বেখেয়ালি ভালবাসা ৭

 গল্পঃ #বেখেয়ালি_ভালবাসা

লেখাঃ #সাবেরা_সুলতানা_রশিদ


(#পর্ব_৭)


১৯.

পাঁচ দিনের মাথায় সৈকত তার অফিসিয়াল ট্যুর শেষ করে বাসায় ফিরে আসে উদভ্রন্তের মত। বাসায় ফিরে সৈকত অনুভব করে বাসার পরিবেশটা কেমন যেন একটু থমথমে ভাব। 


বাসায় ফেরার পর কারো সঙ্গে সৈকতের কথা হয়নি ঠিক কিন্তু বাসায় ঢুকেই সৈকতের  মনে হল আগের সেই আনন্দমুখর পরিবেশ টা যেন মলিন হয়ে গেছে। 


সৈকত একটা কাজের মেয়েকে ডেকে জিজ্ঞাসা করে বাসার অন্যে সবাই কোথায় কাউকে দেখা যাচ্ছে না। 


কাজের মেয়েটা বলেঃ

—সবাই বাইরে আছে। আর বড় ম্যাডাম অনি বাবুকে ঘুম পড়াছে। 


—ঠিক আছে আমি রুমে যাচ্ছি । আমাকে এক মগ কফি দিস একটু পরে। 

—আচ্ছা । 


সৈকত নিজের রুমে ঢুকতেই রুমটা সৈকতের কাছে  কেমন যেন ফাঁকাফাঁকা মনে হয়। 

রুমের চারিদিক চোখ বুলিয়ে দেখে 

রুমের জিনিসপত্র তো ঠিকই আছে তাহলে কেন এমন মনে হচ্ছে যে রূমটা ফাঁকা। 


এই পাঁচ দিন বাসার বাইরে থেকে এসে কেমন যেন অন্যরকম লাগছে সবকিছু। 


সৈকত ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানায় শরীর এলিয়ে দেয় । পাশ থেকে ল্যাপটপ টা নিয়ে অন করতেই কয়েকটা ইমেল আসে । অফিসিয়াল কোন ই-মেল হবে ভেবে 

ই-মেল অন করতেই কিছু ছবি ভেসে ওঠে অজানা ই-মেল আইডি থেকে। 


ছবি গুলো দেখে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না সৈকত। 

ডুবে যায় ভাবনার জগতে। 

আসলে মেয়ে মানুষদের চেনা বড় কঠিন। 

এরা এক এক সময় ভিন্নরূপ ধরে । 

অর্থের জন্য এরা সবকিছু  করতে পারে সব। 

আসলে মেয়েরা ছলনাময়ী তা না হলে সুইটি কেন এমন করবে সৈকতের সাথে??


সৈকত ভাবে যে সুইটি কে আমি আমার কলেজ লাইফ থেকে দেখে আসছি তার সুখে দুঃখে নিজের কাছের মানুষের মত তার পাশে থেকেছি আর সে কিনা!!??

ছিঃ

আমি তো কখনও সুইটি কে বন্ধুর বেশী কিছু ভাবিনি। আর ও কিনা------

আচ্ছা মেঘ ও তো একটা মেয়ে । শুধু মেয়ে বললে ভুল হবে ও আমার বিয়ে করা বউ । কই তবুও তো মেঘ কখনও সুইটির মত এমন কোন কাজ করেনি আমার সাথে । 

মেঘ তো পারতো জোর করে নিজের স্ত্রীর অধিকারটা আদায় করে নিতে কিন্তু সেতো তা করেনি। বরং আমি যখন  যেটা 

বলেছি সে তাই করেছে কোন কিছুর প্রতিবাদ ও করেনি। 


আর সুইটি ---ভাবতেও ঘৃনা হচ্ছে। 

আমি এতদিন তাহলে ভুল মানুষের সঙ্গে বন্ধত্ব করলাম। যে কিনা আমাকে শুধু তার তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করেছে। 


রাতের কথা মনে করতেই সৈকতের কেমন যেন নিজের উপর ঘৃণা হতে থাকে।

সুইটি সৈকতের সেই কলেজ লাইফের ফ্রেন্ড একই সাথে দুজন বিশ্ববিদ্যালয়ের  গন্ডিটাও শেষ করে ছিল।  হঠাৎ করে একদিন নিজের পচ্ছন্দ করা ছেলেকে বিয়ে করে ফেলে সুইটি। পরিবার মেনে নেয় না। বিয়ের কিছুদিন পর বুঝতে পারে ছেলেটা নেশাখোর আর চরিত্র ও ভাল না। ভেবেছিল ওর স্বামী ভাল হয়ে যাবে কিন্তু

দুবছর ছেলেটার সঙ্গে সংসার করার পরও কোন পরিবর্তন না হওয়ায় চলে আসে ওকে ছেড়ে।  


হঠাৎ একদিন সৈকতের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় । সৈকত তার অবস্থা দেখে জানতে চাই কি হয়েছে । 

সুইটি তাকে সব কিছু খুলে বলতেই সৈকত সুইটিকে নিজের অফিসে চাকরির অফার দেই। 

সুইটি চাকরিটা পেয়ে আকাশের চাঁদ হাতে পায় । 

সৈকত সুইটিকে সঙ্গে নিয়ে তার বাবা মা কে বোঝায় । যে সে ভুল করেছিল এখন সে তার ভুল বুঝতে পেরেছে। 

সুইটির বাবা মা সৈকতের কথায়  সব ভুলে ক্ষমা করে দেয় সুইটিকে। 


সৈকত সুইটি কে প্রমোশন দিয়ে নিজের পি এ বানিয়ে নেয় । এ জন্য অফিসের কাজের জন্য সুইটিও সৈকতের সঙ্গে সাত দিনের ট্যুরে যায়। 


