অভিমানী ভালবাসা পর্ব ২
২.
সৈকত রিহানের দিকে তাকিয়ে একটা কার্ড বের করে বলে তুই এক কাজ কর এই নম্বরে ফোন করে আজকের ফ্লাইট টা ক্যানসেল করে দে ।
রফিক সাহেব খুব খুশি হয় সৈকতের কথা শুনে।
রিহান বলে ঠিক আছে তাহলে তুই এখন রেস্ট কর, আমরা পরে এ নিয়ে কথা বলবো এখন আসি।
সৈকত বললো সেটা হবে না,,তুই আজ আমার সাথেই থাকবি।২বছর পর তোর সাথে আমার দেখা অনেক কথা শেয়ার করার আছে তোর সাথে।
সৈকত বলে আংকেল আপনার কোন অসুবিধা নাই তো রিহান এখানে আজ থেকে গেলে??
রফিক সাহেব রিহানের দিকে তাকিয়ে বলে না, আমার অসুবিধা নাই।রিহান তুমি সৈকতের সাথে থেকো আর যদি কোন প্রয়োজন হয় আমাকে জানিও।তাহলে আমি এখন আসি।
সৈকত বলে আংকেল আজকের রাত এখানে থেকে গেলে হয়না?
না সৈকত তোমার আন্টির শরীর টা বেশি ভালো নাই, আমাকে ফিরতে হবে বলে বসা থেকে উঠা দাড়ায় রফিক আহমেদ।
সৈকত বলে ঠিক আছে তাহলে আপনাকে আর জোর করছিনা।আমি বরং আগামীকাল আন্টিকে একবার সময় করে দেখে আসবো।
রফিক সাহেব বের হতে গিয়ে কি ভেবে আবার পিছন ফিরে বললেন আচ্ছা তোমার না ফেরায় লন্ডনের বিজনেস এর কোন সমস্যা হবে নাতো??
সৈকত মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে না আংকেল কোন প্রব্লেম নাই। এখান থেকে আমি সবটা ম্যানেজ করে নিতে পারবো।ওখানে ভিকি,আর স্যান্ডি আছে (পি এ& ম্যানেজার) ওদের ইনস্ট্রাকশন দিয়ে দিলে ওরা করতে পারবে।
ঠিক আছে যেটা তোমার ভালো মনে হয়,আগামীকাল ইন শা আল্লাহ দেখা হবে বলে রফিক সাহেব বিদায় নিয়ে চলে যায়।
সৈকত রিহানকে বলে তুই ফ্লাইটা ক্যান্সেল কর আমি ততক্ষণে ফ্রেশ হয়ে আসি।তারপর একসাথে খাবো।
রিহান বলে যা ফ্রেশ হয়ে আয়,আমি কাজটা সেরে নি।
খাবার খেয়ে দুই বন্ধু একজায়গায় বসে খোশগল্প করতে শুরু করে। সৈকত রিহানের দিকে তাকিয়ে বললো হঠাৎ তুই এতো দ্রুত পরিবর্তন হয়ে গেলি কি করে বলতো??
রিহান কিছুটা মুখে শুষ্ক হাসি ফুটিয়ে বললো, কে বলেছে আমি পরিবর্তন হয়ে গেছি!?আগে যেমন ছিলাম এখনো তো তেমনি আছি।
সৈকত রিহানের মুখে হাত দিয়ে বললো এগুলি কবে থেকে রাখতে শুরু করলি??আর এই যে তোর পুরা গেট আপে কেমন চেঞ্জ হয়ে গেছে, পুরাই দাদা,চাচা মনে হচ্ছে।এতো ক্ষন আংকেল ছিলো সে জন্য কিছু বলিনি। এখন খুলে বলতো ব্যাপার টা কি,ছ্যাকা ট্যাকা খেয়েছিস নাকি!!??
রিহান বলে কি বলিস এগুলা, ওসব প্রেম ভালবাসা আমার দ্বারা হবে না,আর ছ্যাকা তো অনেক দূরের ব্যাপার।ওসব হচ্ছে ..
দুজনের কথার মাঝেই হঠাৎ সৈকতের ফোন টা বেজে ওঠে,,সৈকত ফোনের স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে রিহানকে ইশারায় চুপ করতে বলে।
রিহান চুপ হয়ে যায়।
সৈকত ফোনটা রিসিভ করেই কন্ঠটা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু নরম করে ইংরেজিতে কথা বলতে বলতে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়।রুম থেকে রিহান ফোনের অপর প্রান্তের কথা শুনতে পাই না, শুধু সৈকতের কথা গুলে শুনে রিহান বুঝতে পারে সৈকত কোন মেয়ের সাথে কথা বলছে।
মিনিট দশেক পরে সৈকত কথা শেষ করে রুমে ঢুকেই রিহানকে বলে আচ্ছা এই ৫০০ কোটির ডিলটা কি করে কি করি বলতো?
