অভিমানী ভালবাসা পর্ব ৩
গল্পঃ #অভিমানী_ভালবাসা
লেখাঃ সাবেরা সুলতানা রশিদ
#পর্ব৩
সৈকত অনবরত থামতে বলেও যখন দেখছে কাজ হচ্ছে না তখন সামনে এসে সৈকত স্প্রে করা পাইপ টা ধরে টান দিতেই স্নিগ্ধার পা পিছলে যায়। স্নিগ্ধা ভয়ে চিৎকার করতেই একজোড়া হাত এসে স্নিগ্ধাকে ধরে ফেলে। ওদিকে পানির স্প্রে পাইপটা হাত থেকে উপরের দিকে মুখ করে পড়ে থাকে। তাতে দুজনেই ভিজে যায় বৃষ্টির মতো করে।
স্নিগ্ধা অবাক দৃষ্টিতে সৈকতের দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থায় হঠাৎ, স্নিগ্ধার মুখে থাকা চুইংগাম থেকে বাবলটা বলের মতো ফুলে আবার টুস করে ফেটে যায়। কিন্তু সেদিকে কারো খেয়াল নেই।
সৈকত আর স্নিগ্ধা দুজনেই যেন কোন এক অজানা সম্মোহনীতে ডুবে যায়। দুজনের চোখের গভীরে বলা হয়ে যায় যেন শত বছরের জমানো কথা।
হঠাৎ কারো কাশির শব্দে যেন সৈকতের হুশ ফেরে।আর স্নিগ্ধা তাড়াতাড়ি করে সৈকতের বাহু থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। সৈকত স্নিগ্ধার জোরাজুরিতে স্নিগ্ধার মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের বাহুর বেষ্টনী টা আস্তে করে আগলা করে দেয়।
আর ওদিকে সৈকতের বাহু বেষ্টনী আগলা হতেই স্নিগ্ধা টুপ করে পড়ে যায়। স্নিগ্ধা কোমরে হাত দিয়ে ও মাগো মরে গেলাম গো বলেই চেচিয়ে ওঠে।
সৈকত দেখে রিহান দাঁড়িয়ে আছে তার দিকে অবাক দৃষ্টি নিয়ে।
আর রিহানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা(নয়না,,স্নিগ্ধার একমাত্র বেস্টু + বোন) তাড়াতাড়ি করে স্নিগ্ধার কাছে গিয়ে স্নিগ্ধাকে নিচ থেকে টেনে তুলতে সাহায্যে করে।
রিহান সৈকতের কাছে এসে বলে কিরেএএ এসব কি করে হলো??
এসব করতেই কি তুই একা চলে এলি??
সৈকত রেগে বলে হ্যাঁ বাসায় তো পানি নাই তাই ভাবলাম এখানে আজ শাওয়ার টা সেরে যায়।
স্নিগ্ধা আর নয়না রিহানের পাশে এসে দাঁড়ায়।রিহান বলে স্নিগ্ধা আমি সত্যিই দুঃখিত আসলে আমার ওকে একা আসতে দেওয়া উচিত হয়নি আমারও সাথে আসা উচিৎ ছিলো।
স্নিগ্ধা বলে ইটস ওকে।
রিহান বলে তোমাদের পরিচয় করিয়ে দিই।
স্নিগ্ধার পাশ থেকে নয়না খুব আনন্দ আর উচ্ছলতার সাথেই বলে ওঠে উনাকে তো আমি চিনি।স্নিগ্ধা একটু অবাক আর জিজ্ঞাসার দৃষ্টি নিয়ে নয়নার দিকে তাকায়।
নয়না বলে তুই চিনলি না উনাকে??
স্নিগ্ধা না বোধক ঘাড় নাড়তেই, নয়না হাতের ইশারা করে কিছু দেখার ইঙ্গিত করে।নয়না হাত বরাবর তাকিয়ে স্নিগ্ধা আবার সৈকতের দিকে তাকায়।স্নিগ্ধা চোখের চশমাটা খুলে চোখ কচলে আবার চশমা পরে সৈকতের দিকে তাকায় আরেকবার রাস্তা বরাবর বড় বিলবোর্ড টার দিকে তাকায়।স্নিগ্ধার যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না, যে বিলবোর্ডের ওই গ্রান্ড এম্বাসিডর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
স্নিগ্ধা কি বলবে বুঝে উঠতে পারেনা।
রিহান ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলে ও শুধু চৌধুরী গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির গ্রান্ড এম্বাসিডর নয়, সাথে চৌধুরী গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির এখন একমাত্র সত্ত্বাধিকারী।
স্নিগ্ধা বলে তার মানে আগের দিন যে আঙ্কেল আমাদের বাসায় এসেছিলো ইনি তার ছেলে।
রিহান বলে হ্যা উনি আরমান চৌধুরীর একমাত্র ছেলে সৈকত চৌধুরী।
স্নিগ্ধা কিছুটা লজ্জিত হয়ে বলে আসলে আমি উনাকে চিনতে পারিনি, তাছাড়া উনি হঠাৎ করে না বলেই এখানে চলে আসায় আমিও ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
রিহান বলে ঠিক আছে বুঝেছি,তা আপনার আম্মুকে কোথাও দেখতে পাচ্ছিনা কোথায় উনি?