অফিসের কাজ একদিন আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। সৈকত কাজটি শেষ করে ফিরে আসার জন্য প্লান ও করেছিল কিন্তু হঠাৎ সুইটি বললো এতদিন পর যখন একটু ঢাকার বাইরে এসেছি তখন একটু ঘুরেফিরে রাতটা থেকে তারপর সকালে না হয় যাওয়া যাবে । অনেকদিন নাকি সুইটি এভাবে সময় কাটাইনি। 

তাই সৈকত আর কিছু না বলে রাজি হয়ে যায়। 


সারাদিন এখানে ওখানে দুজন মিলে ঘোরাফেরা করে হোটেলে পৌছায় । রাতে দুজন এক সঙ্গে বসে ডিনার ও করে তারপর দুজন দু’রুমে ঘুমাতে চলে যায়। 

সারাদিন দৌড়াদৌড়ির পর সৈকত কিছুটা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ দরজার টোকার শব্দে উঠে দরজা খুলে দেখে সুইটি দাড়িয়ে আছে 

“হ্যাপি নিউইয়ার ২০১৮”

সৈকতের মনেই ছিল না যে আজ থার্টিফাস্ট নাইট। মনে থাকবেই বা কি করে সৈকত এগুলো কখনও পচ্ছন্দ করে না। 

—কি হল ঢুকতে দেবে না ??

সৈকত দরজা থেকে সরতেই সুইটি রুমে ডুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। 

—আরে কি করছো??এত রাতে --

—কেন ভয় পাচ্ছো নাকি??

—কিসের ভয় ?

—এই যে এতরাতে হোটেল রুমে আমি তোমার রুমে এসেছি এটা যদি তোমার বউ জেনে যায় সেই ভয়ে ?

—কি যে বলো না সুইটি তুমি?

—কেন ভুল কি বললাম?তুমি যে হ্যান্ডসাম তাতে তো ---

—শোন কে কি ভাবলো না ভাবলো তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি কেমন সেটা আমি নিজেই জানি। 

—তারপরও তোমার বউ যদি তোমাকে ভুল বোঝে। বলেই, সুইটি হো হো করে হাসতে থাকে। 


সৈকত সুইটি কে কখনও বলেনি, যে ও মেঘকে মেনে নেয় নি। সৈকত মেঘকে তার জীবন থেকে চলে যেতে বলেছে। 


সৈকত বলে তুমি এখন যাও আমি ঘুমাবো খুব ঘুমপাচ্ছে। 


—একদম না। তাহলে এটার কি হবে ?বলে সুইটি পেছন থেকে হুইস্কির বোতলটা  সৈকতের সামনে ধরে। 


—না আমি আজ এসব খাবো না। 


—আমি প্লান করে রেখেছিলাম আর তুমি কি না??


—না সুইটি প্লিজ। 


—না আজ আর আমি তোমার কোন কথাই শুনবো না। 


—আচ্ছা ঠিক আছে তবে খুব  অল্প । 


—ওকে


সুইটি দুটো গ্লাসে হুইস্কি ঢেলে একটা সৈকতের হাতে দেয় আর একটা নিজে নিয়ে চেয়ার্স বলে পান করা শুরু করে । 


একটু পান করতেই সৈকত কেমন যেন চোখের সামনে সব ঝাপসা দেখতে শুরু করে। 

মাথাটা ঝিমঝিম করে ওঠে সৈকতের।  

তারপরের কিছু সৈকতের আর মনে ছিল না।  

সকালে ঘুম ভাঙ্গতেই দেখে সৈকতের বুকের উপর মাথা রেখে সুইটি এলোমেলো হয়  শুয়ে আছে ।

সৈকত বুঝতে পারে না সে ভুল দেখছে না সত্যি দেখছে। 

কিছু সময় ঘোরের মধ্যে কাটিয়ে লাফ মেরে ঠেলে ওঠে সৈকত।  


সুইটির ঘুম ভেঙ্গে যায় । সৈকতকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে নিজের দিক তাকিয়ে লজ্জা পায় সুইটি। 


সৈকত বলেঃ

—আমি এখানে এই রুমে কি করে এলাম??


—তোমার মনে নেই?


—আমি তো আমার রুমে ছিলাম। 


—হ্যা, তুমি তোমার রুমে ছিলে । কিন্তু আমি তোমার সাথে  ড্রিংকস শেষ করে এসে আমার রুমে আসতেই ---


—কি আসতেই??


—তুমি আমার দরজায় টোকা দিলে আমি দরজা খুলতেই তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরে ---


—স্টপ ইট। কি বলছো তুমি এসব?


—হ্যা সৈকত আমি ঠিকই বলছি ।  


—না,সবটা মিথ্যা । তোমার নিশ্চয় কোন ভুল হচ্ছে?


সুইটি একটু ইমোশনাল হয়ে বললোঃ

—তুমি ঠিকই বলছো সবটা মিথ্যা। আমারই ভুল। 


—কি বলতে চাইছো??


—দেহটা হয়তো আমার ছিল কিন্তু তুমি মেঘ কে অনুভব করেছ। হুইষ্কি পেটে পড়ার পর তুমি আমাকে তোমার চোখে মেঘ দেখেছ।  শুধু মেঘ মেঘ করে সারা রাত পার করেছ। 


সৈকতের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। সে যে খারাপ সে তা জানে কিন্তু সে এতটা নীচে নামবে ??না ,না এটা কখনোও সম্ভব না।  এত বছর ধরে আমি এসব ছাইপাস গিলছি কিন্তু কই এর আগে কখনই তো এমন কিছু হয়নি । তাহলে আজ কি করে!!??


সৈকত আর একটা মুহূর্ত দেরি না করে নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়ে বাসার উদ্দেশ্য। 

সারা পথ শুধু ভেবেছে কিভাবে কি হয়ে গেল? কিন্তু কোন উত্তর খুজে পাই নি সৈকত। 


হঠাৎ রোজির কথায় বাস্তবে ফেরে সৈকত

—কি রে কখন এলি ??

