বেখেয়ালি ভালবাসা ১ও ২ পর্ব

 ♥♥#বেখেয়ালি_ভালবাসা♥♥

#সূচনা_পর্ব

লেখিকাঃ #সাবেরা_সুলতানা_রশিদ 


১.

ফাস্ট ক্লাস কুপে কামরায় হানিমুনটা শুরু থেকেই নবদম্পতির প্রেমে  জমে ক্ষীর হবার কথা । একদিকে তরতাজা সুদর্শন  একটা যুবক অন্য দিকে টগবগে সুন্দরী তরুনী। কিন্তু প্রেমটা কেন জানি জমলো না।


 ট্রেনটা স্টেশন থেকে ছাড়তেই সৈকত তার লাগেজের জামাকাপড়ের তলায় সযত্নে শোয়ানো বোতলটি বের করে বসে গেল এবং খুব নিবিষ্টমনে  প্রায় একনাগাড়ে মদ খাওয়া শুরু করলো। 

তাই কিছুদূর যেতে না যেতেই পানির বোতলের প্রায় সব টুকু পানিই শেষ হয়ে গেলো। 


মেঘ সেটা দেখেও না দেখার ভান করে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করছে। আড়চোখে সৈকত কে দেখছে আর মনে মনে ভাবছে এ কার সঙ্গে বিয়ে হল তার?


একজন নেতা এবং বড়লোকের ছেলে,এই পরিচয় দেখেই কি বাবা সৈকতের সঙ্গে বিয়ে দিল তার?          আর কোন খোঁজখবর করল না?


সৈকত সুপুরুষ সন্দেহ নেই। মেঘ এও জানে,খাওয়া-পরা বা সাজ সজ্জার  কোনো জিনিসের অভাব তার হবে না। কিন্তু জীবনে বেচে থাকার জন্য এগুলিই তো  সব নয়।


একটা সম্পর্ক টিকেয়ে রাখতে হলে অন্তত সেই সম্পর্কে র মাঝে ভালবাসা আর শ্রদ্ধা থাকা চাই। কিন্তু এ কেমন  সম্পর্ক মেঘ আর সৈকতের মাঝে!!??না আছে ভালবাসা আর না আছে কোন শ্রদ্ধা দুজনের মাঝে। এযেন শুধু মুখ থেকে তিনবার উচ্চারিত হওয়া কবুল নামক শব্দ আর কাগজে খস খস করে সই দেওয়ার মাঝেই সীমাবদ্ধ।


কিন্তু এরাকম সম্পর্ক তো কখনো চাইনি মেঘ।কত স্বপ্নই না ছিলো তার এই স্বামী স্ত্রী নামক সম্পর্ক ঘিরে কিন্তু এখন সে হয়ে আছে শুধু মাত্র কাগজের বউ।


মেঘ সৈকত কে যতই দেখে ততই অবাক হয়।আর অবাক হবেই না বা কেন!!?? বিয়ের দিন থেকে সৈকত নামের এই স্বামী বস্তুটা যা শুরু করেছিলো তা মনে করতেই মেঘের কেমন যেন অবাক লাগে।

সৈকতকে স্বামী নামের বস্তু বলেছি তার কিছু কারণ আছে,,আচ্ছা বলুন তো বস্তু কাকে বলে??


আপনারা ভাবতে লাগুন তার মধ্য আমি মেঘের দেওয়া সৈকতকে স্বামী নামের বস্তু বলার কারণ টা উদঘাটন করে নি।আসলে মানুষ হিসাবে  সৈকতের শারিরীক দিক,মানসিক দিক ফিট থাকলেও মেঘের প্রতি সৈকতের মন থেকে  কোন অনুভূতি,ভালবাস ছিলো না।


 এসব কথা বাদ দিয়ে ফিরে আসি মেঘের দিকে। মেঘ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ভাবছিলো তার বর্তমান জীবনের কথা…….

 সৈকত বিয়ের দিন থেকেই গন্ডগোল করে যাচ্ছে। 

মেঘকে বিয়ের দিন যখন সাজগোজ করানো হচ্ছে সেই সময়  একবার খবর এলো সৈকত কে বাড়িতে পাওয়া যাচ্ছে না।    


বিয়ের দিন বরের  বাড়ির সবাই যখন কনে বাড়িতে চলে এসেছে হঠাৎ করে শোনা গেল সৈকত নাকি বাড়ি নেই সে অন্য কোথাও  পালিয়েছে।  

মেঘের বড় ভাই পরে নিজে গিয়েছিল মেঘের শ্বশুরবাড়ি কিন্তু সেও হতাশা নিয়ে ফিরে এল সৈকত কে না পেয়ে।  

মেঘ কে বউ সাজিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে।


মেঘের কানে যখন কথাটা পৌছাল তখন মেঘ মনে মনে খুশিই হয়েছিল । কারণ মেঘ বিয়েটা এত তাড়াতাড়ি করতে চাইনি।বয়স যে খুব বেশি তাও না (১৮)। সবে উচ্চ ম্যাধমিক শেষ করে বি বি এ তে ভর্তি হয়েছে । 


মেঘ গ্রাজুয়েসন টা  শেষ করে তারপর বিয়ের পিড়িতে বসতে চেয়েছিল কিন্তু হঠাৎ করে নেতা (সৈকতের  বাবা) নিজে এসে মেঘের বাবাকে তার ছেলের জন্য বউ করে নিতে চাইলো বাড়ির সবাই একটু সময় চাইলেও মেঘের বাবা আর দেরি করলেন না।  এমনকি তিনি তার মেয়ের মতামতটা ও নিলেন না বিয়ের দিন ঠিক করে ফেললেন। 


এদিকে সন্ধ্যা পেরিয়ে যেতে লাগলো বিয়ে বাড়ির সবাই গুজগুজ হুসহুস করছে। বরের বেপাত্তা হওয়ায় সবাই ঘাবড়ে গেছে। বরের বাড়ির লোকের মুখের কথায় তাদের আরোও ভীত করে তুলল। 


তবে রায়হান চৌধুরী(মেঘের শ্বশুর)অতি ক্ষমতাবান লোক। বাড়িতে বসে শুধু টেলিফোন করে রায়হান তার লোকজনকে সক্রিয় করে তুললেন।  সব জায়গায় লোক পাঠিয়েছেন তার ছেলেকে খুজে আনার জন্য। পুলিশ থেকে শুরু করে তার দলের সব নেতাওকর্মীদের কানে কথাটা পৌছাতে তারা ও হন্যে হয়ে সৈকতকে খুজতে শুরু করেছে। 