স্নিগ্ধা বলে একটা জরুরী কাজে বাইরে গেছেন।হয়তো কিছুক্ষনের ভিতরে চলে আসবেন। আপনারা ভিতরে চলুন।
রিহান বলে না এখন আর বসবো না আর সৈকতের যে অবস্থা তাতে এভাবে আর কিছুক্ষন থাকলে নির্ঘাত ঠান্ডা লেগে যাবে তখন সমস্যা হবে।
স্নিগ্ধা বলে ওহ হো আমি সত্যিই দুঃখিত একটু অপেক্ষা করুন, বলেই নয়না কে বলে ভিতর থেকে একটা তোয়ালে সৈকতের জন্য এনে দিতে,কিন্তু নয়নার কোন সাড়া নেই,স্নিগ্ধা তাকিয়ে দেখে নয়না হা হয়ে সৈকতের দিকে তাকিয়ে আছে,,ঠোঁটের কোনে মিচকি হাসি লেগে আছে, মনে হচ্ছে যেন নয়নার মনের ভিতরে সৈকত কে দেখার পরে তার প্রিয় সেই লালা… লা.. লা..লালা
লালা……লা…লা…..লালা
টিউন টা বেজে চলছে আর আকাশের সাদা মেঘ গুলি তুলোর মতো করে উড়ে বেড়াচ্ছে….
স্নিগ্ধার কনুয়ের গুতা খেয়ে নয়না কল্পনা থেকে বাস্তবে এসে যেন আলপিনে ফুটো হয়ে যাওয়া গ্যাস বেলুনের মতো চুপসে যায়, তারপর তাড়াতাড়ি করে ভিতর থেকে একটা তোয়ালে এনে সৈকতের সামনে ধরে।
সৈকত বলে নো থ্যাংকস, আই এ্যাম ওকে,,
উপর উপর সৈকতের মুখ দিয়ে মধু ঝরলেও অন্তরে যেন বিষের বন্যা বয়ে চলেছে।আর মিন মিন করে বলছে( Only for 500 million taka, I came here, otherwise Soikot did not get legs in this slum)
রিহান নয়নার হাত থেকে তোয়ালে টা নিয়ে সৈকতের দিকে বাড়িয়ে দেয়,এই নে তাড়াতাড়ি মাথাটা মুছে নে, নইলে মাইগ্রেনের ব্যাথায় ভুগবি।
মনের ভিতরে রাগ আর আভিজাত্যের লড়াইয়ে সৈকত ভুলেই গিয়েছিল তার মাইগ্রেন প্রব্লেমের কথা।মাইগ্রেনের কথা মনে পড়তেই সৈকতের স্নিগ্ধার উপরে রাগ টা যেন আরোও বেড়ে যায়।
স্নিগ্ধা সৈকত কে বলে আপনি তাড়াতাড়ি ভিতরে চলুন আমি ব্যবস্থা করছি।
স্নিগ্ধা নিজের হাতে সৈকতের মাথার চুল গুলি হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে আস্তে আস্তে শুকানোর চেষ্টা করে।সৈকত আয়নার ভিতরে তাকিয়ে শুধু স্নিগ্ধাকে দেখেই যাচ্ছে।স্নিগ্ধার চোখ ও সৈকতের চোখের সাথে চোখাচোখি হতেই স্নিগ্ধা লজ্জায় লাল হয়ে যায়।
রিহান বলে আচ্ছা যে দরকারে এসেছি সেটাই তো বলা হলো না।
স্নিগ্ধা বলে কি দরকার বলুন।
রিহান কিছু বলতে যাওয়ার আগেই সৈকত বলে,আসলে আমি রিহানের মুখে শুনলাম যে আপনারা নাকি খুব ভালো মেকআপের কাজ করতে পারেন। তাই আপনার একটা ফেবার চাই।
নয়না সৈকতের কথা শুনে খুশিতে গদগদ হয়ে কন্ঠে আদুরে ভাব নিয়ে বলে কি করতে হবে বলুন আমি সব করতে রাজি আছি।
স্নিগ্ধা নয়নার ভাব দেখ আস্তে করে নয়নার হাতে চিমটি বসিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করে এতো বাড়া বাড়ি ভালো না,একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে।
নয়না স্নিগ্ধার চিমটি খেয়ে উহ করে উঠে,
রিহান বলে কোন সমস্যা??