রিহান বলে রাখ তোর টাকার হিসাব, আগে বল কার সাথে কথা বললি গার্লফ্রেন্ড নাকি।
সৈকত বলে কার কথা বলছিস লরেন!?
রিহান বলে এইমাত্র যার সাথে কথা বললি তার কথা বলছি।
সৈকত বলে হ্যাঁ গার্লফ্রেন্ডই বটে কিন্তু তুই যা ভাবছিস তেমন কিছুই না। একটা বিজনেস পার্টিতে গিয়ে এই সপ্তাহ খানেক আগে লরেন এর সাথে পরিচয় হয়।সেই থেকে হাই ,হ্যালো হয় আরকি।
রিহান একটু অবাক হয়ে বলে জাস্ট হাই,হ্যালো নাকি আরো অনেক কিছুই।কথা শুনে তো মনে হলো তুমি বন্ধু ডুবেছো।
সৈকত রিহানের পিঠ চাপড়ে বলে এ-ই সৈকত চৌধুরীকে ভালবাসা এতটা সস্তা নই বুঝেছিস।আর সৈকত ও তেমন কাচা প্লেয়ার না যে হুট করেই কাউকে ভালবাসবে।এত বছর ধরে যা দেখে আসছিস সবই মজা, মাস্তি,হ্যাং আউটের জন্য।তা ছাড়া আর কিছুই না। আর শোন এখন কার মেয়েরা শুধু টাকা চেনে টাকা, তাইতো লাইন ধরে।দেখছিস না এক সপ্তাহের পরিচয়ে লরেন এমন বিহেব করছে মনে হচ্ছে কত বছরের রিলেশন আমার তার সাথে।টাকাই সব হয় সব!!
টাকা আর গিফটের জন্য মেয়েরা সব করতে পারে।
রিহান বলে সব মেয়ে তো এক না। সবাইকে কেন এক পাল্লায় মাপছিস।এখনো অনেক মেয়ে আছে যারা টাকা দিয়ে মানুষকে পরিমাপ করে না।
সৈকত রিহানের কথাই হো হো করে হেসে ওঠে বলে তাহলে কি দিয়ে পরিমাপ করে বন্ধু?
রিহান বলে সুন্দর একটা মন দিয়ে।
সৈকত বলে মেয়েরা এখন আর মন আর মনুষ্যত্ব খোঁজে নারে,শুধু খোজে কার ব্যাংক ব্যালেন্স কয়টা,আর কার পকেটে কয়টা ক্রেডিট কার্ড আছে সেগুলি ।যে পুরুষ যত বেশি মেয়েদের পিছনে খরচ করতে পারে সেই পুরুষ মেয়েদের চোখে হিরো বনে যায় রাতারাতি। আর সেই ছেলের সাথে শুধু দিনের বেলায় নয়, পুরা রাত কাটাতেও পিছপা হয়না মেয়েরা বুঝলি।
রিহান মাথা নেড়ে বলে হয়তো!
এ বিষয়ে অবশ্য তুই আমার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ।
সৈকত বলে এসব বাদ দে এখন বল এই উড়ে এসে জুড়ে বসা স্নিগ্ধা রহমানের কি করা যায়।
সৈকতের এমন কথাই রিহান অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে তুই আসলে কি করতে চাইছিস বলতো!?
সৈকত বলে কি করা যায় সেটাই তো তোর কাছে জানতে চাইছি।আমি কোন ভাবেই আমার বাবার কষ্টের অর্জিত টাকা এতো সহজে অন্যের হতে দিবো না।এখন বল কি করবো আমি।
রিহান হাসতে হাসতে বলে তাহলে আর কি স্নিগ্ধাকে বিয়ে করে ফেল,রাজকন্যা আর রাজ্য দুইটাই পাবি।
সৈকত রিহানের কথা শুনে চেচিয়ে বলে আর ইউ ক্রেজি?কোথায় ওই মেয়েটা আর কোথায় আমি!? তাকে চিনি না জানিনা, এমন মেয়েকে আমি করবো বিয়ে!!?একবার অন্তত ফ্যামিলি স্টাটাসের কথা চিন্তা কর।আর কোথাকার কোন মেয়ে যার কোন ক্লাস নেই, তাকে বিয়ে করবে এই সৈকত নো ওয়ে।
রিহান বলে তাহলে ৫০০ কোটির কথা ভুলে যা।
সৈকত বলে হয়াট দ্যা***
তুই আমার বন্ধু না শত্রু।
রিহান বলে দেখ উইল অনুযায়ী ওই টাকার মালকিন এখন স্নিগ্ধা,সে যাকে ইচ্ছা তাকে তার ভাগের অংশের পাওয়ার অব এর্টনি বানাতে পারে,সে হোক তার,মা বাবা,চাচা,মামা ইত্যাদি।যেহেতু তার বাবা নেই আছে শুধু মা,তাই বললাম।
সৈকত বলে তাই বলে বিয়ে করতে হবে??