রাত নয়টার দিকে সৈকতকে একটা খাবার হোটেলের ভিতর থেকে এটো হাতে তুলে আনা হলো  ।

পরনে নীল জিন্স আর সাদা একটা টি-শার্ট। বিয়ে বাড়ির সবাই দেখে মিচকি মিচকি হাসতে শুরু করল। 


তাড়াতাড়ি করে কোনরকমে কাপড় পাল্টে তাকে কনের পাশে বসিয়ে বিয়ে পড়ানো হলো সবাই যখন নতুন দম্পতির সুখে থাকার জন্য মোনাজাত করছে আর সৈকত তখন রাগে গজগজ করছে।  মেঘ তখনই বুঝতে পেরেছিলো বাবা সব জেনেশুনে তাকে হাত পা বেধে পানিতে ফেলে দিল। এটা বিয়ে নয়। এই লোকটা হয় পাগল, না হয়  বদমাশ । সারা জীবন একে স্বামী হিসাবে কল্পনা করাও তার পক্ষে কষ্টকর হবে।  


মেঘকে ফুলশয্যার ঘরে বসিয়ে দিয়ে সবাই একে একে বিদায় নিয়ে চলে গেছে।  মেঘ নিজের লম্বা ঘোমটা সরিয়ে  ঘরের চারিদিক টা চোখ বুলিয়ে চুপ করে বসে আছে।

  

একটু পরে সৈকত ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে আলমারি থেকে একটা বিয়ারের বোতল বের করে টেবিলে রেখে চেয়ার টেনে বসলো।  


সৈকতের ঘরে ঢোকা দেখে মেঘ নিজের ঘোমটা টেনে দিয়েছিল। ঘোমটার ভিতর থেকেই মেঘ সৈকতের কাজ দেখে অবাক হয়ে গেল । 


হঠাৎ  সৈকত বললোঃ

—খাবার ঘরের ফ্রিজ থেকে বরফের ট্রেটা আর একবোতল ঠান্ডা পানি নিয়ে এসো।


সৈকতের কথাটা শুনে মেঘ ঘোমটা সরিয়ে চোখ বড় বড় করে সৈকতের দিকে তাকিয়ে বললোঃ

—আপনার লজ্জা  করছে না নতুন বউকে পানি আনতে বলছেন তাও আবার মদ গেলার জন্য!!তাও আজ??

—খেলে কী?রোজ খায় আজ নয় কেন?

—আজকের দিনেও খায় কেউ!!?

মুখটায় রাজ্যের বিরক্তি ফুটিয়ে  সৈকত বললঃ

—প্যান প্যান করো না। নিজে না পারো তো একটা চাকরবাকর কাউকে বলো। এনে দেবে। 

—আমি!!?

—হ্যা ,তুমি ছাড়া এখানে কেই বা আছে যাকে বলবো। 

মেঘ আর রাগ সামলাতে পারলো না।  

এমনিতে মেঘ রাগী আর জেদী টাইপের আর তারপর কপালে জুটেছে এরাকম এক হতচ্ছাড়া বর। বিয়েটা নিয়ে মেঘের মনে কত স্বপ্ন ছিল বর হিসাবে চেয়েছিল খুব রোমান্টিক কাউকে কিন্তু সব স্বপ্ন সব চাওয়া ধূলিসাৎ হয়ে গেল।  

রেগে বললঃ

—আমি পারবো না। 

সৈকত একটু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মেঘের দিকে। তবে বাড়াবাড়ি করল না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে  থেকে চোখ নামিয়ে নিয়ে বলল ,তুমি বেশ সুন্দরী । তবে তোমাকে কিন্তু আমি নিজে পচ্ছন্দ করে আনিনি। সুতরাং আমার বেশী দায়দায়িত্ব নেই। 


মেঘ একটু দাপটের সঙ্গে বললোঃ

—আপনার দায়দায়িত্বের বোধ আমি জানি। আমাকে আর বোঝাতে হবে না। 


সৈকত এই কথায় অনেকক্ষন চুপ করে বসে রইল। গোলাপ আর রজনীগন্ধা ফুলে সাজানো ঘর মাতাল হয়ে উঠছিল গন্ধে। দামি পারফিউম ছড়ানো বিছানা অপেক্ষা করছিল তাদের জন্য। 

এসিতে ঘরের তাপমাত্রা ঠান্ডা হয়ে ছিল। সেই অদ্ভুত মাদকতাময় ঘরে বিছানায় পা তুলে শিকারী বিড়ালের  মতো তীব্র চোখে মেঘ লক্ষ্য করছিল সৈকতকে। এই লোকটা কোনদিন তাকে ছুয়ে দেখবে বা আদর সোহাগ করবে ভাবতেও গা ঘিন ঘিন করছিল তার। 


অনেকক্ষন চুপ করে অনড় হয়ে বসে রইল সৈকত। তারপর  চেয়ারটা  মেঘের দিকে ঘুরিয়ে বসল। 


মেঘ দেখল সৈকতের মুখে রাগ নেই,বিদ্বেষ বা ঘৃনাও নেই। এক ধরনের তীব্র ও গভীর বিষণ্ণতা আছে। 


সৈকত ধীর স্বরে বললোঃ

— আচ্ছা তোমার নামটা যেন কি??

—যাকে বিয়ে করেছেন তার নামটাও জানেন না!!?

—হু, একবার শুনেছিলাম মেঘ না যেন কি?

—না ,আমার নাম বঙ্গবাসীনি। 

—এত রেগে যাচ্ছো কেন?

—তা কি করবো!!?

  

সৈকত মেঘের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। 

—আচ্ছা নামটা আমার জানা উচিত  তাই না?

—আপনি কি উচিত অনুচিত মানেন?


সৈকত রাগলো না।  ধীর স্বরে বললোঃ

—ঠিক আমার মতো অবস্থায় না পড়লে তুমি কখনোই আমার সমস্যার কথা বুঝতে পারবে না মেঘ। আমাকে ঘৃনা করা খুব সহজ। এই বাড়ির সকলে আমাকে ঘৃনা করে । 


কথাটা মেঘ ভাল বুঝল না। তবে চুপ করে রইল। 

সৈকত নিজেই খানিকক্ষন বিরতি নিয়ে বলে,

—আমার মা নেই জানো?

