বেখেয়ালি ভালবাসা ৫

গল্পঃ #বেখেয়ালি_ভালবাসা

লেখাঃ #সাবেরা_সুলতানা_রশিদ

#পর্ব৫


১২.

সৈকত পেছন থেকে গিয়ে মেঘের কাঁধে হাত রাখলো। 

মেঘ পিছন ফিরে সৈকত কে দেখে বললোঃ

—আরে আপনি এসে গেছেন মিস্টার সৈকত চৌধুরী। ওয়েলকাম, ওয়েলকাম। 

এখানে এসেছেন নিশ্চয় আবার আমাকে চড় মারতে আর নয়তো অপমান করতে। 

নিন এই নিন বলে মুখটা এগিয়ে দিল। 


মেঘের মুখে বেশামাল কথা আর মুখের গন্ধ শুকে সৈকত বুঝলো মেঘ নিশ্চয়  -----


কি হলো নিন মারুন বলে সৈকতের কাছে টলমল পায়ে আর একটু এগিয়ে আসলো মেঘ। 


সৈকত দেখলো মেঘের হাতে তার সকালে টেবিলের উপর রাখা সেই হুইস্কির বোতল। মেঘ  বোতল  থেকে অনেক টাই তরল এরই মধ্যে খেয়ে ফেলেছে । 


মেঘ সামনা সামনি আসতেই সৈকত দেখলো মেঘের দুগালে তার হাতের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে। 

রাগের মাথায় সৈকত তখন শরীরের সব শক্তি দিয়েই চড় দুটো মেরেছিল। 

—কি হলো মারুন। 

—সরি। 

—আরে মিঃচৌধুরী আপনি কেন সরি বলছেন। সরি তো আমার আপনাকে বলা উচিত। আমি শুধু শুধু আপনার ঘাড়ে বোঝার মত চেপে বসে আছি। আপনি আমাকে এত দুর দুর করছেন আর আমি ততো বেহায়ার মত আপনার পিছু নিচ্ছি।


 

—শান্ত হও মেঘ। চলো রুমে চলো।

—আমি যাবো না। আপনি চলে যান। 

—এখানে থাকলে তোমার ঠান্ডা লেগে শরীর খারাপ হবে। 

বলে সৈকত মেঘের দিকে এগিয়ে এসে ওর একহাত ধরলো। 


সৈকতের হাতের স্পর্শ পাওয়ার সাথে সাথে মেঘ এক ঝটকা মেরে হাতটা সরিয়ে নিল।

—এক দম আমাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করবেন না। দেখছেন না এতোটা অপমান করছেন,এতো ইগনোর করছেন তারপরও আমি আপনার আশে পাশে বেহায়ার মত ঘুর ঘুর করছি। আর এখন যদি আপনি আমাকে স্পর্শ করেন তাহলে হয়তো আমি আর নিজেকে ধরেই রাখতে পারবো না। 

—কেন পাগলামি করছো মেঘ?


—পাগলামি !!?

হা হা হা। 

হা সত্যি বলেছেন ,পাগলামি । 

এর থেকে আর কোন ভাল নাম দেওয়া যায় না এটার।  

আমি আপনাকে আমার সব টা দিয়ে ভালবাসি আর সেটা প্রকাশ করা যদি পাগলামি হয় তাহলে তাই। 

আমার ভিতর বাইরে সব খানে শুধু আপনার বসবাস । 

আর এটা যদি আপনাকে জানানো পাগলামি  হয় তাহলে তাই। 

আপনার একটু ভালবাসা পাবার জন্য আমার এ মনটা সারাক্ষন ব্যাকুল হয়ে থাকে। 

মনের ব্যাকুলতা প্রকাশ করা যদি পাগলামি হয় তাহলে তাই। 

মানুষের ঠান্ডা লাগলে হয়তো সাময়িক সময়ের জন্য শরীর খারাপ হয় । 

আর মন!!?

আপনি আমার শরীরের কথা ভাবছেন!!অথচ এ কয়দিনে একটা বারের জন্য ভাবলেন না যে আপনার দেওয়া কষ্টগুলো আমার বুকের ভিতরে কিভাবে সমান তালে এফোড় ওফোড় করে দিচ্ছে। প্রতিনিয়ত নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধ করে মন টাকে শাত্বনা 

দিচ্ছি আর ভাল থাকার অভিনয় করে যাচ্ছি। 


সৈকত বুঝতে পারছে হুইস্কি পেটে পড়ায় মেঘের মুখ দিয়ে এখন তার মনের মধ্যে এতদিনের জমানো  সব কথা বেরিয়ে আসছে। 


সৈকত আর বাধা দেয় না। সব চুপচাপ শুনতে থাকে। 


মেঘ এগিয়ে এসে সৈকতের শার্টের কলার টা টেনে ধরে বলেঃ

—আমি কি এতটাই খারাপ দেখতে যে আপনি আমার দিকে এক বারের জন্যেও ফিরে তাকান না??

নাকি অন্যে কোন মেয়ের সাথে এ্যাফেয়ার আছে??


—আমার ওসব বাজে আসক্তি নেই। 


আমি সত্যিটা জানতে চাই মিঃচৌধুরী। 

যদি সেরকম কিছু হয়ে থাকে তাহলে আমি চলে যাবো আপনার জীবন থেকে। 


—এসব তুমি কি বলছো মেঘ?