—এইতো কিছুক্ষণ  আগে। 

—কাজ টা কি ঠিক করলি!!?


ভাবির মুখে এমন কথা শুনে সৈকত চমকে ওঠে । মনে মনে ভাবে ভাবি কি তবে জেনে গেছে এসব?? এটা কিভাবে সম্ভব?আমি বাসায় আসার আগে কি কেউ ------

—কি হল বল কাজটা কি ঠিক করেছিস??

—কি করেছি আমি?কোন কাজের কথা বলছো??

—তুই মেঘ কে কি বলেছিস? যার জন্য তুই চলে যেতেই বাবাকে বলে বাবার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে বাড়ি গেছে মন খারাপ করে ।কেও কারণ টা না বুঝতে পারলেও আমি বুঝতে পেরেছি । নিশ্চয় তুই ওকে  বকাবকি করেছিলি যার জন্য ও----


ভাবি কথায় কথাই সৈকত হাফ ছেড়ে বাঁচলেও মেঘের চলে যাওয়ার কথা শুনে সৈকতের বুকের ভিতরটা কেমন যেন একটু ব্যথা অনুভব করে । এ জন্যই কী তাহলে বাড়ি ফেরার পর থেকে সৈকতের মনে হচ্ছিল  কি যেন নেই আর নিজের রুমে ঢুকে মনে হচ্ছিল রুমটা বড্ড ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। 


—কি হলো ?কি ভাবছিস এত??কিছু বলেছিলির মেঘ কে ?


সৈকত একটু চুপ থেকে বলে না আমি কিছু বলিনি। আমি কেন কিছু বলতে যাবো?দেখ হয়তো বাবা মার জন্য খারাপ লাগছে তাই চলে গেছে ঘুরতে । 


—এই সত্যি করে বলতো তোদের দুজনের কি হয়েছে??

—কি হবে !!!কিছু হয়নি তো। 

—তাহলে মেঘ কেন তুই যেতে না যেতেই হুট করে তোকে না জানিয়ে চলে গেল। 

—কে বলছে আমি জানিনা??আমি জানিতো । ও রাতে বলেছিল যে বাবা মায়ের জন্য মনটা কেমন করছে । তাই আমি ওকে বলেছিলাম কিছুদিন বাড়ি গিয়ে ঘুরে আসতে । 

—ওহ্ঃ যাক বাবা বাচালি আমায়। 

—আমি তোমাকে মেরে ফেললাম কখন যে বাচাবো?

—এই ইয়ার্কি করিস নাতো। আমি তো ভেবে ছিলাম তোদের দুজনের কিছু হয়েছে তাই ------

আচ্ছা আরেকটা কথা 

—আবার কি কথা(বিরক্তি নিয়ে)

—তোদের দুজনের বিয়ের পর এভাবে ওকে একা যেতে দেওয়া ঠিক হয়নি। ওর বাড়ির সবাই কি মনে করবে বলতো??

—তুমি নিজেই যদি এতকিছু মনে করো ভাবি তাহলে মেঘের বাড়ির লোক আর কী মনে করবে। এবার না হয় ওদের ভাববার জন্য কিছু রাখ------

—তুই না পারিস ও।  ঠিক আছে নীচে আই আমি তোর খাবার দিতে বলি। 

—না ,ভাবি আমি এখন খাব না । ক্ষুদা নেই। 

—এতটা পথ জার্নি করে এলি আর এখন বলছিস ক্ষুদা নেই?নাকি মেঘ চলে যাওয়ার কথা শুনে--

—আচ্ছা ঠিক আছে তুমি খাবার টা কাওকে দিয়ে পাঠিয়ে দাও আমি খেয়ে নিব। 

—এইতো দেখলি!!মেঘ বাসা থেকে দুদিন যেতে না যেতেই আবার তুই আগের মত শুরু করেছিস। 


এবার সৈকতের একটু বেশি রাগ হলো

—আচ্ছা কি শুরু করেছ বলতো আসার পর থেকে শুধু মেঘ মেঘ করে যাচ্ছো । এ বাড়িতে কি এই নামটা ছাড়া আর অন্যে কিছু নেই???


রোজি সৈকতের রাগান্বিত ভাব দেখে বলে আচ্ছা ঠিক আছে আমি তোর খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি। 


—না ,থাক লাগবে না । আমি নিজেই আসতেছি। 


২০.


সৈকত খাওয়া শেষ করে এসে বেলকনিতে দাড়িয়ে সিগারেট  ফুকতে থাকে। আর ভেসে যাওয়া ধোয়ায় কাকে যেন  খুঁজে  । 

ভাল লাগছে না। হঠাৎ করে চারপাশটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। 


হঠাৎ কারো পায়ের শব্দ শুনে তাড়াতাড়ি করে হাত থেকে সিগারেট টা ফেলে দিয়ে পা দিয়ে ঢলে নিভিয়ে দেয় সৈকত। 


—ভাইয়া তোর সাথে আমার কিছু কথা আছে। 


সৈকত ঘাড় ঘুরিয়ে ঝিনুককে দেখে বলে ও তুই!!


—কেন তুই কাকে আসা করেছিলি??


—কাউকে না। তা হঠাৎ তুই আমার কাছে কি মনে করে?


—তুই ভাবিকে আনতে যাবি কবে?


—কেন !!কি হয়েছে?


—যেটা বলছি তার উত্তর দে। 


—আমি কেন আনতে যাব?আমি কি রেখেআসছি নাকি?


—তুই যাবি না তো কে যাবে !!?তুই না গেলে ভাবি আসবে না। 


—কে বলছে তোকে এসব!!?