মেঘ বললঃ

—আপনার মা নেই তাতে কি!?অনেকেরই থাকে না।  


—ঠিক কথা। কিন্তু আমার মায়ের এখনো বেচে থাকার কথা ছিল। মা নিজের  গায়ে আগুন লাগিয়ে মারা যায়। আমি তখন ছোট,বছর দশেক বয়স হবে হয়তো। পুরাতন বাড়িতে থাকতাম। বাথরুমে ঢুকে মা গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়। সব পুড়ে গেল কিন্তু মা একটা শব্দ ও করেনি। হান্ডেড পারসেন্ট বারনিং,হাসপাতালে তিন দিন বেচে থেকে মারা যায়। সেই মৃত্যুটা যতদিন মনে থাকবে ততদিন তোমার শ্বশুরের সঙ্গে আমার লড়াই শেষ হবে না। 


মেঘ বুঝতে পারছিল না। বললোঃ

—কিসের লড়াই ??

—লড়াইটার অনেক  কারণ বহু কিছুর জন্য ঐলোকটা দায়ী। লোকটা ক্ষমতালোভী, নিষ্ঠুর ,অহংকারী। জানো এসব?

—না । মাথা নাড়ল মেঘ। 

—ধীরে ধীরে জানবে। 

—তবে এই লোকটা নিজের দেশ ও মানুষকে বাস্তবিকই ভালবাসে  । 


মেঘ এই শ্বশুর প্রসঙ্গ খুব উপভোগ করছিল না। ছেলের মুখে বাবার নিন্দে এমনিতেও সুস্বাদু নয়। মেঘ বললো আমার মাথা ধরেছে আমি একটু ঘুমাবো। 


সৈকত উদাস স্বরে বলল,এ বাড়িতে যে ঘৃনার জীবাণু ঘুরে বেড়াছে তাও তোমাকে অ্যাটাক করেছে বুঝলে!?সেটাই অবশ্য স্বাভাবিক । এনি ওয়ে তুমি ঘুমিয়ে পড়ো। আমার বোধহয় আজ রাতে আর ঘুম আসবে না। 


মেঘ শুয়ে পড়লো এবং একসময় ঘুমিয়েও পড়লো। খুবসকালে তুমুল চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙল তার। 


                                  


২.

চেঁচামেচির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে মেঘের বুকের ভিতর কেমন ধড়ফড় শুরু হল। কোন রকম বিছানা থেকে নেমে বেলকনিতে এসে দাড়িয়ে দেখল সৈকত বাগানে দাড়িয়ে চিলাচ্ছে আর ওকে বাসার দু-তিন জন সিকিউরিটি গার্ড ধরে রেখেছে। 


একটু পরে রায়হান চৌধুরী সৈকতের সামনে গিয়ে জিঙ্গাসা করলেনঃ

—কি হয়েছে এভাবে ষাড়ের মত চেচাচ্ছ কেন?

—আপনার লোকেরা আমাকে জোর করে ধরে রেখেছে কোথাও যেতে দিচ্ছেনা। 

—ওদের কে আমি বলেছি তোমাকে সবসময় নজরে রাখতে যাতে কোথাও পালিয়ে না যাও।  

—আমি কোথাও পালিয়ে যাচ্ছি না। একটু হাটতে বেরিয়েছি।  


—পালানোর চেষ্টা করলেও তুমি তা পারবে না। এখন উপরে যাও হয়তো বউমা এতক্ষনে উঠে গেছে তাকে গিয়ে সময় দাও। 

 

সৈকত আর কোন কথা না বলে চুপকরে সেখান থেকে চলে আসে । 

মেঘ যে একটু আগের ঘটে যাওয়া দৃশ্য গুলো দেখেছে তা সৈকত কে বুঝতে দেয়না তাড়াতাড়ি করে বেলকনি থেকে রুমে এসে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে  নেই।  


মেঘ দেখে সৈকত গম্ভীর হয়ে বসে আছে নাক লাল হয়ে আছে মনে হচ্ছে রাগে সারা শরীর জ্বলছে সৈকতের । সৈকতের লম্বা নাকটা ওর নিশ্বাসের সাথে ফুলছে আর কমছে। 

সৈকতের নাকের দিক তাকিয়ে মেঘের মনে মনে খুব হাসি পাচ্ছে।  

কিন্তু সেটা সৈকতকে বুঝতে না দিয়ে বললোঃ

—কখন উঠেছেন ঘুম থেকে?

—উঠিনি। 

—মানে!!?

—ঘুমালে উঠতাম, না ঘুমালে কেমন করে উঠবো??

—তার মানে আপনি সারা রাত জেগে ছিলেন ??

—হ্যাঁ । 


মেঘ এতক্ষন খেয়াল করেনি।  সৈকতের কথা শুনে বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখে সত্যিসত্যিই সৈকত রাতে ঘুমায়নি মেঘ বিছানার যে পাশে শুয়ে ছিল শুধু সে জায়গা টুকুর চাদর দলা হয়ে আছে,,আর সৈকতের পাশের জায়গা রাতে যেমন ছিলো এখনো তেমনই আছে।মেঘ সৈকতের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে জিজ্ঞাসা করে  


—কেন ঘুমান নি??

—সেটা জেনে তোমার কি কাজ??যা করছো তাই করোনা আমার কোন বিষয়ে তোমাকে ইন্টারফেয়ার করতে হবে না।  

কথাটা একটু উচ্চস্বরে বলে সৈকত।  


মেঘ সৈকতের কথাটা শুনে মনে মনে কষ্ট পায় । ছোট থেকে কোনদিন এ পর্যন্ত তার বাড়ির মানুষ মেঘের সাথে এমন উচ্চস্বরে কথা বলেনি আর আজ বিয়ে হয়ে আসতে না আসতেই নিজের স্বামীর কাছে চোখ রাঙানী দেখতে হচ্ছে।  


মেঘ আর কোন কথা না বাড়িয়ে শাড়িটা ঠিক করে পরে চুলগুলো আচড়ে নেই। তারপর চোখে কাজল দিয়ে আয়নার সামনে গিয়ে হালকা সেজে নেয় । 


হঠাৎ রুমের দরজায় টোকার শব্দ হয় 

—ভাবি আসবো ??(সৈকতের ছোট বোন ঝিনুক)

—এসো। 

—নাস্তা করবে চলো।  সবাই তোমাদের জন্য নিচে অপেক্ষা করছে।  


মেঘ আড়চোখে সৈকতের দিকে তাকিয়ে দেখে সৈকত রাতে রাখা সেই বোতলটা হাতে নিয়ে খোলার চেষ্টা করছে। বোতলটা রাতে যেমন ছিল তেমনই আছে।  মেঘ ভাবে তার মানে রাতে ঐকথা বলার পরে  সৈকত মদটা না খেয়ে ছিল !!