রিহান সৈকতকে বলে তা ছাড়া উপায় নাই বন্ধু।
সৈকত বলে দরকার হয় আমি ওকে জোর করে তুলে নিয়ে এসে স্বাক্ষর করিয়ে নেব তুই উইল তৈরি কর।
রিহান বলে সেটা সম্ভব না,
সৈকতঃ কেন সম্ভব না?
রিহান বলে তুই উইল টা আবার ভালো করে প্রথম থেকে শেষ অবধি পড় তাহলে বুঝতে পারবি।
সৈকত উইল টাতে ভালো করে চোখ বুলায়,তারপর বলে বাবা এরাকম কেন করলো রিহান?
রিহান বলে আমি এ সম্পর্কে কিছুই জানিনা।তাই না জেনে কিছুই বলতে পারবো না।
সৈকত বলে আমি আগামীকাল স্নিগ্ধাদের সাথে দেখা করতে চাই। তুই যাবি আমার সাথে।
রিহান মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়।
অর্ধেক রাত অবদি সৈকত শুধু রুমে আর বেলকনিতে দাঁড়িয়ে এক অস্থিরতার মধ্য সময় কাটাই।মাথার মধ্য শুধু একটা চিন্তায় গিজগিজ করছে কিভাবে কি করা যায়।
রিহান সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে সৈকত বেলকনিতে ইজি চেয়ারের উপর ঘুমিয়ে গেছে। রিহান সৈকতকে ডাকতে গিয়েও মনে মনে ভাবে কখন ঘুমিয়েছে কে জানে!? আমি বরং ফ্রেশ হয়ে নি সৈকত আরেকটু ঘুমাক। ঘড়ির কাটা ৯টায় পৌঁছাতেই ঢংঢং করে শব্দ করে ওঠে।ঘড়ির শব্দ কানে যেতেই সৈকতের ঘুম ভেঙ্গে যায়।সৈকত তাড়াতাড়ি করে ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এসে দেখে রিহান রেডি হয়ে নিচে বসে ফুফির সাথে বসে কথা বলছে আর কফি খাচ্ছে।
সৈকত কাছে আসতে ফুফি বলে তুই উঠেছিস তাহলে, আমি দুইবার তোর রুমে গিয়ে আবার ফিরে এসেছি তুই তখন ঘুমিয়ে ছিলি।বাবা তুই কি কোন কিছু নিয়ে চিন্তিত??
সৈকত রিহানের দিকে তাকিয়ে ইশারায় কিছু জিজ্ঞাসা করে, ফুফির দিকে তাকিয়ে মিচকি হেসে বলে না ফুফি আমি ঠিক আছি।
ফুফি কাজের মেয়ে আসমা কে ডেকে সকালের নাস্তা রেডি করতে বলেন।
তারপর সৈকতের হাতটা ধরে টেনে পাশে নিয়ে বসান। তারপর বলেন মিথ্যা বলিস না সৈকত, তোর মা মারা যাওয়ার পর থেকে তোকে আমি কোলে পিঠে করে মানুষ করেছি তোর প্রতিটি চাহনি,তোর প্রতিটা কদম আমার চেনা। তোর কিছু না হলে তুই মাঝ রাত অবধি জেগে থাকতি না।
সৈকত বলে আসলে বাবা কে মিস করছিলাম। ছোট বেলা মাকে হারিয়ে বাবা আর তুমি আমাকে কষ্ট করে এই অবধি নিয়ে এসেছো।বাবা সবসময় আমার মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেছে। শত ব্যস্ততার মাঝেও আমাকে সময় দিয়েছে। এমনকি আমার দিকে তাকিয়ে দ্বিতীয় বিয়েটা অবধি বাবা করেনি।হঠাৎ করে বাবা আমাদের ছেড়ে এভাবে পরাপরে চলে যাবে তা ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে।
হঠাৎ কাজের মেয়ে আসমা এসে বলে ম্যাডাম নাস্তা রেডি ।
লায়লা চৌধুরী বলেন তুই যা আমরা আসছি।
সকালের নাস্তা শেষ করে সৈকত রিহানকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। গন্তব্যে স্নিগ্ধা।
১২/১৩ কি.মি রাস্তা ড্রাইভ করে ছোট একটা বাজারের সামনে এসে রিহান গাড়িটা থামাতে বলে।সৈকত গাড়ি থামিয়ে বলে এখানে থাকে নাকি স্নিগ্ধার পরিবার?