—হা হা হা ভয় নেই।

সত্যি বলছি  আমি আপনার বাবাকে কিছু বলবো না। ইভেন আমার পরে পৃথিবীর তৃতীয় কোন ব্যক্তিও এ কথা জানবে না ।  

আপনি আমাকে ভরসা করতে পারেন। 


মেঘ মুখ দিয়ে কথা গুলো বলছে ঠিকই।  কিন্তু কথা গুলো বলতে ওর বুকের মধ্যে যে কষ্ট হচ্ছে সেটা যদি সৈকত একটু ও বুঝতে পারতো, তাহলে এতক্ষনে বুকে জড়িয়ে ঠিক শান্ত করার চেষ্টা করতো। 


সৈকত কোন কথা না বলে মেঘের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। 

মেঘের চোখ বেয়ে অঝরে পানি ঝরে পড়ছে। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। 


মেঘ যখন দেখল সৈকত এত কিছুর পরও কথা বলছে না।  তখন সৈকতের শার্টের কলার টা ছেড়ে দিয়ে নিচে হাটুগেড়ে বসে পড়লো। 

হাতের বোতলের দিকে তাকিয়ে কি ভেবে আবার বোতল টা মুখের কাছে নিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে নিল। 


সৈকত তাড়াতাড়ি করে মেঘের হাত থেকে বোতল টা কেড়ে নিয়ে দূরে ছুড়ে ফেললো। 


—কেন ফেললেন আপনি ওটা?আমি খাবো । আমি, আমি সব খাবো। 


—না, তুমি খাবে না ওসব। তোমার ওসব খাওয়ার অভ্যাস নেই। একসাথে এতোটা খেলে সামলাতে পারবে না। 


—এই ছাড়ুন তো এসব কথা। কে আপনি!??আমাকে নিষেধ করার কোন অধিকার আপনার নেই। যান, চলে যান এখান থেকে। আমাকে একা থাকতে দিন। 


—আমি কে, সেটা এতো তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে!!?আর তোমাকে নিষেধ করার অধিকার আমার আছে। সেই অধিকার তুমি আমাকে দিয়েছ। আর সেই অধিকার থেকেই আমি তোমাকে নিষেধ করছি। 


—কি বললেন আপনি?অধিকার!!?

আধিকার কাকে বলে আপনি তা জানেন??আপনি কি সত্যিই বোঝেন অধিকার কাকে বলে!!?যদি বুঝতেন তাহলে আজ আমি আপনার একটু ভালবাসা পাওয়ার জন্য এমন ভিখারির মত পড়ে থাকতাম না। যদি বুঝতেন অধিকার কাকে বলে তাহলে আপনার বুকের সবটা জুড়ে শূুধু আমি থাকতাম। ঠিক আপনি যেমনটা আমার সবটা জুড়ে আছেন। 

আপনি তো শুধু খাতা কলমের অধিকারের কথা বলছেন।  

আর আমি বলছি অন্যে অধিকারের কথা। 

মানুষকে ভালবেসে তার উপর অধিকার 

ফলাতে হয় । কখনও কারোর উপর জোর করে ,কাগজ কলম, বা সমাজের দোহায় দিয়ে অধিকার ফলানো যায় না। 


সৈকত ও মেঘের সামনে বসে । সৈকত ওর দু হাত দিয়ে মেঘের মুখটা উঁচু করে বলেঃ

—মেঘ আমার দিকে তাকাও। আমার চোখের দিকে তাকাও। 


মেঘ সৈকতের হাতটা সরিয়ে দিয়ে শান্ত কন্ঠে বলেঃ

—আপনি কখনো শক্ত জমাট বরফের টুকরো কে ফ্রিজ থেকে বের করে রেখেছেন???


—হ্যা কেন!!?


—আমার মনের অবস্থা ঠিক এখন ঐ শক্ত বরফটার মত।  ভিতরে ভিতরে নিজেকে যতোটা শক্ত করছি আপনার ঐ চোখের দিকে তাকালে আমি বাইরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখা বরফের টুকরোর মতো গলে যাবো। 

নিজেকে হাজার চেষ্টা করেও শক্ত রাখতে পারবো না। 

তাই আপনার যা বলার আপনি বলুন । আজ আমি সব শুনতে প্রস্তুত আছি। 


—আচ্ছা এখন এসব থাক । আমি কথা গুলো তোমাকে অন্যে দিন বলবো।  


—না আপনি আজই বলবেন আর তা এক্ষনি। 


—আজ তুমি স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। তাই কথা গুলো আজ বলবো না।

 

চলো রুমে চলো বলে সৈকত উঠে দাড়ায়। 


—আমি যাবো না । আপনি যান। 


—রাত অনেক হয়েছে। আর এখানে একা থাকা ঠিক হবে না, চলো আমার সাথে বলে জোর করে মেঘের ডান হাত ধরে টেনে তোলে সৈকত। 


হুইস্কি পেটে যাওয়ার পর থেকে মেঘের পেটের ভিতর কেমন যেন অন্যে রকম বিক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। বমি বমি আসছে কিন্তু বমি হচ্ছে না। মেঘের কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে। 


সৈকত সেটা বুঝতে পেরে মেঘ কে দাড় করিয়ে পেছন থেকে কোমর ধরে মাথা টা নিচু করে দুই তিনবার ঝাঁকুনি দিতেই মেঘ একটা কাশি দিয়েই হড়হড় করে সব পানি উগরে দিল। 


মেঘের মনে হচ্ছে তার মাথাটা কেমন যেন শূন্য হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীটা দুলছে। শরীরে আর শক্তি নেই। 


সৈকত মেঘ কে শক্ত করে ধরে বললোঃ

—এখন কেমন লাগছে?

—ভাল।  কিন্তু আপনি কি করে বুঝলেন যে আমার ----

—কারণ আমি এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ । 


মেঘ আগের থেকে স্বস্তি পাচ্ছে ঠিক কিন্তু হুইস্কির রেস পুরোটাই রয়ে গেছে। 

হুইষ্কি পেটে পড়লে অনেক সময় লাগে তার রেস কাটতে। 

হঠাৎ মেঘ বললোঃ

—আর ভালবাসার বিষয়ে??