স্নিগ্ধা বলে না, কোন সমস্যা না।
সৈকত বলে আসলে আমার বাসায় আগামীকাল একটা ফটোশুট আছে, আমি চাচ্ছিলাম আপনারা যদি মেক আপ আর্টিস্টের কাজ টা করে দিতেন তাহলে ভালো হতো।
স্নিগ্ধা বলে কিন্তু আমি কখনো আমার পার্লার ছাড়া বাইরে গিয়ে কাজ করিনা।আর ছেলেদের মেক আপ ও কখনো করিনি।
সৈকত বলে একটা জনপ্রিয় প্রবাদ আছে মিস স্নিগ্ধা, যে রাধতে জানে সে কিন্তু বাধতেও জানে।আরেকটাও প্রবাদ আছে “নাচতে না জানলে উঠান বাকা”।
এখন আপনি প্রমান করুন আপনার যোগ্যতা।আর হ্যা পেমেন্ট নিয়ে একদমই চিন্তা করবেন না। কাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথে আপনার একাউন্টে টাকা জমা হয়ে যাবে।
সৈকতের কথা শুনে স্নিগ্ধার একটু রাগ হয়, আর সে রাগি ভাবটা যেন চেহারায় ফুটে ওঠে।
সৈকত স্নিগ্ধার রাগি লুকটা বেশ এনজয় করে।
রিহান সৈকতের মতিগতি কিছুই বুঝতে পারেনা।শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
নয়না মনে মনে খুশিতে নাচতে শুরু করে।
সৈকত বলে তাহলে আজ আমরা আসি,আগামিকাল সকালে রেডি থাকবেন আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিবো।আর কাজটা না করতে চাইলে রাতের ভিতরে জানিয়ে দিবেন তাহলে অন্য ব্যবস্থা করবো।
স্নিগ্ধা কোন কথাই বলেনা।
নয়না বলে আপনি চিন্তা করবেন না আমরা ঠিক সময়ে চলে আসবো।
সৈকত বলে চল রিহান অনেক কাজ বাকী আছে।
রিহান আর সৈকত দুজনে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে আসে।কিছুদূর আসতেই বলে রিহান তুই দাড়া আমি আমার ফোনটা ভুল করে রেখে এসেছি।
রিহান বলে আমি গাড়িতে অপেক্ষা করছি।
এদিকে স্নিগ্ধা নয়নার এমন হ্যাংলামি দেখে মেজাজ চড়ে আছে।
স্নিগ্ধা রেগে নয়না কে বলে,এই তোর কি দরকার ছিলো বলার আমরা যাবো??
নয়না বলে দ্যাখ দোস্ত জীবনে সবসময় এমন সুযোগ আসে না। আজ একটা বড় সুযোগ আমাদের হাতে এসেছে এটা ছেড়ে দেয়া মোটেও উচিত হবে না।
স্নিগ্ধা বলে আমার কিন্তু অন্যরকম লাগছে বিষয় টা
স্নিগ্ধার কথা শেষ হওয়ার আগেই সৈকত বলে সরি ফর ডিস্টার্ব ইউ।আমি আমার ফোন টা ফেলে গিয়েছিলাম সেটাই নিতে এসেছি।
স্নিগ্ধা আর নয়না কিছুটা অপ্রস্তুত ভাবে বলে কোথায় ফোন??
সৈকত আস্তে আস্তে স্নিগ্ধার কাছে এগিয়ে আসে।যখনই সৈকত স্নিগ্ধার আরোও কাছাকাছি আসে স্নিগ্ধা আস্তে আস্তে পিছে সরতে শুরু করে।এভাবে যেতে যেতে স্নিগ্ধা কিসে যেন বাধা পায়।সৈকত ও স্নিগ্ধার খুব কাছে যেয়ে নিজের বাম হাতটা স্নিগ্ধার কোমর বরাবর বাড়িয়ে দেয়। সৈকতের এভাবে কাছে আসাতে স্নিগ্ধার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যায় মনে হয় এখনি বুঝি হার্টটা কাজ করা বন্ধ করে দিবে।হঠাৎ করে সৈকত বাম হাত দিয়ে মোবাইল টা স্নিগ্ধার পেছনের টেবিল থেকে উঠিয়ে স্নিগ্ধার সামনে ধরে বলে মিস স্নিগ্ধা আপনাকে না আমি আমার মোবাইল টা নিচ্ছি।এতে এতো ভয় পাওয়ার কি আছে!?
স্নিগ্ধা নিজের দুর্বলতা সারাতে বলে কো……থায় আর কি……সের ভ….য়?? আপনি সহজে বলতে পারতেন যে এখানে আপনার ফোন আছে আমি নিজেই দিয়ে দিতাম।
সৈকত স্নিগ্ধার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে ভয় পেলে আপনি কিন্তু তোতলানো শুরু করেন সেটা কি জানেন?
কথাটা শুনে স্নিগ্ধার চোখ বড় বড় হয়ে যায়।
এতো অবাক হবেন না,, রাগলে কিন্তু আপনার নাকের আগাটা লাল হয়ে যায় দেখতে ভারী সুন্দর লাগে কথাটা বলেই সৈকত দ্রুত বেরিয়ে যায়।
আর স্নিগ্ধা সে গোলকধাঁধায় পড়ে যায়।
চলবে..........
Comments
Post a Comment