মেঘ ঝিনুকের দিকে তাকিয়ে বলে চলো। 

ঝিনুক একটু এগিয়ে যেতেই মেঘ সৈকতের কাছাকাছি এসে ইচ্ছে করে হোচট খায় ।  

ফলে সৈকতের হাত থাকা বোতলটা ততক্ষনে ফ্লোরে পড়ে ------


ঝিনুক কাচভাঙ্গা শব্দে পিছন ফিরে তাকাই। 

সৈকত বসা থেকে উঠে দাড়িয়ে বলেঃ

—এই এটা তুমি কি করলে??

—সরি আসলে বুঝতে পারিনি শাড়িটা পায়ের নীচে পড়ে হোচট খেয়েছি।  

—আমি কিছু বুঝিনা ভেবেছ!!


মেঘ সৈকতের কথা শুনে মনে মনে ভাবে ধরা খেয়ে গেলাম । পড়ে যাওয়ার আসল উদ্দেশ্য উনি বুঝে ফেলেছেন। এখন কি হবে!!?

—ভাইয়া তুই ভাবির উপর কেন রাগ করছিস?শাড়ি পরার অভ্যাস নেই তাই হয়তো

—এই তুই চুপ কর। আমি সব জানি গতকাল রাতে আসার পর থেকেই আমার পিছনে লেগেছে। 


মেঘ মনে মনে হাফ ছাড়ে তবুও ভাল যে সৈকত তার এ্যাক্টিংটা বুঝতে পারেনি।মনে মনে নিজেকে বাহবা দিয়ে বলে চালিয়ে যা মেঘ । 

মনে আনা কথা গুলো চেপে রেখে তাড়াতাড়ি  বলে সত্যিই আমি ইচ্ছা করে কিছু করিনি বলে নীচু হয়ে ফ্লোরে পড়ে থাকা কাচের টুকরো উঠাতে শুরু করে । 


সৈকত মুখ বাকিয়ে একটা বিদ্রুপ হাসি দিয়ে সরে বেলকনিতে গিয়ে  দাড়ায়। 


— ভাবি তুমি কেন এসব করছো?উঠো এ বাড়িতে অনেক লোক আছে এসব পরিষ্কার করার জন্য।  


মেঘ উঠে দাড়ায় । ঝিনুক একটা কাজের মেয়েকে ডেকে সব পরিষ্কার করে দিতে বলে। 


—ভাইয়া তুই যাবি না নাস্তা করতে।  

—তোরা যা আমার খেতে ইচ্ছা করছে না বলে প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে টান দেয় সৈকত।  


ঝিনুক আর কথা না বলে মেঘ কে সাথে নিয়ে নীচে ডাইনিং এ চলে আসে।  


রোজী(বড় ভাবী)হেসে মেঘের কাছে এসে আস্তে করে বলে 

—কি ?কেমন হলো ঘুম??

—জ্বী ,ভালো। 

—সত্যিই ভালো!না-----


মেঘ প্রথমে বুঝতে না পারলেও এবার বুঝলো যে আসলে ভাবী তাকে কোন উদ্দেশ্য নিয়ে কথাটা বলেছে। কথাটা বুঝে মেঘ লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো। 


ডলি(মেঝ ভাবি) দেখেছো ভাবি কেমন লজ্জা পেয়ে মুখটা লাল হয়ে গেছে।  


সৈকতরা তিন ভাই এক বোন।  ভাইয়েদের মধ্যে সৈকত ছোট আর ঝিনুক সৈকতের ও ছোট। তিন ভাইয়ের এক বোন খুব আদরের ।  


রায়হান চৌধুরী একটা কাশি দিয়ে খাবার টেবিলের কাছে এগিয়ে এলেন।          সঙ্গে সঙ্গে সবাই চুপকরে মাথা নিচু করে যার যার কাজ করতে শুরু করলো।  

রায়হান চৌধুরী যতই ব্যস্ত সময় কাটান না কেন তার প্রতিদিনকার কাজ হচ্ছে সকালে সবার সাথে বসে নাস্তা করা। সবার ভালমন্দ জিঙ্গাসা করা। কারো কোন অসুবিধে হচ্ছে কিনা তা যাচাই করা। তার বড় দুই ছেলের ব্যবসা কেমন চলে তা খোজখবর নেওয়া।  আর তার সবচেয়ে বড় যে কাজ সেটা হচ্ছে অনি (বড়ছেলের ছেলে)কে কোলে নিয়ে বসে খাইয়ে দিয়ে নিজে নাস্তা করা। 


রায়হান চৌধুরী বলে সে কোথায় তাকে তো দেখছি না।  


—ভাইয়া খাবেনা বলেছে। 

—এ আর নতুন কি এই চৌদ্দ পনের বছর থেকে শুনে আসছি। তবুও আজকে ভেবে ছিলাম যে সে হয়তো আজ আসবে কিন্তু আসলো না বলে ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস  ছাড়েন চৌধুরী। 


মেঘ তার শ্বশুরের কথা শুনে বুঝতে পারে যে এই মানুষটার বুকের মধ্যে কোথাও একটা কষ্ট আছে তার ছোট ছেলেকে নিয়ে। আর উনি যে তাকে বেশ ভালবাসে  তাও বোঝা যাচ্ছে। 


রোজি সবাইকে খাবার পরিবেশন করছে হঠাৎ মেঘ বসা থেকে উঠে রোজির কাছে গিয়ে বলে ভাবী আপনি বসুন আমি দিচ্ছি। 

—আরে না তুমি বসো।  খেয়ে নাও গতকাল কখন খেয়েছ তার কোন ঠিক নেই। 

—না ভাবি আমার অসুবিধে হবে না । 

—আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে দুজনে করি। 

মেঘ খুশি হয়ে সায় দিল।  


নাস্তা শেষ করে চৌধুরী বেরিয়ে গেলেন।  তারপর তার ছেলেরা যার যার অফিসে চলে গেল আর  ঝিনুক কলেজে । 


বাড়িটা এখন অনেকটা ফাকা। 


রোজি মেঘের কাছে এসে চলো এবার কিছু খেয়ে নেবে। 

আপনি খেয়ে নিন আমি পরে খাবো। 

উুহ বুজেছি সৈকতের জন্য বসে আছো তাইনা!?