—-------------------


মেঘ টলমল পায়ে একটু দূরে গিয়ে চিৎকার  করে  বললোঃ

—আমি আপনাকে ভালবাসি । আমার সব অনু-পরমানু দিয়ে আপনাকে ভালবাসি। 


সৈকত কাছে গিয়ে নিজের কোর্ট টা খুলে মেঘের গায়ে উপর দিয়ে মেঘকে কোলে তুলে নেই। 


মেঘ কিছু বুঝে উঠতে পারে না। কেমন যেন ঘোরের ভিতের থেকে নিজের দুহাত দিয়ে সৈকতের গলা জড়িয়ে ধরে সৈকতের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। 

এতক্ষন হুইস্কি খেয়েও যে নেশার মধ্যে মেঘ ডোবে নি, সৈকতের চোখের দিকে তাকিয়ে যেন আরো বেশী নেশায় আকৃষ্ট হয়ে পড়ছে। 


সৈকত ও তাকিয়ে আছে মেঘের চোখের দিকে। 

মেঘ কে কোলে করে নিয়ে সৈকত রুমের দিকে পা বাড়াল। 

মেঘ কোন এক সম্মোহিনীতে ডুবে আছে। মুখ দিয়ে তার একটা কথাও বের হচ্ছে না। 

প্রিয় মানুষের স্পর্শে কেমন যেন মাতাল হয়ে যাচ্ছে। 


সৈকত  রুমে ঢুকে মেঘ কে ফ্লোরে দাড় করিয়ে  দরজা লক করে দিয়ে মেঘের লাগেজ থেকে অন্যে একটা শাড়ি বের করে মেঘের দিকে এগিয়ে দেয়। 

—কি করবো আমি এটা?


—চেন্জ করো। বমি লেগে আছে। 


—আমি শাড়ী পরতে পারি না।  অন্যে কোন ড্রেস দিন।

 

—না, তুমি এখন শাড়ি পরবে বলে নিজে এগিয়ে এসে পরা শাড়িটা খুলে একটু একটু করে অন্যে শাড়িটা পরিয়ে দেয়।  


সৈকতের স্পর্শে মেঘের শরীরে বিদ্যুতের তরঙ্গ বইতে শুরু করলো।  


শাড়িটা  পরানো শেষ করে সৈকত মেঘের কাছে এসে আলতো করে বাম হাত দিয়ে মেঘের খোপাটা খুলে দেয় । 


মেঘের সমস্ত শরীর কেন জানি কেপে ওঠে। 

সৈকত আস্তে আস্তুে মেঘের কোমরে হাত দিয়ে মেঘ কে আরো নিজের কাছে টেনে আনে। 

মেঘ অনুভব করছে ওর হার্টবিট বেড়ে গেছে । 

মনে হচ্ছে এক্ষনি বোধহয় ও ঙ্গান হারাবে। 


ঙ্গান হারাবার আগেই মেঘ বুঝতে পারলো সৈকতের  গরম নিশ্বাস তাকে পুড়িয়ে দিচ্ছে। আর নিজের ঠোঁট অন্যের দখলে চলে গেছে-----------


১৩.


সকালে মেঘের ঘুম ভেঙ্গে তাকিয়ে দেখে ও সৈকতের বাম হাতে শুয়ে আছে । আর সৈকত তার ডান হাতটা দিয়ে তাকে জড়িয়ে রেখেছে। 


রাতের নিজের পাগলামির কথা মনে করে  নিজ মনে হেসে ওঠে মেঘ। 

সবটা মনে নেই কিন্তু কিছু কিছু মনে আছে। আচ্ছা সবার কি এমন হয় এ্যালকোহাল খেলে ??নাকি প্রথম খেয়ে ছিলাম তাই নিজের ব্যালেন্স ঠিক রাখতে পারিনি। 

কি কি বলেছি তা কিছুই তো মনে পড়ছে না। 


মেঘ সৈকতের ঠোঁটে একটা চুমু দিয়ে আলতো করে  নিজের বাম হাত টা মুখে  বুলিয়ে দেয় ।  

কি শান্ত ভাবে ঘুমিয়ে আছে সৈকত!!

ওর ঘুমন্ত মুখটা দেখলেই কেমন যেন ভালবাসতে ইচ্ছা করে । 

এই শীতেও সৈকতের ঠোঁটের উপর একটু একটু ঘাম জমে আছে। অনেকের মুখে শুনেছি যে পুরুষদের ঠোঁটের উপরে ঘাম হয় তাদের বউ তাদের অনেক ভালবাসে । 


আমিও সৈকতকে অনেক ভালবাসি কিন্তু ও নিজ থেকে কেন সেটা উপলব্ধি করতে পারে না। 

কেন বুঝতে চাইনা যে এ কয়দিনে ওকে কেন্দ্র করে আমি আমার জগৎ গড়ে ফেলেছি। ওকে ছাড়া যে আমার একটা মুহূর্ত ও চলে না। 

কি করে বোঝাবো যে ও আমার ভালবাসার একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু । 


হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো ।  

—ম্যাডাম চা নিয়ে এসেছি। 

মতি চাচার মেয়ের কন্ঠ । 

মেঘ মনে মনে বিরক্ত হলো । চা আনার আর সময় পেলি না। চিৎকার করে বলতেও পারছেনা যে এখন চা খাবো না। 

চিৎকার শুনে যদি সৈকতের ঘুম ভেঙ্গে যায় এ ভয়ে । 

কি সুন্দর করে বরটা আমাকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে আর এখন----

ধুর । 

আস্তে করে সৈকতের ডান হাতটা সরিয়ে মেঘ উঠে কাপড় ঠিক করে দরজা খুলে । 


মেয়েটা মেঘলার মুখের দিকে একটু সময় নিয়ে তাকিয়ে থেকে বললোঃ

—ম্যাডাম চা। 

—এখন খাবো না। তুই নিয়ে যা----

—সকালের খাবার কি রান্না হবে ?

