখন চলুন । 


মেঘ কোন কথা না বলে মাথা নীচু করে সৈকত আর তার মাকে অনুসরন করে চলে । 

বাইরে কাউকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। 

সৈকত একটা রুমে প্রবেশ করতেই দেখে তার ভাইয়া ভাবিরা সবাই খুব চিন্তিত  মুখে গম্ভীর হয়ে বসে আছে । 


মেঘকে দেখেই ঝিনুক কান্না করতে করতে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে । 


রোজি এসে পাশে দাড়ায় । 


মেঘ ঝিনুকে কিছুক্ষন শান্তনা দিয়ে রোজির কাছে জানতে চাই কি হয়েছে বাবার??

—ডাক্তার বলেছে হার্ট এট্যাক করেছে অবস্থা খুব সিরিয়াস। 

—কিভাবে হলো আর এটা কখন হলো ??

—কিভাবে যে হলো সেটা বলতে পারছিনা। তবে বাবা তোকে নিয়ে খুব চিন্তায় ছিল একদিন। আর আজ সকালে নাস্তার টেবিলে অনি আর সৈকতের মাঝে তোকে নিয়ে কথা হচ্ছিল। বাবা সেখানে উপস্থিত ছিল। এক পর্যায়ে অনি একটু বেশী বায়না করছিল সৈকতের কাছে তখন আমি অনিকে নিয়ে রুমে চলে আসি । তার কিছুক্ষণ পর কাজের মেয়ের চিৎকার শুনে রুম থেকে বেরিয়ে এসে ডাইনিং রুমে আসতেই দেখি বাবা ফ্লোরে পড়ে আছে। আর তারপরই এখানে । 


মেঘ রোজির কথা শুনে মনে মনে ভয় পায় এই ভেবে যে সৈকত তাহলে বাবাকে সবটা বলে দেয়নি তো!!??

মেঘ মনের সন্দেহটা দূর করতে রোজিকে বলেঃ

—আচ্ছা ভাবি তুমি অনিকে নিয়ে রুমে চলে গিয়েছিলে তখন আর কে কে  ডাইনিংয়ে ছিল??

—শুধু বাবা আর সৈকত। 


হঠাৎ একজন ডাক্তার রুমে ঢুকে বলে 

সরি টু সে স্যারের অবস্থা খুব খারাপের দিকে যাচ্ছে । প্রেসার টা বেড়েই চলছে কোন ভাবে সেটা আমরা কন্ট্রোলে আনতে পারছিনা। 

আর উনি এখনো আগের মত সেন্সলেস হয়ে আছেন। 

মনে হচ্ছে বড় ধরনের কোন শক পেয়েছেন তার জন্যই এমনটা হচ্ছে। 

আপনারা দোয়া করতে থাকুন। 

আমরা আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি বাকিটা আল্লাহের ইচ্ছা বলে ডাক্তার চলে যায় । 


মেঘ ডাক্তারের সব কথাগুলো শুনে মনে মনে ভাবে

তারমানে আমি যে ভয়টা পাচ্ছিলাম সেটাই ঠিক!!

সৈকত বাবাকে সব বলে দিয়েছে ??

ও মাই গড!!

এখন কী হবে??


মেঘ দেখে ডাক্তার বেরিয়ে যেতেই সৈকতও রুম থেকে বেরিয়ে যায়। 

মেঘ ও সৈকতের পিছন পিছন ববেরিয়ে যায় । 


সৈকত ছাদে এসে একটা সিগারেট ধরিয়ে 

দুই টান দিতেই

মেঘ পিছনে এসে দাঁড়ায় । 

—কেন করলেন আপনি এটা??


মেঘের কন্ঠ শুনেই  সৈকত হাত থেকে সিগারেটটা ফেলে দেয় । 

—কি করেছি!!?

—আপনি জানেন না আপনি কি করেছেন??

—না জানিনা। 

—আপনি কেন সবটা না জেনে বাবাকে এভাবে আঘাত দিলেন?

—আমার জন্য চৌধুরীর এ অবস্থা সেটা তোমাকে কে বললো?

—মানে!??

—মানে খুবই সহজ। তোমার কেন মনে হচ্ছে যে তোমার শ্রদ্ধেয় শ্বশুর মশাই আমার জন্য অসুস্থ হয়েছে??

—মনে না হবার কোন কারণ তো নেই!!