রিহান বলে হ্যাঁ একটু হেটে সামনে গেলেই ওদের বাসা।আর বাসার সাথেই পার্লার। সৈকত রেগে বলে হেটে যাবো মানে?
রিহান বলে দেখতে পারছিস না এখানে সবাই দোকান খুলে বসেছে ।আর এটা মানুষের হাটার রাস্তা, তুই এখন এই বাজারের ভিতর দিয়ে গাড়ি চালাতে পারবি না।সৈকত রাগে ভিতরে ভিতরে ফুসতে শুরু করলেও রিহানকে কিছু না বলে গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে।তারপর শরীর থেকে কোর্ট টা খুলে রিহানের দিকে এগিয়ে দেয়।সৈকত রিহানের কাছ থেকে
পার্লার টার নাম শুনেই বলে তুই গাড়িতে থাক আমি বরং একা গিয়েই দেখা করে আসি।
রিহান কিছু বলতে যাবে তার আগেই সৈকত হাটা শুরু করে।বাজারের ভিতরে ঢুকেই একটা সব্জি বিক্রেতার কাছে জানতে চাই “অনামিকা বিউটি পার্লার”টা কোন দিকে। লোকটা বলে একটু সোজা গিয়ে ডান হাতের গলিতে ঢুকে ২/৩ বাসা পরেই বাম পাশের আকাশীরং এর যে দোতালা বাড়ি সেটাই অনামিকা বিউটি পার্লার।
সৈকত লোকটার কথা মতো এগিয়ে যেতে শুরু করে। সৈকত পার্লারের কাছাকাছি যেতেই দেখে লোকটার বলা সেই দোতালা বাড়ির ভিতর থেকে দুজন মহিলা গল্প করতে করতে বেরিয়ে আসে।সৈকত তাদের কাছে স্নিগ্ধা নামটা বলার সাথে সাথে মহিলা বলে ও ভিতরে আছে। সৈকত ভিতরে গিয়ে দেখে কেউ নেই।সৈকত এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে না দেখতে পেয়ে ভাবে উপর তালায় গিয়ে দেখবে কিনা, ঠিক তখনই বাড়ির পিছন দিক থেকে কিছুর শব্দ শুনে সেই শব্দ অনুসরণ করে এগিয়ে যায়।
স্নিগ্ধাদের বাসা রাস্তার সাথে হওয়ায় বাসার সামনে তেমন জায়গা নেই।কিন্তু পিছনের দিকে অনেক বড় খোলামেলা জায়গা। আর সেখানে স্নিগ্ধার নিজের হাতে অনেক রকমের প্রিয় ফুলের গাছ লাগিয়ে ছোট খাটো বাগান তৈরি করেছে।কাজের ফাঁকে ফাঁকে তার বাগান সে নিজ হাতেই পরিচর্যা করে।
সৈকত এগিয়ে গিয়ে দেখে সাদা আর নীল রং এর লেহেঙ্গা পরে একটা মেয়ে বেগানের ফুল গাছ গুলিতে পানি দিচ্ছে।সৈকত আস্তে আস্তে মেয়েটার পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে আপনি কি মিস স্নিগ্ধা!!??
হঠাৎ কোন অপরিচিত ছেলের কন্ঠ শুনে হকচকিয়ে পিছন ফেরে স্নিগ্ধা।হাতে অন থাকা পানির পাইপ থেকে অনর্গল পানি বর্ষন হয়ে যে সামনের অপরিচিত ছেলেটি ভিজে চলেছে তাতে যেন তার খেয়ালই নেই।
সৈকত বলে স্টপ, প্লিজ স্টপ ইট,
সৈকতের কোন কথা যেন স্নিগ্ধার কানে আসছে না।
সৈকত অনবরত থামতে বলেও যখন দেখছে কাজ হচ্ছে না তখন সামনে এসে সৈকত স্প্রে করা পাইপ টা ধরে টান দিতেই স্নিগ্ধার পা পিছলে যায়। স্নিগ্ধা ভয়ে চিৎকার করতেই………..
Comments
Post a Comment