মেঘ একটু ভেবে সৈকতের পচ্ছন্দের মেনু গুলো বলে রান্না করতে। 

—আচ্ছা বলে মেয়েটা মুখ চেপে হাসতে হাসতে চলে যায়। 


মেঘ মেয়ের শেষ রহস্যময় হাসিটা বুঝতে পারে না। 

দরজা আটকে বেডের কাছে গিয়ে সৈকতের কপালে আলতোভাবে  একটা চুমু খায় । 

আর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলেঃ

আই লাভ ইউ। আই লাভ উই মোর দ্যান আই ক্যান সে। 


মেঘ ফ্রেশ হওয়ার সময় আয়নায় চোখ পড়তেই নিজেই লজ্জা পায় । 

ঠোঁটের লিপস্টিক এবড়ো থেবড়ো হয়ে আছে। চোখের কাজল ও চোখের নীচে লেপ্টে আছে।  

চুল গুলো পাগলিদের মত এলোমেলো হয়ে গেছে। 

নিজেকে আয়নায় দেখে এবার বুঝতে পারলো কেন তখন ঐ মেয়ে টা ওভাবে হেসে ছিল। 


মেঘ গোসল করে বের হয়ে দেখে সৈকত তখনও ঘুমাচ্ছে।  

তোয়ালে দিয়ে চুল মোছার সময় মেঘের মাথায় একটু দুষ্টু বুদ্ধি খেলে। 

মেঘ এগিয়ে গিয়ে নিজের ভেজা চুল বুলিয়ে দিতেই

 

—এই কি করছো(রেগে)


মেঘ একটু হেসে পিছন সরে আসে

মেঘ আবার এগিয়ে গিয়ে ভেজা চুলের স্পর্শ দিতেই 

সৈকত তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে বলে 


—এই তোমার সমস্যা কি?তোমার জন্য কি শান্তিতে একটু ঘুমাতেও পারবো না???

সৈকতের কন্ঠ শুনেই মেঘের হাসিখুশি মুখটা মুহূর্তের মধ্যে মলিন হয়ে যায় । 

মনে মনে কি ভাবলো, আর কি হলো!!?


মেঘ আস্তে করে বলে সরি। 

—কিসের সরি??তোমাদের মেয়েদের এই কথায় কথায় সরি বলা আমার একদম পচ্ছন্দ না। সব কিছুতেই ন্যাকামি । 


—আপনি এভাবে কেন বলছেন??


—তো কি বলবো!??তুমি তো জীবন টাকে সিনেমা মনে করো। এই জন্য সবসময় মাথার মধ্য শুধু রোমান্টিক চিন্তা ভাবনা । 

এই যাও তো এখান থেকে। বলে কোম্বল টা নিয়ে অন্যদিক ফিরে শুইয়ে পড়লো। 


আচ্ছা আমি এমন কি করলাম যার জন্য উনি এমন ভাবে রিএ্যাক্ট করলেন!!?

নিজের স্বামি কে ভালবেসে এতটুকু দুষ্টামি করার অধিকার ও কি আমার নেই!!?

এসব ভাবতে ভাবতে কোন রকম একটু সাজগোজ করে মেঘ রুম থেকে বের হয়ে বাগানে হাটতে থাকে। 


কিছুক্ষন পর ঝিনুক আর মিতু দৌড়ে আসে । 

—কি হয়েছে ?

—ভাবি একটা খারাপ খবর আছে। 

—কি হয়েছে!!?

—অনির সিড়ি থেকে পড়ে পা ভেঙ্গে গেছে। 

—কি বলছো তুমি!!?কখন হয়েছে এমন?

—গত কাল সন্ধ্যায় । 


আচ্ছা বেশি চিন্তা করো না । আমরা আজই ঢাকাই ফিরবো। 


তোমার ফোনটা দাও । আমার ফোনটা রুমে রেখে চলে এসেছি। 


রাতে ঘন কুয়াশার জন্য এখানে সিগন্যাল পাওয়া যায় না। 


সকালে একটু সিগন্যাল পাওয়া যায়। 

মেঘ ফোনটা হাতে নিয়ে একটু সামনে এগিয়ে রোজির নম্বরে ফোন দেয়। 

একবার রিং বাজতেই ফোনটা রিসিভ করে রোজি। 


একটু কথা বলে মেঘ ফোন টা রেখে দেয়। 

—কি বললো ভাবি?

—শুধু পা না। মাথায় ও চোট লেগেছে। অনেক রক্তক্ষরন হয়েছে। এখন ক্লিনিকে আছে।  

তুমি এক কাজ করো । 

—কি?

তোমার ভাইয়া কে ঘুম থেকে ডেকে তোল। 

আমি এদের সকালের খাবার দিতে বলি। তারপর সব  গুছিয়ে আমরা বেরিয়ে যাব।  

—আচ্ছা। 


————**——**——**————


মেঘ দের ঢাকা পৌছাতে বেশি সময় লাগলো না। এয়ারপোর্ট যেয়ে শুধু টিকিট পাওয়ার যতটুকু সময় নষ্ট হলো। 

এক সাথে চারটা সিট পাওয়া কষ্টকর হলেও মেঘের শ্বশুরের নাম শোনামাত্র টিকিট হাজির হয়ে গেল। 


সবাই এয়ারপোর্ট থেকে সোজা ক্লিনিকে ছুটে গেল। 

কেবিনে ঢুকতেই রোজি মেঘ কে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলো। 

মেঘ রোজিকে কোন রকম শান্ত করে অনির কাছে গেল। 

দুষ্ট টা শুইয়ে শুইয়ে ফোনে গেমস খেলছে। 

দেখে মনে হচ্ছে কিছুই হয়নি ওর । 


মেঘ কে দেখেই খুশি হয়ে বললো ছোট মা তুমি এসেছ??