—আমি জানি। দেখ ভাইয়া এই কয়েকদিনে আমি ভাবিকে যতটুকু কাছ থেকে দেখেছি যতটুকু বুঝেছি ভাবি খুব জেদী আর অভিমানী । ভাবী তোকে অনেক ভালবাসে  যেটা তুই হয়তো বুঝতে পারিস না। 


—থাক হয়েছে তোকে আর পাকামো করতে হবে না। 


—আমি পাকামো করছি না। সত্যি বলছি। তুই কি জানিস তুই অফিসের কাজে বাইরে চলে যাওয়ার পর ভাবী খুব কান্নাকাটি  করেছিল। কেন যে সে এত কান্না করেছিল তা আমি জানিনা। 

পরে জিঙ্গাসা করতেই বললো বাড়ির সবার জন্য খারাপ লাগছে কিন্তু আমি জানি ভাবি সেদিন মিথ্যা বলেছিল। 


—তাহলে সত্যিটা কি?


—সত্যিটা হচ্ছে ভাবী সেদিন তোর জন্য কান্না করেছিল। যখন দেখল তুই সুইটির মত একটা খারাপ মেয়ের সঙ্গে উঠাবসা করিস। আগের দিন তোকে সুইটি এখান থেকে পিক করলো ভাবি সেটা দেখেছিল। 

আবার তুই যে সুইটিকে নিয়ে শপিংমলে গিয়েছিলি সেটাও কিন্তু ভাবি জানতো। আবার সেইদিন রাতেও সুইটি তোকে এখানে নামিয়ে দিয়েছিল সেটাও জানে। 


—তো??


—দেখ ভাইয়া তুই হয়তো ভাল করে জানিস বাবা যেটা বলে যেটা ধারণা করে সেটা কখনও ভুল হয়না। ঐ মেয়েটা যে ভাল না, সেটা কিন্তু বাবা তোকে আকার ইঙ্গিতে অনেক আগেই বুঝিয়ে দিয়েছে । কিন্তু তুই বাবার কথা না শুনে শুধুমাত্র তুই তোর জেদ বজায় রাখার জন্য ঐ মেয়েটাকে তুই তোর কোম্পানিতে চাকরি দিলি আবার তাকে তোর পি এ ও বানালি। 


—এত কথা না বলে কি বলতে চাইছিস সেটা সোজাকরে বল। 


—আমি তোকে এটাই বলতে চাইছি যে তোর জেদ বজায় রাখতে এবার অন্তত মেঘ ভাবীর জীবনটা নিয়ে কোন ছেলেখেলা করিস না। বাবা তাকে নিজে পচ্ছন্দ করে তোর বউ করে এ বাড়িতে নিয়ে এসেছে এখন তুই বাবার উপর রাগ দেখাতে গিয়ে এমন কাজ করিস না যাতে পরে তোকে আফসোস করতে হয় । 


—তোর কথা শেষ হলে তুই এখন যেতে পারিস। 


—হ্যা যাচ্ছি বলেই 

ঝিনুক রুম থেকে বেরিয়ে যায় । 


ঝিনুক রুম থেকে বের হতেই সিগারেটের  প্যাকেট থেকে আর একটা সিগারেট  বের করে দূরদৃষ্টি দিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে যায় সৈকত। 


আমি কাকে ঠকাচ্ছি !!?

নিজেকে না অন্যেকে ??

কেন করছি এসব?

মেঘ কে চৌধুরী সাহেব পচ্ছন্দ  করেছে বলে ??

নাকি সত্যি আমি মেঘ মন থেকে মানতে পারছি না?

নিজের মস্তিষ্কে একটার পর একটা প্রশ্ন আছড়ে পড়ছে সৈকতের । 

কিন্তু উত্তর !!

কে দেবে ??

সেটাও তো আমাকেই দিতে হবে । 

জীবনের সব হিসাব নিকাশ  মেলাতে হবে। 

সত্যি তো আমার কোন অধিকার নেই একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করার। 

আচ্ছা আমি কি সত্যিই মেঘ কে ভালবাসিনা??

যদি ভালই না বাসি তাহলে কেন পায়ের আওয়াজ টা শুনে মনে হয়েছিল এই বুঝি মেঘ রুমে ঢুকে সিগারেটের গন্ধ শুকে কেশে উঠবে । 

আর কেনই বা আমি তাহলে হাত থেকে সিগারেট টা শেষ হওয়ার আগেই ফেলে দিলাম?

আর কেনই বা ওর চলে যাওয়ার কথা শুনে বুকের ভিতরটায় কেমন জানি শূন্যতা অনুভব হচ্ছে। 

কেন রুমটা আজ এত খালি খালি লাগছে ?

তাহলে কি আমি সত্যিই মেঘ কে------

না,না আমি যদি মেঘকে ভালবাসতাম তাহলে কেন এতদিন ওর প্রতি আমার কোন ভাললাগা কাজ করে নি ।কেন ওর প্রতি আমার কোন আবেগ অনুভূতি কাজ করেনি। 

কেন শুধু মনে হয়েছে আমি ওকে মানবতা/ সহানুভূতি দেখাচ্ছি। 


আর মানবতা/সহানুভূতি দিয়ে আর যাই হোক না কেন সংসার গড়া যায় না। 

আর সংসার গড়লেও সেই সংসারে কোনদিন সুখ আসে না। 


আচ্ছা ঐ মেয়েটা এমন কেন!!

আমি ওকে এত এভয়েড করেছি,অপমান করেছি প্রতিনিয়ত আর ও আমার ছোট বড় সব দোষ গুলো আড়াল করে শুধু নিজের মনের ভালবাসার  বহিঃপ্রকাশ করেছে। 

ওর জায়গাই অন্যেকোন মেয়ে হলে হয়তো এতদিনে -------

আর ওর জায়গায় অন্যে কোন মেয়ে হলে বোধহয় সুইটির সাথে আমাকে দেখা নিয়ে আরো অনেক কিছু করে ফেলতো। 

কিন্তু মেঘ,!??