আপনি নিশ্চয় বাবাকে সেদিন আপনাকে বলা কথা গুলো বলে দিয়েছেন। 

—হ্যা বলেছি তো??

—তো!!?সবটা না জেনে আপনি বাবাকে এসব কথা গুলো বলে কেন হার্ট করলেন।?

—এখানে হার্ট করার কিছুতো দেখছি না!!

তার মানে তুমি কি সেদিন আমাকে সবটা মিথ্যা বলেছিলে??

— না আমি কোন মিথ্যা বলিনি। 

—তাহলে এতো ভয় পাচ্ছো কেন?

—ভয় পাব না কেন বলুনতো??আমার জন্য আজ মানুষটার এ অবস্থা। সেদিন যদি আমি আপনাকে কথাগুলো না বলতাম তাহলে হয়তো আজ উনি এভাবে অসুস্থ হতেন না। 

—বাহঃ আচ্ছা তোমাদের সব মেয়েদের প্রবলেম টা কোথায় বলতো??একবার অন্যের উপর দোষ চাপাও আবার কিছুক্ষন পর নিজের উপর দোষ চাপাও। 

—আপনি কয়জন মেয়েকে জানেন??

—না মানে এই যে তুমি নিজে একটু আগে আমাকে তোমার শ্বশুরের এই অবস্থার জন্য দায়ী করলে আবার এখন নিজেকে দায়ী করছোতো তাই। 

—হ্যা দোষটা আমারই যে আমি আপনাকে সব সত্যেটা ভালভাবে বুঝিয়ে উঠতে পারিনি। আর আপনিও এমন একজন মানুষ কথাগুলো শোনার পর সত্যমিথ্যা যাচাই না করে মুদ্রার একপিট দেখে নিজের মনের ক্ষোভ গুলো অন্যের উপর ঝাড়েন। 

—কি বলতে চাইছো??

—খুব সহজ । আগে নিজের আশপাশটা ভালকরে লক্ষ্য করবেন জানবেন শুনবেন তারপর যা করার করবেন। হতে পারে আপনি যেটা না জেনে বলছেন সেটা আপনার চোখের সামনে আছে সমস্যা সমাধানের জন্য অথচ আপনি সেটা না দেখেই -----

—কি না দেখেই??বলো

—আমি আপনার সঙ্গে এই মুহুর্তে

তর্ক করতে আসিনি । শুধু এতটুকু বলবো আমি আপনার সব প্রশ্নের উত্তর আপনার ঘরেই রেখে এসেছি । শুধু নিজের চেষ্টায় একটু সেটা উদঘাটন  করে সত্যেটা মেনে নিবেন। 

আর হ্যা এই মুহূর্তে আপনি যাকে বিশ্বাস করছেন সেই কিন্তু আপনার ক্ষতি করবে। 

আমি আপনাকে খুব বুদ্ধিমান ভেবেছিলাম কিন্তু-----

বলেই মেঘ ওখান থেকে চলে আসে। 


সৈকত মেঘকে আটকায় না ওর চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে

আর ভাবে কি বলে গেল মেঘ!!?

সে আমার ঘরে সব প্রশ্নের উত্তর রেখেছে মানে!!?

আর কি সে সত্যে!!?

আর কে ক্ষতি করবে আমার-----


২৪.

সৈকত বাড়ি ফিরে মেঘের বলা কথা গুলো মন দিয়ে ভাবতে থাকে । 

সব সত্যি আমার ঘরেই আছে আমাকেই সেটা জানতে হবে !!??

কোথায় কি আছে আমার ঘরে ??

সৈকত এদিক ওদিক তাকিয়ে প্রতিটা জিনিসপত্র খুব ভাল ভাবে দেখতে থাকে কিন্তু  কিছুইতো কোথাও তেমন দেখা যাচ্ছে না!!

তাহলে!!??