মেঘ কাছে গিয়ে অনির মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। 


জানো ছোটমা তোমাকে অনেক মিস করেছি। 

মেঘ মুচকি হেসে বললো আমিও আমার ছোট্ট বাবাই কে খুব মিস করেছি। 


সৈকত আর ঝিনুক কাছে এসে অনির সঙ্গে একটু কথা বলে রোজির কাছে জিঙ্গাসা করলো কিভাবে কি হলো?


—উপর থেকে দৌড়ে সিড়িঁ দিয়ে নামতে গিয়ে এ অবস্থা। ডাক্তার বলেছে এক সপ্তাহ পর বাসায় নিয়ে যেতে। কিন্তু পুরো একমাস বেড রেস্ট নিতে হবে। 


কিছুক্ষন পর রোজি সবাইকে বাসায় গিয়ে রেস্ট করতে বললো। 


হঠাৎ অনি বললো না,ছোট মা কোথাও যাবে না। আমার কাছে থাকবে। 

রোজি এসে অনিকে বোঝাচ্ছে কিন্তু অনির একই কথা। 

অবশেষে মেঘ নিজেই বললো সমস্যা নেই ভাবি।আমি আজ থেকে যায় এখানে। 


ওরা বরং বাসায় চলে যাক। 


মেঘ কথা গুলো বলে সৈকতের দিকে তাকাল কিছু বলে কিনা সেটা দেখার আশায় । 

কিন্তু সৈকত কিছুই বললো না। 

ঝিনুক কে সঙ্গে নিয়ে চলে গেল। 


মেঘ আশা করেছিল সৈকত হয়তো বলবে ঠিক আছে তুমি থাকো আমি বিকালে একবার আসবো। কিন্তু------


————**——**——**—————


আজ এক সপ্তাহ পরে আজ অনিকে নিয়ে বাসায় ফিরলো মেঘ। 

এই একসপ্তাহ অনি মেঘ কে একবারের জন্যেও বাসায় আসতে দেয় নি। 


এই এক সপ্তাহে সৈকত মাত্র দুদিন ক্লিনিকে গিয়ে অনির সাথে দেখা করে এসেছিল । তাও খুব অল্প সময়ের জন্য। 

মেঘের সাথে তেমন কথা হয় নি। জাস্ট ভাল মন্দ ছাড়া। 


বাসায় ফিরেই মেঘ ছুটে গিয়েছিল সৈকতের রুমে । কিন্তু সৈকত বাসায় নেই। 

মেঘ এ কদিন ক্লিনিকে থাকলেও ওর মনটা পড়েছিল সৈকতের কাছে। কি করছে? কি খাচ্ছে?ঠিকমত ঘুমাচ্ছে কি না!!?

এসব নিয়ে ভাবতো বেশি। 

বাসায় এসে ভেবেছিল প্রিয় মানুষটার মুখ দেখতে পাবে কিন্তু কাজের লোক বললো সৈকত নাকি দুদিন বাসায় আসে নি। 

সৈকত দুদিন ধরে বাসায় আসেনি শুনে মেঘের মনের ভিতরটা কেমন যেন শুন্য শুন্য অনুভব হলো। 

কোথায় গেল সৈকত তাহলে!!?


১৪.

মেঘ বিকালে ঝিনুক কে সঙ্গে নিয়ে শপিং এ যায় । 

ঝিনুকের জন্য আর নিজের কিছু কেনাকাটা করার জন্য। 

মেঘ মনে মনে ভাবে সৈকতের জন্য ও কিছু কেনার দরকার । কিন্তু কি কিনবে সেটা বুঝতে পারে না। 

অনেক ভেবেচিন্তে সৈকতের জন্য একটা মোবাইল,হাতঘড়ি আর একটা ডায়েরি নেয় মেঘ। 

জিনিস গুলো খুব সুন্দর করে নিজ হাতে মোড়কজাত করে । 


মনে মনে ভয় হয় এগুলো সৈকত পচ্ছন্দ করবে তো!!?

ও যেরকম মানুষ তাতে বোঝা মুশকিল কখন ভাল মুডে থাকে আর কখন মুড অফ থাকে। 

জিনিস গুলো দেখে কেমন রিএ্যাক্ট করবে কে যানে!??


—এত কি ভাবছো ভাবি??

—কই কিছু নাতো। 

—মিথ্যা বলছো তুমি ভাইয়ার কথা ভাবছিলে। 

—হু একটু। 

—তা কি ভাবছো?

—তোমার ভাইয়া এগুলো গ্রহণ করবে কিনা!!?তার পচ্ছন্দ হবে কিনা এগুলো । এইসব আরকি। 

—ওহ্। আরে ভেব না তোমার কেনা জিনিস ভাইয়া কখনো রিফিউজ করবে না। 


শপিং শেষ করে বের হতেই মেঘের মনে  হলো সৈকত একটা মেয়েকে সঙ্গে করে শপিংমলে প্রবেশ করলো। 


মেঘ দাড়িয়ে পিছন ফিরে এদিক ওদিক খোঁজে । 

—কি হলো ভাবি!!?দাঁড়িয়ে  পড়লে যে!!

—মনে হল তোমার ভাইয়া কে দেখলাম। 

—কি বলছো!!এখানে তুমি ভাইয়া কে কোথায় দেখলে?

—বিশ্বাস করো ঝিনুক আমি তোমার ভাইয়াকেই দেখেছি তার সাথে একজন কেউ ছিল।   

—কিন্তু এখানে এসময়ে ভাইয়া !!?

—তুমি দাড়াও আমি একটু ভিতরে যাচ্ছি। 

—আচ্ছা চলো আমিও দেখবো। 


দু’জনে মিলে অনেকক্ষন খোঁজা খুঁজি করে সৈকত কে আর কোথাও দেখতে না পেয়ে মেঘ আর ঝিনুক বাসার উদ্দেশ্য পা বাড়ায়। 


ঝিনুক বলে ভাবি তোমার নিশ্চয় কোথাও ভুল হয়েছে। 

মেঘ ও মনে মনে ওর দেখার ভূল মনে করে চুপ করে থাকে। 


রাতে সবার খাওয়া শেষ হলে মেঘ নঅ খেয়ে রুমে এসে সৈকতের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু মেঘ জানেনা সৈকত আজ আদৌ বাসায় আসবে কিনা??