কখনও কিছু বললো না। এমন কি কোন সন্দেহ করলো না। 

একটার পর একটা সিগারেট  শেষ হয়ে কখন যে পুরো প্যাকেট টাই শেষ হয়ে গেল সৈকত তা খেয়াল ও করলো না। 


————**——**——**————


কিরে না খেয়ে বসে আছিস যে ??


আম্মুর কন্ঠ শুনে মেঘের ঘোর কাটে। 

—এই তো খাচ্ছি বলে একবার মুখে দিতেই বলে না, খাবো না ভাল লাগছে না।


এইতোর কি হয়েছে  সত্যি করে বলতো আমায় । শ্বশুরবাড়ি থেকে আসার পপ থেকে তুই কেমন যেন মনমরা হয়ে আছিস। না ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করিস আর না ঠিকমত মন খুলে কারো সঙ্গে কথা বলছিস। 

সত্যি করে বলতো মা জামাই কি তোকে কিছু বলেছে?

—না আম্মু আমার কিছু হয়নি । তুমি শুধু শুধু দুঃশ্চিন্তা করছো । 

—মায়ের কাছে মিথ্যা বলছিস। তোর মুখ যা বলছে তোর চোখ কিন্তু সেটা বলছে না। তুই কিছু একটা আমার কাছ থেকে লুকোতে  চাইছিস। 

—না আম্মু তুমি বিশ্বাস করো তেমন কিছুই হয়নি। আর আমি কেনইবা তোমার থেকে কিছু লুকাবো বলো??

—জানিনা,তাহলে বল তুই এখানে আসার পর থেকে সৈকত তোর কেন কোন খোজ নেয় নি। ও বাড়ি থেকে সবাই তোকে ফোন করেছে শুধু সৈকত বাদে । 

—আসলে ও কোন ফোন ব্যবহার করে না তাই হয়তো । 

মেঘ যে সৈকত কে একটা ফোন দিয়েছিল সেটা সে মায়ের কাছ থেকে গোপন করে রাখে । আর গোপন করবে নাই বা কেন সেদিন অফিস থেকে ফিরে এসে সৈকত তো ফোনটা মেঘের হাতে ধরিয়ে বলেছিল এসবের আমার কোন দরকার নেই। 

মেঘ সেটা আসার আগে সৈকতের আলমারির ভিতর রেখে এসেছে । হয়তো সে সেটা কখনো খেয়াল ও করবে না।  কিন্তু ডায়েরি টা !!?

সেটা কি সৈকত পাবে নাকি সেটাও পাবে না। যদি ডায়েরি টা না পায় তাহলে যে কোন কিছুই ঠিক হবে না। 

—কি রে কি ভাবছিস আবার?

—না কিছু না। 

—তুই বললি সৈকত ফোন ব্যবহার করে না তাই তোর খবর নিচ্ছে না। তাই বলে কি বাসায় টেলিফোন লাইনটাও নেই বা অন্যেদের কাছ থেকে ফোন নিয়ে ফোন করা যায় না?  

—থাক এসব বাদ দাও । 

—কেন বাদ দিব বল??আচ্ছা আমি যদি ধরে নিই তুই রাগ করে এসেছিস তাহলে কেনই বা ও বাড়ি থেকে তোকে কেউ একজন নিতে আসছে না। 


মেঘ একটু মন খারাপ করে বলেঃ

_আচ্ছা আমি কি এখন তোমাদের পর হয়ে গেছি আম্মু যে আমি দুদিন এসে থাকতে না থাকতেই তুমি আমাকে ঐবাড়িতে পাঠানোর জন্য এত উঠে পড়ে লেগেছো?


—কি বলছিস মেঘ তুই। আমি কি এ কথা বলছি??এখন বুঝতে পারবি না সন্তানদের জন্য মায়ের মনে কত চিন্তা হয় । যখন নিজে মা হবি তখন বুঝবি বলে মেঘের আম্মু ছলছল চোখে অভিমান করে মেঘের কাছ থেকে চলে যায়। 


মেঘ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে । আর ভাবে জানিনা আমার এ পরীক্ষায় আমি আদেও উত্তীর্ণ  হতে পারবো কিনা। 

ও বাড়ির সবাই যে আমাকে কতটা ভালবাসে  তা না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। আর এখানে আসার পর সেটা আরো ভাল ভাবে উপলব্ধি করতে পারছি। সারাদিনে কয়েকবার ও বাড়ি থেকে একেক জন একেক সময় ফোন করছে কি করছি কি খাচ্ছি এগুলোই জিঙ্গাসা করছে শুধু। আর দিনের মধ্যে সবচেয়ে যে বেশী ফোন করছে সে হচ্ছে মেঘের শ্বশুর রায়হান চৌধুরী। 

কান্নাজড়িত কন্ঠে বার বার ফোন করছে আর বলছে তুই ছাড়া যে বাড়িটা আমার শূন্য শূন্য লাগছে । 

মেঘ যেদিন চলে এসেছিল তারপরের দিনই মানুষটা হয়তো চলে আসতো মেঘ কে নিয় যেতে । 

কিন্তু শুধু আসেনি একটা কারণে। 

আর সেটা হলো মেঘ যেদিন চলে আসবে সেদিন আসার আগে শ্বশুরের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার আগে বলে এসেছিল বাবা এটা আমার জীবনের সবচয়ে বড় পরীক্ষা আপনার ছেলে যদি আমাকে কখনো আনতে যায় তাহলে সেদিন আসবো আর নয়তো আসবো না। 


মেঘের কথা শুনে চৌধুরী সাহেব সেদিন 

কেঁদেছিল। 

মেঘ বলেছিল বাবা আপনি কান্না করবেন না। আপনার দোয়া থাকলে আপনার মেয়ে ঠিক জিতবে । 

চৌধুরী সাহেব মেঘের মাথায় হাত রেখে বলেছিল আমি জানি তুই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ  হবি আর এটা আমার বিশ্বাস । 


২১.