সৈকত আলমারির দিকে এগিয়ে যায় একটা একটা করে ওর সব কাপড় সরিয়ে ফেলে অবশেষে একটা ডায়েরি আর মেঘের দেওয়া  সেই মোবাইলটা পায়। 

সৈকত তাড়াতাড়ি করে ডায়েরি টা খুলে পৃষ্টা উল্টাতে থাকে কিন্তু না এটাতে তো  কিছুই নেই সব পৃষ্টা ফাঁকা। এটাতো একটা নতুন ডায়েরি । 


ধুর এতো ভাবতে আর ভাল লাগছে না। 

সৈকত হাতে থাকা ডায়েরিটা দুরে ছুড়ে ফেলে দেয়। 

বিয়ের আগের জীবনটাই খুব ভাল ছিল। 

ঐ মেয়েটা এ বাড়িতে বউ হয়ে আসার পর থেকেই যতসব গন্ডোগোল শুরু হয়েছে। 

একটার পর একটা ঝামেলা লেগেই আছে । 


হঠাৎ সৈকতের নজর পড়ে ফ্লোরে ছুড়ে ফেলা ডায়েরিটার দিকে। 

ডায়েরিটা মেলে আছে একটা পৃষ্টায় ছোট একটু জায়গা নিয়ে কি যেন লেখা??


সৈকত এগিয়ে গিয়ে ডায়েরিটা তুলে দেখে একটা ঠিকানা লেখা। 

এটা কার ঠিকানা হতে পারে!!?

আর কোথাও কিছু লেখা নেই শুধুমাত্র এই ঠিকানাটা ছাড়া!!!??


কি আছে এই ঠিকানায়  সেটা আমাকে জানতেই হবে । 

সৈকত হাতে থাকা ঘড়ির দিকে তাকায় ঘড়িতে রাত দশটা বেজে পনেরো মিনিট । 

ঢাকা শহরে দশটা মানে সবে সন্ধ্যা ।তবে এখন শীতকাল তাই একটু ----


সৈকত একটু ভেবে নিয়ে ঠিকানাটা নিয়ে 

বেরিয়ে পড়ে । 

সৈকত নীচে নামতে রোজি জিঙ্গাসা করে —কিরে কোথায় যাচ্ছিস এখন?

—বাইরে যাচ্ছি । কেন কিছু বলবে?@

—হ্যাঁ বলার তো অনেক কিছু ছিল কিন্তু এখন বেশী কিছু বলছি না । শুধু একটা কথা বলতে চাই

—হ্যা ভাবি বলো কি বলবে??

—দেখ সৈকত আমি এ বাড়িতে এসেছি তা অনেক গুলো বছর কেটে গেল। তুই আমার ছোট ভাইয়ের মতো। আমার নিজের ভাইকে যেমন ভালবাসি ঠিক তেমন আমি তোকেও ভালবাসি স্নেহ করি। 

—হুম এসব জানি। এগুলো আবার নতুন করে বলার কি আছে?


—আমি তোর থেকে বয়সে অনেকটাই বড় তাই তোর থেকে বলতে পারিস সব কিছুতেই আমার অভিজ্ঞতা টাও বেশি। 

মেঘ যে তোকে ভালবাসে  সেটা তুই ভালকরেই জানিস। আর মন থেকে মানিস ও। তাহলে তোর প্রবলেমটা কোথায়!!?মেঘ খুব ভাল একটা মেয়ে তুই কেন শুধু শুধু ওকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছিস!!?

ঐ মেয়েটা তোকে ভালবাসে  তোর পরিবারটাকে ভালবাসে  এই পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্য কে সে ভালবাসে  শ্রদ্ধাকরে । 

আজকের কথায় ধর তোরা তিন ভাই তো বাবার সন্তান। বাবা অসুস্থ হয়ে ক্লিনিকে আছে আর তোরা সবাই যার যার মতো বাড়ি চলে এসেছিস।  একটা বারের জন্যেও ওখানে কেউ থাকবার প্রয়োজন মনে করিস নি!!

—ওখানে থাকার কি আছে !!?ক্লিনিকে উপর মহল থেকে আদেশ আছে তারা যেন চব্বিশ ঘন্টা চৌধুরী সাহেব কে দেখে রাখে । তার কেয়ার করে । ভাল সেবা প্রদান করে। 

—আমি জানতাম তুই এমনটাই বলবি। 

তারপর ও কারোনা কারো থাকা লাগে । 

আচ্ছা বাদ দে,তারপরও দেখ ঐ মেয়েটাই কিন্তু একা ক্লিনিকে রাত কাটাচ্ছে। 

বাসা থেকে খাবার পাঠিয়েছিলাম। 

যদি পারিস একটু দেখে আসিস খাবারটা ও খেয়েছে কিনা?

—আচ্ছা ঠিক আছে দেখে আসবো। 

—আর শোন!