 তারপর ও মেঘের মন বলছে আজ নিশ্চয় সৈকত বাসায় আসবে। 

মেঘ বেলকনিতে দাড়িয়ে বাইরের ঠান্ডা বাতাশে শরীর এলিয়ে দাড়িয়ে আছে। 

বাইরের বইয়ে যাওয়া ঠান্ডা হীম শীতল বাতাস মেঘ কে ছুঁয়ে যাচ্ছে আর মেঘ বার বার কেঁপে উঠছে। চোখ বন্ধ করে তার প্রিয় মানুষটার সেই প্রথম স্পর্শ করার অনুভূতিটা অনুভব করছে। 

মেঘের মনে এক অন্যরকম ভাললাগা কাজ করছে। সৈকতের কথা ভাবতেই মেঘের মন আর শরীর জুড়ে যেন অন্যরকম ভাললাগা কাজ করে। 


হঠাৎ বাসার সামনে গাড়ির হর্ণের শব্দে মেঘ চোখ খুলে তাকাই। সৈকত গাড়ি থেকে নামছে ড্রাইভিং সিটে একটা মেয়ে বসে হাত নাড়িয়ে সৈকত কে বিদায় জানাচ্ছে। সৈকত ও তার দিকে তাকিয়ে হাসি খুশি মুখে হাত নাড়াচ্ছে। 


এই দৃশ্য দেখে মেঘের মনের জগৎটা মুহূর্তে উলোট পালোট হয়ে গেল। তাহলে তার ধারণাই ঠিক ছিল। শপিংমলে তাহলে এই মেয়েটায় সঙ্গে সৈকত ছিল। 

আমার চোখ ভুল দেখেনি। 


মেঘের চোখ দিয়ে না চাইতে অঝোর ধারায় পানি ঝরতে শুরু করলো। 


সৈকতের পায়ের আওয়াজ সিঁড়িতে শুনতে পেয়ে মেঘ চোখ মুছে সব না জানার ভান করে রুমে এসে স্বাভাবিক ভাবে বসে একটা ম্যাগাজিনের পাতা উল্টাতে থাকে। 


সৈকত রুমে ঢুকে মেঘ কে দেখে হাসিমুখে বললোঃ

—তুমি!!?কখন আসছো??


মেঘ খুব স্বাভাবিক ভাবে বললো

—এমন ভাবে বলছেন মনে হচ্ছে আমি এ বাড়ির গেস্ট !!?

—আরে না তা কেন??তবে কথাটা কিন্তু ভূল বলোনি। 

—মানে!!?

—না ,কিছু না। 

—বলুন । 

—খেয়েছ??

—আপনি তো নিশ্চয় খেয়ে এসেছেন!?

—না । খাই নি। খাবার দিতে বলো খুব ক্ষুধা লাগছে। 

মেঘ অবশ্য মনে মনে একটু অবাক হলো। কারণ আজ সৈকত এত রাত অবধি বাইরে ছিল অথচো ড্রিংক করে নি। আবার বলছে ক্ষুধা লাগছে তারমানে বাইরে কিছু খায়নি। 


মেঘ আর কোন কথা না বাড়িয়ে বলে ঠিক আছে আপনি চেন্জ করে নিন আমি খাবার গরম করে দিচ্ছি।  

—তুমি না খেয়ে বসে আছো কেন?

—এমনি। 

—এটা ঠিক না। 

—আমার তো এটাই ঠিক মনে হয় । 

—আচ্ছা তুমি কাউকে বল গরম করে খাবার টা রুমে দিয়ে যেতে। 

—আমি নিজে করলে কি কোন অসুবিধা?

—এত কাজের মানুষ থাকতে তুমি কেন করবে??

—সেটা আপনি বুঝবেন না। নিজের ভালবাসার  মানুষের জন্য কিছু করতে পারাটা যে কত অনন্দের কত আত্মতৃপ্তির যে করে শুধু সেই বোঝে। 


সৈকত আর কিছু বলে না। 


মেঘ নীচে গিয়ে খাবার গরম করে এনে রুমে ঢোকে। 

সৈকত ততক্ষনে ড্রেস চেন্জ ফ্রেশ হয়ে বসে আছে। 

মেঘ খাবার দিয়ে চুপ চাপ বসে আছে। 

—কি হলো তুমি খাবে না?

—না,আপনি খেয়ে নিন। 

—এত অভিমান ভাল না। বলে সৈকত নিজে এগিয়ে এসে মেঘের মুখের সামনে খাবার তুলে ধরলো। 


মেঘের চোখে পানি টলমল করছে। সেটা খুশিতে না অন্য কারণে সেটা মেঘ নিজেও জানেনা। 


সৈকত মেঘের দিকে তাকিয়ে বললো কি হলো !?মুখ খোল। 


মেঘ মুচকি হেসে হা করে । 


সৈকত বলে আজ আমি তোমাকে কিছু কথা বলবো। মন দিয়ে কথা গুলো শুনবে। কোন প্রশ্ন করবেন না। 


মেঘ বুঝতে পারে না সৈকত তাকে কি বলতে চাইছে?তবে মনে মনে খুব ভয় হয় ওর শান্ত চেহারা দেখে। কারণ কোন বড় ধরনের  ঝড় উঠার আগে প্রকৃতি সাধারণত খুব শান্তশিষ্ট হয়ে যায়।  


১৫.


আমি বিয়েতে বিশ্বাস করি না। 

—মানে!!!

—মানে খুব সহজ। আমার এসব বিয়ে টিয়ে তে কোন বিশ্বাস হয় না। 


মেঘ বিস্মিত হয়ে সৈকতের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে । 

কি বলছে উনি!!?