মেঘ একা একা ছাদে এসে দাড়িয়ে রাতের ঘুমন্ত শহর দেখতে থাকে । হঠাৎ  কাঁধে কারো হাতের স্পর্শে পিছন ফিরে দেখে ওর ভাইয়া দাঁড়িয়ে আছে। 

—কিরে এত রাতে এই ঠান্ডায় একা ছাদে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?

—ঘুম আসছিল না তাই ভাবলাম একটু পায়চারি করলে যদি ঘুম আসে। তা তুমি এখানে কেন!?

—তোকে রুমে গিয়েছিলাম খুঁজতে দেখি রুমে নেই। তখন মনে হল তুই ছাদে আছিস তাই চলে এলাম। আচ্ছা বোন সেদিন কি যেন বলতে চেয়েছিলি কিন্তু বলিস নি। 

—হ্যাঁ তোমাকে কিছু কথা বলার ছিল ভাইয়া,কিন্তু সেদিন হঠাৎ আম্মু চলে এসেছিল কথার মাঝে তাই আর বলা হয়ে ওঠেনি। 

—তাহলে এখন বল। 


মেঘ কি যেন ভেবে নিয়ে বলে ভাইয়া সুইটি ফিরে এসেছে। 

—সুইটি!!!???

—হ্যাঁ  সুইটি। 

—কোথায় !!??

—ভাইয়া ও আগে তোমার জীবনটাকে নরক করে চলেগিয়েছিল এখন সে আবার আমার জীবনটা নরক করে দিতে ফিরে এসেছে। 

—মানে!!??

মেঘ সব সংক্ষেপে বলে ওর ভাইয়াকে । 


—তুই কি জানিস সৈকতের সাথে ওর কিসের সম্পর্ক ??

—না ভাইয়া আমি জানি না। তবে এতটুকু জানি যে ও সৈকতের পি এ। 

—সুইটি কি তোকে দেখেছে?

—না ও আমাকে দেখে নি। কিন্তু আমি ওকে দেখেছি । প্রথম দেখায় চিনতে পারিনি কারণ সেদিন খুব দূর থেকে দেখেছিলাম। কিন্তু সেদিন যখন সৈকত অফিসের  কাজে বাইরে যাচ্ছিল সেদিন কাছ থেকেই দেখেছি । কিন্তু ও আমাকে দেখে নি। 

—কেউ কি ওর আগের অতীতের কথা জানে তোর শ্বশুরবাড়ির লোকে?

—মনে হয় না। আর আমিও কাউকে কিছু জিঙ্গাসা করিনি। 

—ঐ লোভী মেয়েটা আমার জীবনটা নিয়ে খেলা করেছে । আমি কিছুতেই ওকে তোর জীবন নিয়ে খেলা করতে দিব না। তারজন্য আমার যা করার আমি সব করবো। 

—আমার খুব ভয় করছে ভাইয়া। 

—কেন রে বোন এই ভাই থাকতে তোর এত ভয় কিসের?আমি আছিতো আমি সব সামলে নিব। 

—কিন্তু ভাইয়া--

—কোন কিন্তু না। ভয় নেই তোর ভাইয়া এখন আর আগের মত নেই। এখন সে বাস্তবটাকে মেনে নিয়ে অনেক কিছু বুঝতে শিখেছে। জানিস তো মানুষের যখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায় ,তখন সে রুখে দাঁড়াতে শেখে । কারণ সে তখন বুঝতে পারে তার পালাবার সব রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। এখন প্রতিপক্ষের সঙ্গে মোকাবেলা তার করতেই হবে । হয় হারবে নয় জিতবে । কিন্তু সেই মুহূর্তে কেউ হেরে যাওয়ার জন্য লড়ে না। জিতে ফিরে আসার জন্য লড়ে । তার জন্য তাকে যা করার দরকার তা সে সব করতে প্রস্তুত হয়ে যায়। 


মেঘ তাকিয়ে দেখে রাজুর চোখে মুখে দৃঢ়তার ছাপ ফুটে উঠেছে। 


মেঘ আর কোন কথা বলে না । 

————**——**——**————


ও দিকে চৌধুরী সাহেব বাসায় ফিরে সৈকতের বাসায় ফেরার কথা শুনেই রোজির মাধ্যমে সৈকত কে দেখা করার জন্য তলব করে । 

সৈকত জানে কেন তাকে চৌধুরী সাহেব ডেকেছেন মেঘের কথা বলার জন্য নিশ্চয়। 

কিন্তু এ মুহুর্তে আমি কি করতে পারবো কিছুই না।  আমার এখানে করার কিছু নেই। 

এরা দুজন মেলে আমার মায়ের নামে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে। আমার মনটাকে আমার মায়ের প্রতি বিষিয়ে দেওয়ার জন্য এতটা নীচে নেমেছে যে তা কল্পনা করাও অসম্ভব। 


এইসব কথা মনের মধ্যে পুষে রেখে সৈকতের দুদিন কেটে যায় । 

এক দিকে সুইটির বিশ্বাসঘাতকতা আর একদিকে নিজের মনের সাথে যুদ্ধ এই দুই মিলিয়ে সৈকত মানসিক ভাবে কিছুটা ভেঙ্গে পড়ে । কিন্তু কাউকে কিছু বুঝতে দেয় না। দুটো দিন অফিসে না গিয়ে বাসায় নিজের রুমে শুইয়ে বসে সময় কাটাই। 

না এভাবে আর সময় কাটালে চলবে না । নিজেকে কাজের মধ্য ব্যস্ত রাখতে হবে যাতে করে এসব চিন্তা গুলো আর মাথার মধ্যে দানা বাধতে না পারে । 