—হ্যা বলো। 

—কেউ কাউকে এতটা ভাল না বাসলে তার জন্য এত কিছু মন থেকে করা যায় না। 

তোকে মন থেকে ভালবাসে  বলেই তোর সঙ্গে জড়িত সব কিছুকে ও এত ভালবাসে  । 

—ভাবি আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে । এখন আসি

—যা। 


সৈকত নিজের বাইক টা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে । 

ডায়েরি তে যে ঠিকানাটা দেওয়া ছিল সেটা সৈকতের খুজে পেতে অনেকটা সময় লেগে যায় । 


বাসাটার সামনে যেতেই গেটের দারওয়ান জিঙ্গাসা করে কাকে চাই?

সৈকত ঠিকানায়  লেখায় নামটা বলে দেয়। 

—এতো রাতে আপনি মালিকের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন ??দেখি আমি একটা ফোন করে নিই যদি উনি রাজি হন তাহলে আমি আপনাকে ভিতরে যেতে দিতে পারবো। 

—ঠিক আছে একটা ফোন করুন তবে বলবেন যে আমার ওনার সঙ্গে দেখা করাটা খুব জরুরী । 


দারওয়ান  একটা ফোন করে । 

সৈকত দাড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকে । 


একটু পরই দারোয়ানটা হাসিমুখে বলে ঠিক আছে ভিতরে যান তবে বেশি সময় নষ্ট করবেন না। 


সৈকত ওকে বলে ভিতরে যায় । 


একটা কাজের লোক এসে সৈকত কে বসে অপেক্ষা করতে বলে । 

বাড়িটা মোটামুটি আলিশান ভাবেই তৈরি করা হয়েছে । 

ঘরের সাজানো আসবাবপত্রের দিকে তাকালে বোঝা যায় 

বেশ আভিজাত্য ছোয়া রয়েছে।  


দেওয়ালে বেশ কিছু ছবি ঝুলছে মনে হয় তার ছেলেমেয়ের ছবি। 


একটু বাদেই একজন মধ্যবয়স্ক লোক এসে দাড়াল সৈকতের সামনে। 


সৈকত তাকে দেখেই চমকে বসা থেকে উঠে দাড়ায় । 

লোকটা সৈকতের কাছে এগিয়ে এসে বলেঃ

—হ্যালো ইয়াংম্যান। 


সৈকত খুব ক্ষীণ কন্ঠে বলে আপনি--!!


আমি ডাঃসুমন বলে লোকটা হাত বাড়িয়ে দেয় । 


সৈকত নিজের চোখ কান কোনটাকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। 

—বসো। 


সৈকত আস্তে করে বসে পড়ে । সৈকতের সব কিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। 

কি কথা বলবে কিছুই বুঝতে পারছেনা। 

—তুমি কি কোন কারণে চিন্তিত ??


সৈকত বলে  আমি একটু পানি খাব। 


লোকটা হাসিমুখে বলে ঠিক আছে বসো আমি কাউকে বলছি। 


লোকটা উঠে যেতেই সৈকত ভাবে তাহলে কি মেঘের বলা কথা গুলোই সত্যি!!?

তা না হলে ডায়েরিতে কেন এই বাড়ির  ঠিকানা দেওয়া থাকবে ??


কিছুক্ষণ পরে লোকটি ফিরে আসতেই সৈকত বলে আপনার পুরো নাম টা কি শামসুজ্জামান সুমন??


লোকটি বলে হ্যা। কেন বলতো ??

—আসলে যার কাছ থেকে আপনার সম্পর্কে শুনেছি সে আমাকে শামসুজ্জামান বলেছিল । 

ও আচ্ছা। 


একটু পরে সেই কাজের মেয়েটা পানি সাথে হালকা নাস্তা এনে হাজির হয় । 


সৈকত শুধু পানি টুকু খেয়ে নেই। 

—আচ্ছা এবার বলো কি দরকার আমার সাথে??দারোয়ান বললো খুব জরুরী । 

—হ্যা আসলে---বলে সৈকত মনে মনে ভাবে কি বলবো ??কিছুইতো মাথায় আসছে না। 

—হ্যাঁ বলো ??

—আসলে আমি আপনার সঙ্গে আমার বন্ধুর ব্যপারে কথা বলতে এসেছি। 

—কি প্রবলেম??