তার নাকি বিয়ের  মত একটা পবিত্র বন্ধনে বিশ্বাস নেই। 

মেঘ একটু চুপ থেকে বলে আমি আপনার এই শক্ত কথা বুঝতে পারছি না। যদি ঘুরায় পেচায় না বলে একটু সহজ করে বলতেন তাহলে আমার জন্য বুঝতে সুবিধা হবে। 


এর মধ্য সৈকত খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে তোয়ালেতে হাত মুছতে মুছতে মেঘের সামনে এসে বসে। 


দেখ মেঘ আমি জানি তুমি খুব ভাল একটা মেয়ে । তুমি খুব সুন্দরী ও। তোমার সাথে এ কদিন থেকে বুঝেছি তোমার মত লক্ষী ও ভাল মেয়ে দ্বিতীয় হয় না। 

আমি তোমার আজ পর্যন্ত কোন খারাপ দোষ খুজে পাইনি। 

কিন্তু তারপরও কেন জানিনা আমি মন থেকে তোমাকে মেনে নিতে পারছি না। 


মেঘ সৈকতের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। 

মানুষটার চোখে কোন ছলনার চিহ্ন সে দেখছে না। তার কন্ঠে কোন জড়তাও কাজ করছে না। তাহলে কি সত্যি সে আমাকে একটুও ভালবাসে  না???


আর বিয়েতে বিশ্বাস নেই কারণ আমি আমার নিজের চোখে দেখেছি বিয়ে করে বার তেরো বছর সংসার করেও মানুষ সুখি থাকে না। সারাজীবন ভাল না থেকে শুধু অন্যেদের সামনে ভাল থাকার অভিনয় করে যায় । জীবনে সে কোন কিছুই পায় না। নিজের জীবনটাকে তিলে তিলে শেষ করে দেয় । 

লাস্ট পর্যায়ে যখন সে তার এ সংসারের বোঝা টানতে না পারে তখন হতাশ হয়ে নিজের জীবন থেকে অবশর নেই। 


—সবার সংসার জীবন টা যে এমন হবে সেটা আপনাকে কে বললো!!?

—সবার কথা বলছি না। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এরাকম টাই হয়ে থাকে। 

—আমি কি জানতে পারি আপনি কার কথা নিয়ে আমাকে এ কথা বলছেন??

—আমি অনেকের এরাকম হতে দেখেছি। ইভেন আমার মায়ের ক্ষেত্রে ও তাই ঘটেছিল। তখন বুঝতাম না কিন্তু সেটা বুঝি। 

—আপনার জানাতে তো কোন ভুল ও হতে পারে। যেটি আপনার কাছে সচ্ছ মনে হচ্ছে সেটা হয়তো ততোটাই অসচ্ছ কিন্তু আপনি বুঝতে পারছেন না।

—হয়তো ,হয়তো না। 

—আমি কি আপনার একথা গুলো আমাকে বলার পিছনের কারণটা জানতে পারি?


সৈকত উঠে দাড়িয়ে মেঘের হাতটা ধরে বেলকনিতে নিয়ে দাড়ায় । 

মেঘ বুঝতে পারছে না কি এমন কথা যার জন্যে সৈকত এমন করছে??তাহলে কি সৈকত ঐ মেয়েটাকে ভালবাসে  !!?

না ,এ আমি কি ভাবছি!!?

সৈকত তো সেদিন বলেছিল যে ওর নাকি মেয়ে মানুষের কোন বাজে আসক্তি নেই। 

আচ্ছা ভালবাসা আর আসক্তি কি দুটো এক জিনিস???

মনের মধ্যে হাজার প্রশ্নের ভীড়। 


তুমি আমার জীবন থেকে চলে যাও মেঘ। 


আচমকা সৈকতের কথায় ভাবনা জগত থেকে ছিটকে এসে বাস্তবে পড়ে মেঘ। 


কি বললো সৈকত??

আমি কি শুনলাম!!?


—আপনি কি বললেন!!?

—আমি বললাম তুমি আমার জীবন থেকে চলে যাও। 


 মেঘ বিশ্বাস করতে পারছে না। তার কান নিশ্চয় বার বার ভূল কথা শুনছে। 


মেঘের চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে।  

মেঘ সেটা বৃথা মুছে ফেলার চেষ্টা করছে না। 

কারণ জানে সেটা করেও কোন লাভ হবে না। চোখ যে এ মুহূর্তে তার কোন কথাই শুনবে না। 

—আমার দোষ টা কোথায়??

—তোমার কোন দোষ নেই মেঘ। ঐ যে প্রথমেই বললাম তুমি খুব ভাল কিন্তু তারপরও কেন জানি মন থেকে মানতে পারছি না। আর আমার মনে হয় সবটা জানার পর তুমি আমার কাছে থাকলে ভাল থাকতে পারবে না। 

না আমি তোমাকে কখনও মন থেকে মেনে নিতে পারবো। আর না তুমি ভাল থাকবে। 

তার থেকে বরং আমাদের আলাদা হওয়ায় ভাল। 


মেঘের চিৎকার  করে কান্না করতে ইচ্ছা করছে কিন্তু পারছে না।  

বুকের ভিতরটা যেন দুমড়ে মুচড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। 

মনে হচ্ছে কেউ তার বুকের মধ্যে বার বার ছুরি দিয়ে ক্ষত বিক্ষত করে চলেছে। 


মেঘ চোখের পানি মুছে নিয়ে সৈকতের হাত ধরে রুমে নিয়ে বলেঃ

—আমার জন্য আপনার মনের মধ্য যদি সত্যি কারে কোন ভালবাসা না থাকে তাহলে কেন সেদিন রাতে আমাকে স্পর্শ করেছিলেন??কেন আপনার ভালবাসা দিয়ে আমার অপূর্ণ ভালবাসার পূর্নতা দিয়েছিলেন!!?কেন সেদিন আপনার ভালবাসার শত রঙে আমাকে রঞ্জিত করেছিলেন??