সৈকত সকালে তাড়াতাড়ি করে এলার্মের শব্দে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে অফিস যাওয়ার কাপড় খোঁজতেই মনে পড়ে মেঘ তো আর এ বাড়িতে নেই চলে গেছে  । 

আগের মত কেউ আর আগে থেকে কাপড় গুলো গুছিয়ে দেবে না যে ,কোনটা পরে অফিস যেতে হবে । 

সৈকত আলমারি খুলে একটা একটা করে শার্ট বের করে আর বিছানার উপর ছুড়ে ফেলে কোনটা পরবে এটা না ওটা কিন্তু কোনটাই ঠিক করতে পারেনা।  অবশেষে একটি শার্ট পরে কোর্ট পরে তৈরি হয়ে নেয় । আলমারির দরজা বন্ধ করতে গিয়ে নজরে পড়ে মেঘের দেওয়া সেই ঘড়িটার উপর । 

ঘড়িটা দেখে দরজা আটকে দিতে গিয়েও কি ভেবে সৈকত ঘড়িটা বের করে হাতে পরে নেয়। 


তারপর নাস্তা করতে গিয়ে মুখোমুখি হয় চৌধুরী সাহেবের সঙ্গে।  

মেঘ চলে যাওয়ার পর থেকে সবার মনের  মধ্যে কেমন যেন  সৈকত কে নিয়ে ক্ষোভ বিরাজ করছে। 

সৈকত খেয়াল করে দেখেছে এ দুই দিন কেউ তার সঙ্গে কোন কথা বলে নি। সৈকত যদিও কথা বলার চেষ্টা করেছে তারা হ্যা ,হু ছাড়া তার বাইরে সৈকতের সঙ্গে আর কোন কথা বলে নি। 

নাস্তার টেবিলে গিয়ে সৈকত গুড মর্নিং বলে নাস্তা করতে বসলেই পরিবারের অম্য সবাই কোন কথা না বলে মাথা নিচু করে যার যার মত নাস্তা খেয়ে উঠে চলে যায়। 

কেউ সৈকতের প্লেটে নাস্তা তুলে দেয় না। 

সৈকত নিজের টা নিজে তুলে নেয়। 


হঠাৎ পাশ থেকে অনি বলেঃ

—চাচ্চু তুমি ছোট মাকে কবে আনবে ?

সৈকত কোন কথার উত্তর দেয় না। 

অনি আবার বলেঃ

—বলোনা চাচ্চু তুমি ছোট মা কে কবে আনবে ?আমার ছোট মাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। প্লিজ চাচ্চু বলোনা। 


—আমি জানিনা অনি । তুমি এক কাজ করো তুমি তোমার ছোট মাকে একটা ফোন করো বলো যে তুমি তাকে দেখতে চাও দেখ তোমার ছোট মা ঠিক তোমার সঙ্গে দেখা করতে চলে আসবে। 

—না চাচ্চু ছোট মা আর আসবে না। আমি ফোন করেছিলাম । ছোট মা বলেছে তুমি না গেলে ছোট মা আর এ বাড়িতে আসবে না। 

—তোমার ছোট মা যদি নিজের থেকে না আসে তাহলে আমি কি করতে পারি বলো?

—চাচ্চু 

—হ্যা অনি বলো। 

—চাচ্চু আমি তোমার কাছে একটা জিনিস চাইবো তুমি দিবে??

—বলো তুমি কি চাও। আমি দিব। 

—প্রমিস?

— হুম প্রমিস। 

—চাচ্চু আগামী সপ্তাহে যে আমার জন্মদিন সেটা কি তোমার মনে আছে?


সৈকত একটু হিসাব করে বলে হ্যা চাচ্চু মনে আছে। 

—আমার জন্মদিনে তোমার কাছে একটা গিফট চাইবো দিবে । 

—হুম দিব বলো কি চাও?

—আমি ছোট মা কে চাই। আমার জন্মদিনে ছোট মা সবার আগে আমাকে উইশ করবে আমি তাই চাই । 


সৈকত অনির কথা শুনে আর কোন কথা বলে না। 

—কি হল চাচ্চু বলো । তুমি কিন্তু আমাকে প্রমিস করছো আমি যা চাইবো তুমি তাই দিবে। 


সৈকত বুঝতে পারেনা এখন অনিকে কি বলা উচিত। 

হঠাৎ  রোজি এগিয়ে এসে বলে 

অনি চুপ করো । এটা তোমার চাচ্চু তোমাকে কখনো দিতে পারবে না মনে হয় তাই তোমার চাচ্চু কোন কথা বলছে না। 


রোজির কথা শুনে অনি কান্না করতে শুরু করে । 

আমি ছোট মাকে ছাড়া কিছুতেই জন্মদিনের কেক কাটবো না। 


রোজি বুঝিয়ে অনিকে ওখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। 


সৈকত নাস্তার টেবিল ছেড়ে উঠে দাড়াতেই চৌধুরী সাহেব বললোঃ

—এতটুকু বাচ্চা পর্যন্ত বউমাকে ছাড়া এ বাড়িতে শূন্য শূন্য অনুভব করছে । আর তুমি!!?

নিজের মনের জিদ টাই তোমার কাছে বড় হয়ে গেছে আর এতগুলো মানুষের ভালবাসা স্নেহ মমতা কোনটাই তোমার চোখে পড়ছে না??