মেঘ কোন কথা না বলে চুপ করে থাকে।  

—আচ্ছা বাবা ঠিক আছে ওতো লজ্জা পেতে হবে না।  

তবে কিছু কথা বলি মন দিয়ে শোন। 

—বলুন। 

—আমি যখন থেকে এ বাড়িতে এসেছি তখন থেকে সৈকত কে দেখছি ও খুব রাগি আর একগুয়ে টাইপের । এই ভাল এই মন্দ।  তবে ওর মনটা খুব ভাল।  উপর থেকে দেখলে যতোটা শক্ত মনে হয় আসলে ওর ভিতরটা ততটাই নরম। আমার তো মাঝে মাঝে মনে হয় ও শ্বশুরের পতিচ্ছবি।  আমাদের শ্বশুর ও কিন্তু এমনই। বাড়ির সবাই ওনাকে ভয় পায় সাথে সম্মান ও করে ।  

আমি এত বছরেও বাবা আর সৈকতের মাঝের যে দেওয়ালটা আছে সেটা ভাঙ্গতে পারিনি আর কিসেরই দেওয়াল সেটাও জানিনা। তবে সৈকত মুখে কিছু না বললেও বাবাকে যে অনেক ভালবাসে তা বুঝতে পারি কিন্তু ও সেটা নিজে মুখে কখনও স্বীকার করে না।  

ওর ব্যবহারে কোন রকম কষ্ট পাস না যেন।


মেঘ চুপচাপ শুনতে থাকে।  

 

একটু পরই ডলি(মেজ ভাবী )এসে বড় ভাবীর কে বললো ভাবী আমি একটু বেরোচ্ছি।  

—আজ আবার কোথায় যাচ্ছিস। 

—আর এক বান্ধবীর সঙ্গে দেখা করার কথা । তারপর কিছু কেনাকাটা আছে। 

—আচ্ছা আজ না গেলে হয় না?

—কেন??

—মেঘ এ বাড়িতে নতুন বউ হয়ে এসেছে আজ না হয় একে একটু সময় দে। 

—কি যে বলোনা ভাবি । ওকি পালিয়ে যাচ্ছে নাকি ও তো থাকছেই । 

—আচ্ছা আর বলতে হবে না তুই যা। 

ডলি চলে গেল। 


ডলি বাড়ির মেঝ ছেলের বউ হলে কি হবে এমন ভাবে চলাফেরা করে মনে হয় সে এ বাড়িরই মেয়ে । একটু বেশী মর্ডান।  যখন যা মন চায় তখন সেটা করে ।বন্ধু আর বান্ধবীদের নিয়ে বেশি সময় কাটাই । আজ এ পার্টি কাল ও পার্টি আজ এর জন্মদিন কাল ওর জন্মদিন এসব নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করে সে। 


আর রোজি তার কোন তুলনা নেই। বড় বউ হিসাবে তার যা করার দরকার তার থেকে বেশি করে ।  সকালে ঘুম থেকে উঠে রাতে ঘুমাতে যাবার আগ পর্যন্ত সে এ বাড়ির  সবকিছু দেখাশোনা করে ।  তার নিজের হাতে তেমন কাজ না করতে হলেও পুরোবাড়ির সব দায়িত্ব একরকম তার উপর । কাজের লোকদের সব বুঝিয়ে দেওয়া। কি করতে হবে কি না করতে হবে সে সবটা নিজে দেখিয়ে দেয় । 

যাকে এক কথায় বলা চলে আর্দশ বউ। 


মেঘ বসে সৈকতের কথা ভাবতে থাকে।  

হঠাৎ  রোজির ডাকে তার ভাবনার ছেদ পড়ে এই নে দুজনের নাস্তা সাজিয়ে দিয়েছি নিয়ে দুজনে খেয়ে নে। 


মেঘ নাস্তার ট্রে হাতে নিয়ে আচ্ছা বলে সেখান থেকে উপরে নিজের রুমে চলে আসে।  

রুমে ঢুকে দেখে সৈকত কাত হয়ে ঘুমিয়ে আছে।  ঘুমের মধ্যে মাথাটা বালিস থেকে পড়ে গেছে।  

মেঘ দুরে দাড়িয়ে অনেকক্ষন সময় নিয়ে একদৃষ্টিতে সৈকতের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।  


সৈকতের ফর্সা গায়ের রঙ । 

রাত জাগার  জন্য চোখের নিচে একটু কালো হয়ে গেছে। ঠোট দুটো বাচ্চাদের মতো লাল । চুল গুলো এলোমেলো হয়ে আছে।  মুখে কেমন যেন বিষণ্ণতার ভাব। 


মেঘের মনে সৈকতের জন্য যে রাগ ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল বিয়ের দিন থেকে তা যেন একনিমিষে কোথায় উধাও হয়ে গেল। মেঘ আস্তে করে সৈকতের কাছে গিয়ে দুহাতে মাথাটা বালিসে তুলে দেয়। মেঘের ইচ্ছে করছে সৈকতের কপালে একটা আদর দিতে কিন্তু সৈকত যদি জেগে যায় তাহলে কি ভাববে!!এই ভয়ে চুপ করে সরে আসে।  


হঠাৎ মেঘের ফোনটা বেজে ওঠে--------


                                         ৩.

মেঘ ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে তার আম্মু ফোন দিয়েছে। সৈকতের ঘুমের যাতে কোন সনস্যা না হয় এ জন্য ফোনটা হাতে নিয়ে বেলকনিতে চলে যায় ।মেঘ ফোনটা রিসিভ করে সালাম দিয়ে 

—কেমন আছো আম্মু তোমরা ?

—আমরা ভাল আছি তুই কেমন আছিসরে মা?

—আমিও খুব ভাল আছি। 

—সত্যি করে বলতো তোর কোন অসুবিধে হচ্ছে নাতো ওখানে। 

—না আম্মু কোন অসুবিধা হচ্ছে না। এ বাড়ির সবাই খুব ভাল । সবাই আমাকে খুব আদর করছে। 

—আর জামাই??

 মেঘ তার আম্মুর এমন প্রশ্নে একটু থতমত খায় । একটু সময় নিয়ে বলে হ্যাঁ  আম্মু তোমার জামাই ও ভাল খেয়াল রাখছে আমার । 

—তুই সত্যি বলছিস তো??

—হু,তুমি এসব নিয়ে চিন্তা করো না।  

—কিন্তু আমার মন কেন যেন অন্য রকম লাগছে।নিজের বিয়ের দিন যে ছেলে বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে যায় সে কেমন কি করছে বা করবে কিছু বুঝতে পারছি না।  

—আচ্ছা এসব বাদ দাও আব্বু আর ভাইয়া কেমন আছে বলো?

—ভালো আছে। রাজু(মেঘের বড় ভাই) তোকে নিয়ে একটু চিন্তায় আছে।  তোর আব্বুর সাথে একটু রাগারাগি করছে । 

—কেন!!?