কেন আপনার বুকে আমাকে জায়গা দিয়েছিলেন??


সৈকত কোন কথা বলতে পারে না। চুপ করে মেঘের বলা কথা গুলো শুনতে থাকে। 


—কি হলো চুপ হয়ে আছেন যে ? আমার কথার উত্তর দিন। 

—তোমার প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। তবে এটুকু বলবো সেদিন যা আমাদের মধ্যে হয়েছে সব ঝোঁকের মাথায় । সেদিন তুমি অনেক বেশামাল অবস্থায় ছিলে । আর ---

— থামলেন কেন বলুন। আর -----কি??


—---------

—জানি এর উত্তর আপনি দিতে পারবেন না।  আমি না হয় সেদিন প্রথম ড্রিংক করে একটু বেশামাল হয়ে গিয়ে ছিলাম। কিন্তু আপনি তো ঠিকিই ছিলেন। তাহলে কেন মিঃচৌধুরী!??


সৈকত অনেকক্ষন চুপ থেকে বলে যা হয়েছে তার জন্য আমি সরি বলছি। ওসব ভুলে যাও। 


—ভুলে যাবো!!?সত্যি কি সেটা সম্ভব মিঃচৌধুরী। আপনার কাছে হয়তো এটা ভুলে যাওয়া বড় কোন সমস্যা না। কিন্তু এই দিন ঐ রাত টা আমার জীবনে অনেক কিছু । সব কিছু চাইলেই মুহূর্তে ভুলে যাওয়া যায় না। 


—আমি জানি মেঘ। 

—না আপনি কিছুই জানেন না। জানলে আপনি আমার জীবন টা নিয়ে এভাবে খেলতে পারতেন না।আচ্ছা একটা মুহূর্তের জন্য হলেও মেনে নিচ্ছি যে আপনি আমাকে মন থেকে মানতে পারছেন না। ভালবাসেন না। তাহলে আমি যেদিন বেলকনিতে পড়ে ছিলাম আপনি কেন আমাকে তুলে এনে ছিলেন??কেন আমাকে বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন??কেন আমার সুস্থতার জন্য সেবা যত্ন করে ছিলেন। আর কেনই বা রাত দিন ক্লিনিকে পড়ে ছিলেন???


—তুমি কেন বুঝতেছ না যে ওগুলো আমি ভালবাসা থেকে করি নি। 

—তাহলে কি ??দায় বদ্ধতা থেকে??

—বলতে পারো। 

—মানে!!?

—কারণ সেদিন তুমি আমার জন্য অসুস্থ হয়ে পড়ে ছিলে । 

—হা হা হা। তালিয়া মিঃচৌধুরী মানবতা দেখানোর জন্য। 

 মানবতার  কাছে আজ ভালবাসা পরাজিত হলো। 

—ভুল বুঝনা মেঘ। আমি যা বলছি তোমার ভালোর জন্যই বলছি। 

—ভালো!!?থাক মিঃচৌধুরী আমার জন্য অনেক করেছেন এখন আর নাইবা করলেন। এখন আমাকে না হয় আপনার জন্য কিছু করার সুযোগ করে দিন। 

—কি করবে তুমি??

—আপনি বলুন আমি আপনার জন্যে কি করতে পারি??আপনি যা বলবেন আমি তাই করবো। 

—তুমি বাড়ি চলে যাও তোমার লেখাপড়া শুরু করো । আমি চাই তুমি তোমার লক্ষ্যে পৌঁছাও। এর জন্য যে যে হেল্প দরকার সবটা আমি করবো। 

—করুনা দেখাচ্ছেন??আমি কারো করুণার পাত্রী হতে চাই না। 

—এটা করুণা না। এটা আমার কর্তব্য । আমার জন্যে তোমার জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেল। এখন সেটা সাজিয়ে গুছিয়ে দেওয়া আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। 

—আমার ভাল না হয় আমাকে বুঝতে দিন। তবে আমি যাওয়ার সময় বাবা কে  কি বলবো??

—কিছু বলার দরকার নেই। তুমি চলে যাওয়ার পর আমি সব ম্যানেজ করে নিব। 

—ঠিক আছে তবে আমাকে কয়েকদিন সময় দিন। 

—কেন??

—ভয় নেই মিঃচৌধুরী আমি আর আগের মত বেশামাল হবো না। আর কোন অধিকার নিয়ে আপনার কাছে আসবো না। তবে আমার  একটা অনুরোধ আছে আপনার কাছে। 

—কি অনুরোধ?

—আমি যে কয়দিন  এবাড়িতে আছি আপনি একটু বাবার সব কথা মেনে চলুন। আমি চলে যাওয়ার পর না হয় আবার নিজের মত করে চলবেন। 


সৈকত মেঘের চোখের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষন কি যেন ভেবে বলেঃ

—ঠিক আছে । আমি যতটুকু পারি চেষ্টা করবো। 

—ধন্যবাদ । 


মেঘ বিছানার উপর থেকে বালিশ আর একটা চাদর নিয়ে ফ্লোরে বিছানা করে । 


ওখানে কি করছো??

—ভাববেন না। আমার অভ্যাস আছে। 

—এই শীতে ওখানে ঘুমালে তোমার ঠান্ডা লাগবে তুমি বরং উপরে শোও। আমি সোফায় এডজাস্ট করে নিব। 

—থাক আমার জন্য আর কষ্ট করতে হবে না। 

—আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে আরেক টা কাজ করা যাক। 

—কি?


সৈকত বিছানার মাঝে লম্বা লম্বি একটা বালিশ দিয়ে বলে এপাশ টাতে আমি আর ওপাশে তুমি থাকবে। 


(চলবে)

Comments