দেখছো না এ বাড়িটা বউমাকে ছাড়া কেমন খাঁ খাঁ করছে। 

এ বাড়ির কাজের লোক থেকে শুরু এই ছোট্ট অনি পর্যন্ত এই শূন্যতা অনুভব করতে পারছে আর তুমি আমার উপর জিদ করে ঐ মেয়েটাকে দিনের পর দিন কষ্ট দিয়ে গেছ অপমান করেছ। মেয়েটা সব মুখ বুজে সহ্য করেছে শুধুমাত্র তোমাকে ভালবাসে  বলে । এখনও সময় আছে তুমি বউমাকে ফিরিয়ে নিয়ে এসো। বউমা তোমার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছে। 


চৌধুরী সাহেবের কথা শেষ হতেই 

সৈকত বললোঃ

—আপনার কথা যদি শেষ হয়ে যায় তাহলে আমি আপনাকে কিছু কথা বলতে চাই।

—হ্যা বলো। 


—আপনি জিদ বলুন আর রাগ বলুন না কেন আমি আপনাকে কখনই আপনার উদ্দেশ্য সফল হতে দেব না । আপনি কি ভেবেছেন মেঘ কে দিয়ে আপনার আমার ভিতরের যুদ্ধটা শেষ করবেন ??

ওকে আপনি আপনার মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আপনি আপনার উদ্দেশ্য হাসিল করবেন ?

মোটেও না। আমি সেটা কখনও হতে দিব না। 

যুদ্ধটা আপনার আর আমার।  এর মধ্যে তৃতীয় কেউ আসলে সে নিজেই শেষ হয়ে যাবে। 


চৌধুরী সাহেব সৈকতের শেষ কথা শুন গর্জে ওঠে

— সৈকত!!


—কি চৌধুরী সাহেব অবাক হচ্ছেন?? ভেবেছেন আমি আপনার প্লান বুঝি বুঝতে পারবো না। আপনি যে মেঘ কে দিয়ে আমার মায়ের নামে আমার কাছে যেসব খারাপ কথা বলিয়েছেন ভেবেছেন সেগুলো শুনে বোধহয় আমি আমার মাকে ঘৃনা করে আপনাকে বাবা বলে ডাকবো ??কিন্তু না সেটা কখনও সম্ভব না। 

 

—কি বললে তুমি!!???

—কি হলো চমকে উঠলেন যে?? ও বুঝতে পেরেছি আমি যে আপনার প্লান টা বুঝে ফেলবো সেটা মনে হয় আপনি কখনোও আশা করেন নি? কিন্তু আপনার দুভাগ্য যে সেটা আমি ধরে ফেলেছি। 


—তুমি একটু আগে কি বললে?আমি মেঘ কে দিয়ে কি করিয়েছি??


—আপনি এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন!?

আপনি তো এত তাড়াতাড়ি  ভুলে যাওয়ার মানুষ নন তাহলে??

নাকি ভুলে যাওয়ার অভিনয় করছেন??


—আমি এতকিছু শুনতে চাইনি।  আগে বলো তুমি তোমার মায়ের কথা কি বললে?

— আপনি মেঘ কে দিয়ে আমাকে কেন বলিয়েছেন যে আমার মা মারা যায় নি!!?আমার মা বেঁচে আছে আর সে 

অন্যে একজনের সঙ্গে-----


—স্টপ ইট সৈকত। জাস্ট স্টপ । আর কোন কথা বলো না তুমি। তুমি এখন যেতে পারো। 

—কেন চৌধুরী সাহেব শুনতে এখন খারাপ লাগছে??নাকি খারাপ লাগার অভিনয় করছেন??আমি জানি আপনি খুব বড়  মাপের একজন অভিনেতা। কিন্তু আপনার এই অভিনয়টা ঠিক আপনার সাথে যায় না। কেমন যেন লাগে। আচ্ছা আপনি আপনার এই নিচু মনের চিন্তাভাবনা নিয়ে কিভাবে রাজনীতি করেন বলেনতো?অবশ্য জনগণ এখনো বোকাই রয়ে গেল তাইতো আপনাদের মত মানুষদের তারা বিশ্বাস করে। 

আচ্ছা এ দেশের জনগণ কবে সচেতন হবে বলুনতো??

যে নেতারা তাদের নিজেদের ছোট ছোট ঘর সামলাতে পারেনা তারা কিভাবে এই গোটা দেশ টাকে সামলাবে??


চৌধুরী সাহেব আর দাড়িয়ে থাকতে পারে না । হুপ করে চেয়ার টাতে বসে পড়ে। 


সৈকত চৌধুরী সাহেবের অবস্থা বুঝতে পেরে আর কথা না বাড়িয়ে অফিসের উদ্দেশ্য বেরিয়ে যায়। 


সৈকতের কথা শুনে চৌধুরী সাহেবের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। তিনি এই ১৬বছর ধরে যে কথা গুলো নিজের বুকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছেন কাউকে কোন কিছু বুঝতে দেন নি ,নিজের যন্ত্রণা শুধু নিজেই ভোগ করে চলেছেন আর আজ সে কথা গুলো --------

কি করে সম্ভব!!?

আমিতো আমার ছেলেমেয়েদের এ কথা গুলো জানাতে চাইনি কখনো। তাহলে ??

আমি তো চাইনি তার মাকে তাদের সামনে  ছোট করতে !!

জীবন আমাকে নিয়ে এতটা নিষ্ঠুর খেলায় কখনো মেতে উঠবে তা বুঝতে পারিনি। 

আহ্ঃ বুকের বাম পাশে চিন চিন করে ব্যথা শুরু হচ্ছে । কেউ যেন নিশ্বাস টাকে আটকে ধরতে চাইছে !

জিহ্বাটা শুকিয়ে গেছে । 

কাউকে ডেকে যে বলবে একটু পানি দিতে সে শক্তি টুকু ও শরীরে আর অবশিষ্ট  নেই। জিহ্বা টা যেন কিছুতেই নড়তে চাইছেনা।  কন্ঠনালী অবরুদ্ধ হয়ে গেছে। 

ব্যথাটা বেড়েই চলেছে মনে হচ্ছে কেউ যেন বুকের উপর একটা পাহাড় উঠিয়ে চাপা দিচ্ছে। 

কিছুক্ষনের মধ্যে সবটা অন্ধকার-------


(চলবে)

Comments