—আসলে ও কিছুদিন থেকে বলতেই লোকটার ফোনটা বেজে উঠলো । 


সুমন সাহেব ফোনটা হাতে নিয়ে বলে  এক্সকিউজমি আমি একটু কথা বলি 

লোকটা সৈকতের সামনে দাড়িয়ে কথা বলছে । 

কথা শুনে মনে হচ্ছে তার মেয়ে কথা বলছে । 


কথার মধ্য ডাঃ মায়া বলে ডেকে ওঠে। 


মায়া নামটা শুনেই সৈকতের বুকের মধ্যে কেমন কেঁপে ওঠে । 


এদিক থেকে কন্ঠ ভেসে আসে  “আসছি ”। 


 পরিচিত সেই কন্ঠস্বর টা শুনে সৈকতের বুকের ভিতরে কেমন শীতলতা বয়ে যায়।

এ কন্ঠস্বর যে তার খুব পরিচিত ।এতবছরেও এ কন্ঠ যে সৈকত কখনো ভোলেনি একটা মুহূর্তের জন্য ভোলেনি এই মধুর কন্ঠস্বর । 

সৈকত এখনো রোজ রাতে ঘুমানোর আগে যে এই কন্ঠস্বর শুনতে পায় “সৈকত আমার লক্ষি ছেলে এবার ঘুমাও আমি তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি”। 


আর আজ এতো বছর পর সৈকত সেই কাঙ্ক্ষিত  কন্ঠ শুনতে পাবে !??এটা দুঃস্বপ্ন নয়তো!??


—কি হয়েছে এভাবে ডাকছো কেন??

—তোমার মেয়ে ফোন করেছে কথা বলবে। 


সৈকত এতো বছর পর তার প্রিয় মানুষটার মুখ এভাবে দেখবে !!??

সৈকত কখনো কল্পনাও করেনি। 


ফোনটা হাতে নিয়ে কি হাসিখুশি ভাবে কথা বলতে বলতে চলে গেলেন। 


সুমন সাহেব বললো আসলে আমার মেয়ে দেশের বাইরে থাকে । তাই প্রতিদিন আমাদের ঘুমানোর  আগে কথা বলে । 


সৈকত উঠে দাড়িয়ে বলে আজ আমি আসি । 

—কেন!!? তোমার সঙ্গে তো কথাই বলা হলো না। 

—ইটস ওকে 

বলে সৈকত বেরিয়ে হনহন করে হেটে চলে আসে। 


সৈকতের শরীরে মনে হচ্ছে আর এতটুকুও শক্তি অবশিষ্ট  নেই। 

শরীরটা কেমন যেন মনে হচ্ছে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। 


সুমন সাহেব পিছন থেকে সৈকতকে দুবার ডাকদেয় । 


কিন্তু সেই শব্দটা আর সৈকতের কর্ণে এসে পৌছায় না। 


সৈকতের মাথাটা কেমন যেন শূন্য

শূন্য অনুভব হচ্ছে। 

কোন কিছুই যেন আর ঠিকমত কাজ করছে না। 


সৈকত বেরিয়ে কোনরকমে বাইক স্টার্ট দেয়। 


সৈকতের মনে হচ্ছে আজ চারপাশের প্রকৃতি বুঝি তাকে নিয়ে তামাশায় মেতে উঠেছে।  

সব কিছু তার দিকে তাকিয়ে কেমন বিদ্রুপ ভাবে হাসছে। 

ঐ রাতের তারা সেটাও আজ আর মিটিমিটি জ্বলছে আর সৈকত কে বলছে তুই এতদিন মিথ্যার জ্বালে জড়িয়ে ছিলি। 

তোর সমস্ত কিছু আজ মিথ্যা প্রমানিত হলো। 

তোর রোজ রাতের কান্না ,তোর রোজকার নালিশ সব সবটাই মিথ্যা ছিল। 

মিথ্যার দেশে বসবাস করেছিস তুই। 

মিথ্যামায়ায় জড়িয়ে এত দিন তুই সত্য থেকে দূরে সরে ছিলি। 


সৈকত আর বাইক চালাতে পারছেনা। বুকের ভিতরের এতদিনের জমিয়ে রাখা চাপা কষ্টটা আজ বুক ফেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। 

সৈকত আর পারছেনা সেটাকে নিজের ভিতর দমিয়ে রাখতে । 

সৈকত কোনরকমে বাইক টা রাস্তার পাশে দাড় করিয়ে শরীরের সব শক্তি দিয়ে চিৎকার  করে কাঁদতে শুরু করে -----


(চলবে)

Comments