—এই যে হুট করে বড় ঘর দেখে ছেলের সম্পর্কে কোন রকম খোজখবর না নিয়ে  তোকে বিয়ে দিয়ে দিল তাই।রাজু আর আমি তোর আব্বুকে সেদিন অনেক করে বুঝিয়েছিলাম তাড়াহুড়া  করে কোন কাজ করতে নেই। কিন্তু তোর আব্বু কোন কথাই শুনলো না।বিয়ের দিন সৈকতের ওভাবে লাপাত্তা হয়ে যাওয়া রাজুকে ভীষণ ভাবাচ্ছে। 


—তুমি ভাইয়াকে দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ কর। তুমি তো জানোই ভাইয়া আমাকে কতটা ভালবাসে  তাই এরাকম ভাবছে। 

ভাইয়া কোথায় তুমি ফোনটা ভাইয়ার কাছে দাও আমি কথা বলছি। 

—ও বাসায় নেই। একটু আগে কোথায় যেন বেরিয়েছে। 

—ঠিক আছে তুমি ভাইয়া আসলে বলো আমাকে নিয়ে যেন দুশ্চিন্তা না করে আমি ভাল আছি। আর আমিও সময় করে ভাইয়াকে ফোন দিব।  

—ঠিক আছে। 

—তুমিও আর চিন্তা  করো না। খাওয়া দাওয়া ঠিকমত করো আর আব্বুর খেয়াল রেখ। এখন রাখছি। 


ফোনটা কেটে পিছন ফিরতেই দেখে সৈকত ঘুম ভেঙ্গে চোখ বড় বড় করে থমথমে মুখে মেঘের দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে সিংহ  তার শিকার ধরার জন্য ওত পেতে বসে আছে। 


মেঘ ফোনটা টেবিলের উপর রেখে বললোঃ

—এত তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙ্গে গেল??

—এই তোমার সমস্যা কি বলোতো ??(রেগে)

—কই আমার কোন সমস্যা নাই তো!!?

—আমি যখনই কোন কাজ করি তখনই তুমি আমাকে বিরক্ত করছো। 

—আমি!!?কই কখন!!?

—এই যে আমি এখন ঘুমাচ্ছিলাম তোমার কি দরকার ছিল এ রুমে আসার ,আসছো ভাল কথা ফোনটা আনার কি দরকার?

—মানে কি!!আমি এ রুমে আসবোনাতো কোন রুমে যাবো?আর ফোন না আনলে কথা  বলবো কি করে?

—গতকাল রাতে তোমাকে কিছু বলি নাই, শোন আজ থেকে তুমি আর এ রুমে আসবে না। আমি চাইনা আমার রুম কেউ শেয়ার করুক। এ বাড়িতে অনেক গুলা খালি রুম পড়ে আছে তুমি সেগুলোর মধ্যে যে কোন একটা ব্যবহার করতে পার,কেউ নিষেধ করবে না।  


সৈকতের কথার কোন মানে বুঝতে পারল না মেঘ। একটু রেগে গেলঃ

—এই শুনুন আমি আপনার বিয়ে করা বউ । আপনার নিজের যেসব জিনিস আছে তাতে আমারও এখন অধিকার আছে । আগে এ রুমটা আপনার একার ছিল কিন্তু এখন এতে আমার ও ভাগ আছে সো এটা নিয়ে আর কথা বলবেন না। 


—হ্যা বউ । এ জন্য অন্য রুমে থাকার কথা বলছি বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথাতো আর বলিনি।  


 মেঘ মনে মনে আপমান বোধ করলো সৈকতের কথায়ঃ

—তাহলে বিয়ে করার কি দরকার ছিল?

না করলেই পারতেন।

—চাইনি করতে । জোর করে ধরে করানো হয়েছে।  


মেঘ একটু ঠোঁট  বাকিয়ে হাসি দিয়ে বললোঃ

—কাউকে জোর করে আবার বিয়ে দেওয়া যায়??


সৈকত মেঘের মুখের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভেবে কন্ঠটা নরম করে বললো তাহলে তুমি কেন করেছো??

—আমি তো......বলে মেঘ থেমে যায়। 

—কি বলো ,তুমি কি??থামলে কেন!!?


মেঘ মনে মনে ভাবে নিজের বলা কথাই নিজেই ফেসে গেলাম।সত্যিতো মেঘ নিজেও  এ বিয়েতে রাজী ছিল না।  অনেকটা না পুরোপুরি ভাবে তার বাবার জোরাজুরিতে সে বিয়েটা করেছে।  


—চুপ হয়ে কি ভাবছো??আচ্ছা আমি বলি,তুমি নিজেওতো এ বিয়ে করতে চাও নি ,তাহলে কেন করলে?নিশ্চয়  তোমার বাবা মার কথায় তাই না??আসলে এ বিয়েটা করতে তোমাকেও একরকম জোর করা হয়েছে সেটা হয় মেনটালি আর নয় ইমোশনালি। 


মেঘ কোন কথা বলে না চুপ করে সৈকতের বলা কথা শুনতে থাকে। 

—কি ,আমি  ঠিক বললাম তো??আর এটাই হচ্ছে জোর জবরদস্তি করে বিয়ে দেওয়া । আর আমার সাথেও তেমনটাই করা হয়েছে। বলতে গেলে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। 

—তাহলে কি আপনি আপনার বোঝা?

—না ,তুমি আমার বোঝা নও। 

—তাহলে??

—আমি তোমাকে বোঝা মনে করতাম তখন যখন আমি তোমাকে মেনে নিয়ে স্তীর অধিকার দিতাম। আর যেহেতু আমি তেমন কিছু করিনি তাই তুমি স্বাধীন । 


সৈকতের কথা শুনে মেঘ বিস্ফারিত চোখে সৈকতের দিকে তাকিয়ে বলেঃ

—তার মানে!!কি বলতে চাইছেন?

—এই তুমি কি দুধের বাচ্চা যে আমার বলা সহজ কথা তুমি বুঝতে পারছো না?

আমি যেহেতু এ বিয়েটা নিজের ইচ্ছায় করি নি তাই তোমার প্রতি আমার নিজের কোন দায়-দায়িত্ব  নেই। তোমার যখন যা প্রয়োজন এ বাড়ির লোকের কাছে বলবে তারা তোমার সব প্রয়োজন পূরণ করে দিবে।  


সৈকতের  এসব উল্টোপাল্টা কথা শুনে মেঘের মনে মনে খুব রাগ হচ্ছে ।রোজি ভাবির মুখে বলা কথা গুলো শোনার পর সৈকতের উপর থেকে মেঘের রাগটা অনেকটা কমে গিয়েছিল কিন্তু এখন এসব শোনার পর প্রথম রাতে যতটুকু রাগ হয়েছিল তার তিন গুন বেশি রাগ হচ্ছে। 

সৈকত মেঘের দিকে তাকিয়ে বলেঃ

—কথা গুলো শোনার পর তোমার খুব রাগ হচ্ছে তাই না??

—না রাগ হবে কেন আমার এখন খুশিতে ধেইধেই করে নাচতে ইচ্ছে করছে। 


সৈকত মুচকি হেসে বললোঃ

—তাহলে নাচ আমিও একটু দেখি।

 

কথাটা শুনে মেঘের মেজাজ আর খারাপ হয়ে গেল। 

আমি জানি তোমার খুব রাগ হচ্ছে আর এ জন্যই তুমি তোমার দুপায়ের আঙ্গুল এমন করছো।  

সৈকতের কথা শুনে মেঘ নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে দু’পায়ের বৃদ্ধাআঙ্গুল নাড়ানো বন্ধ করল। 

মেঘ রাগ ভুলে অবাক হয়ে বললোঃ       —আপনি কি করে বুঝলেন যে রাগ হয়েছে বলেই আমি পা এমন করছিলাম। 


সিক্স সেন্স বললো। মানুষের যখন অতিরিক্ত রাগ হয় তখন তার শরীর অটোমেটিক কোন না কোন ভাবে সেটা কন্ট্রোল করেতে চাই আবার তা প্রকাশ করে । তোমার রাগ হলে তুমি পায়ের আঙ্গুল গুলে এরাকম কর।  


সৈকত যেটা বললো সেটা হান্ডেড পারসেন্ট সত্যি কথা। মেঘের খুব বেশি রাগ উঠলে মেঘ পায়ের আঙ্গুল দিয়ে মাটি খোড়ার মত করে । সেটা হোক ফ্লোর বা বিছানায় যখন যেমন থাকে সেখানেও সে এরকম করে।


—এখন যাও আমি ঘুমাবো। 

—ঘুমাবেন মানে!নাস্তা করবেন না??

—না তুমি যাওতো। (বিরক্তি নিয়ে)

—তাহলে আমি এখন কোথায় যাবো??

—সেটাও কি আমি বলে দিব!?যেখানে খুশি যাওনা এবাড়িতে এখনও তোমার অনেক কিছু দেখার বাকি আছে সেগুলো দেখ। 

—আর আমি যে আপনার জন্য নাস্তা নিয়ে আসলাম সেটার কি হবে?

—খাবনা নিয়ে যাও। আমার খাওয়ার  সময় হলে আমি অন্য কাউকে ডেকে খাবার নিয়ে আসতে বলবো । এখন যাও। 

—মেঘ আর কথা না বাড়িয়ে মুখ কালো করে নাস্তার ট্রে নিয়ে দরজা পর্যন্ত আসতেই

—এই শোন

মেঘ ভাবে মনে হয় সৈকত নাস্তা করবে তাই থামতে বলছে। মেঘ মনে মনে খুশি হয় কারণ ও নিজেও তো এতক্ষন না খেয়ে বসে আছে।  অবশ্য ক্ষুদাটা অনেক আগেই লেগেছে কিন্তু সৈকতের জন্য না খেয়ে অপেক্ষা করছিল। কেউ কিছু মনে করুক আর না করুক নতুন বিবাহিত স্বামী-স্তী এক সাথে বসে খাবার খাবে এটা দেখতে ভাল লাগে।মেঘের মনে অনেক ছোট ছোট স্বপ্ন  ছিল বিয়ের পর দুজনে বসে খাবে মাঝে মাঝে একে অন্যর মুখে তুলে খাইয়ে দিবে -----


—জ্বী বলুন। 

—তোমার ঐ সাইরেন টাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাও।  

—মানে??সাইরেন আবার কি??

সৈকত চোখ দিয়ে ইশারা করে বলে ওই যে ওটা। 

মেঘ তাকিয়ে দেখে সৈকত ফোনকে সাইরেন বলছে।  

—আপনি এটাকে সাইরেন কেন বললেন?

—তাহলে কি বলবো?সময় নেই অসময় নেই পু করে বেজে ওঠে । কি দরকার এসব ঝামেলা সঙ্গে রাখার ??

—আপনি সবসময় সবকিছুকে এত ঝামেলা মনে করেন কেন??এটা না থাকলে বর্তমান সময়ে মানুষকতটা অসহায় সেটা জানেন না ??

—হুম অসহায় না ছাই। মানুষ যে একটু শান্তি মতো ঘুমাবে ,খাবে,কারো সঙ্গে বসে কথা বলবে তার কোন উপায় নেই এটা এমন একটা চিজ যে অলটাইম কোন না কোন কাজে বাগড়া দিবেই।  

—কেন মনে হচ্ছে আপনি ফোন ব্যবহার করেন না?

—না ,করি না। কারণ ওটা ব্যবহার করার আমার দরকার  হয়না। যদি আমাকে কখনও কারো দরকার হয় তাহলে ঠিক সে আমাকে খুজে বের করবে। আগের দিনের যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা ভুলে গেছ। 


মেঘ রুমের চারপাশটা ভাল করে তাকিয়ে দেখে সত্যি রুমে কোন ফোন বা টেলিফোন লাইন ও নেই । সৈকত তাহলে সত্যিই কোন ফোন ব্যবহার করে না।  

মেঘ ফোনটা হাতে নিয়ে বের হওয়ার আগে সৈকতের দিকে তাকাই। 

সৈকত কোন কথা না বলে শুইয়ে পড়ে।  


মেঘ দরজা টেনে দিয়ে বাইরে চলে আসে। ————**——**——**————


মেঘ ,এই মেঘ 

মেঘ চোখ মেলে তাকাতেই দেখে রোজি তার পাশে দাড়িয়ে আছে। 

মেঘ তাড়াতাড়ি করে আধশোয়া  থেকে উঠে বসে। 

—তুই এখানে স্টাডি রুমে আর আমি তোকে সারা বাড়ি খুজে আসলাম। সৈকতের কাছে জিঙ্গাসা করলাম ও বললো জানে না।  

—আসলে ভাবি এখানে এসে বই পড়ছিলাম তারপর  কখন যে চোখটা লেগে গেছে বুঝতে পারিনি।  

—চল হাতমুখ  ধুয়ে খেয়ে নিবি। সৈকত ডাইনিংয়ে বসে অপেক্ষা করছে। 


সৈকতের ডাইনিংয়ে বসে অপেক্ষা করার কথা শুনে মেঘ একটু অবাক হল। মনে মনে ভাবে সত্যিই কি উনি আমার জন্য অপেক্ষা করছে নাকি অন্য কিছু। 

—কিরে চল। 

—হ্যা ভাবি চলুন। 


হাতমুখ ধুয়ে ডাইনিংয়ে আসতেইঃ

—কি ব্যাপার কোথায় ছিলে সারা বাড়ি খুজেও নাকি তোমাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। 

—স্টাডি রুমে । 

—ওও


রোজি এসে বললোঃ

তাহলে তোরা খেয়ে নে আমি অনি কে ঘুম পড়িয়ে দিই। আর কোন কিছুর দরকার হলে মন্জু(কাজের মেয়ে)কে  ডাকিস। 


মেঘ হ্যা সূচক ঘাড় নাড়ায় ।  


মেঘ সৈকতের প্লেটে খাবার তুলে দেয়।  

—কি হল তুমি নিচ্ছ না কেন?

—আপনি খেয়ে নিন আমি পরে খাচ্ছি। 

—কেন আমার সঙ্গে বসে খেতে কোন সমস্যা?

—না। 

—সকাল থেকে না খেয়ে বসে আছো কেন?


মেঘ চমকে চোখ তুলে তাকাই সৈকতের দিকে। 

অবাক হওয়ার কিছু নেই। ওখানে সকালের সে নাস্তার ট্রেটা দেখলাম তাতে দুজনের নাস্তা ছিল । আমি তো তখন বলেছিলাম খাবনা তাহলে তুমি কেন না খেয়ে বসে ছিলে?

—কেন না খেয়ে ছিলাম সেটা আপনি জানেন না!??

—এরপর থেকে আর এরাকম করবে না। আমার খাওয়ার কোন ঠিক ঠিকানা নেই।  

—এ কথাটা সকালে বলে দিতে পারতেন। তাহলে আর অপেক্ষা করতাম না। অনেকটা অভিমানের সুরে কথাটা বলে মেঘ। 

—বর্তমান যুগের আধুনিক মেয়ে হয়ে তুমি যে ,সেকেলে মা চাচীদের মতো পতিভক্তি দেখাবে তাতো বুঝতে পারিনি । 

—মানে!!?

—মানে তেমন কিছু না। ঐ যে তোমার সাইরেন বাজতে শুরু করেছে এখন তোমার খাওয়া টাও ঠিক মত হবে না। 


মেঘ এবার বুঝলো যে কেন সৈকত তাকে পতিভক্তির কথা বললো। 

মেঘ মুচকি হাসি দিয়ে বললো আপনি খেয়ে নিন ভাইয়া ফোন করেছে একটু কথা বলি। 


সৈকত একটা হাসি দিয়ে মাথা ঝাকায় । 


মুহূর্তের মধ্যে মেঘের মনে হয় মানুষটা এমন কেন এই চেনা এই অচেনা----------


                                  


#পর্বঃ২


মেঘ অল্প কথা বলে ফোনটা কেটে দিয়ে ডাইনিংয়ে এসে দেখে সৈকত খেয়ে চলে গেছে। সৈকত কে না পেয়ে একটু মন খারাপ হয়ে যায় মেঘের । যে মানুষটার জন্য সে এতক্ষন না খেয়ে অপেক্ষা করেছিল আর সে একটুখানি সময় তার জন্য অপেক্ষা না করে নিজের মত নিজে খেয়ে চলে গেল!!

মনে মনে ভীষন রাগ হয় মেঘের । 

রাগটা সৈকতের উপর না। সৈকতের দেওয়া ওই সাইরেন নামক যন্ত্রটার উপর। ফোনটা আসার আর সময় পেল না।

 

দ্বীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে কি আর করা!!? কপালগুনে এমন হাড়বজ্জাত বর জুটেছে তা না হলে একটু হলেও বউয়ের কথা ভাবতো।  

মেঘ চেয়ার টেনে বসেই খাবার নিতে গিয়ে দেখে সৈকত তার  প্লেটের সব খাবার না খেয়ে কিছুটা রেখে গেছে।মেঘ ওর মায়ের মুখে শুনেছিল স্বামী-স্ত্রী একই প্লেট আর একই গ্লাসে পানি খেলে নাকি ভালবাসা বাড়ে। তাছাড়া আমাদের শেষ নবী ও তার ছোটবিবি আয়েশা সিদ্দীকা ওতো একই প্লেট আর একই গ্লাসে খেতেন।মা আয়েশা গ্লাসের যেখানে মুখ লাগিয়ে পানি পান করতেন আমাদের প্রিয় নবী ও ঠিক সেখানে তার ঠোঁট  লাগিয়ে পানি পান করতেন। 

এইভেবে মেঘ সৈকতের রেখে যাওয়া প্লেটের বাকি খাবার টুকু খায় আর ভাবে তার হাতের খাবার তো খেতে পারলাম না ,তবে তার হাতের স্পর্শের খাবার সে খাচ্ছে । পরম তৃপ্তি নিয়ে মেঘ খাবারটুকু খেয়ে নেয় ।

রাত থেকে এ পর্যন্ত না খেয়ে একটু বেশি ক্ষুধা অনুভব কিন্তু এই টুকু খাবার খেয়েই যেন মেঘের আর খাবার খেতে ইচ্ছা করেনা।  মনে হচ্ছে এটুকুতেই তার পেট ভরে গেছে।  


খাবার টা শেষ করে মেঘ রুমে চলে আসে।  

দরজা খুলতেই খুক খুক করে কেশে ওঠে। কাশিটা এমনি নয় । মেঘ সিগারেটের  ধোয়া সহ্য করতে পারে না।  


সৈকত রুমের বেলকনিতে দাড়িয়ে সিগারেট  টানছিল হঠাৎ মেঘের কাশি শুনে সিগারেট  টা আস্তে করে ফেলে পা দিয়ে আগুনটা নিভিয়ে দেয় । 


মেঘ কাছে গিয়ে বলেঃ

— আপনি আর এ রুমের মধ্যে সিগারেট টানবেন না। 

—রুমে না বেলকনিতে । 

—কিন্তু বাতাসে সব ধোয়া রুমে আসছে। 

—তাতে তোমার কি??

—আমার কি মানে !!আমি সিগারেটের  ধোয়া সহ্য করতে পারি না। 

—সহ্য করতে পার না যখন আসছো কেন?আমি তোমাকে নিষেধ করেছি না এ রুমে আসতে। (বিরক্ত হয়ে)

—বললেই হলো না!?দরকার হলে আপনি অন্য রুমে যান আমি যাবো না। 

—আমি কেন অন্য রুমে যাবো!!?এটা আমার রুম। 

—এতদিন আপনার ছিল কিন্তু এখন থেকে এটা আমার । 

—উড়ে এসে জুড়ে বসা । এত বছর আমি এ রুমে আছি আর এখন বলছো এটা তোমার রুম!!

—উুহ অসহ্য!!

—কি?

—আপনি। 

—তাহলে আছো কেন?

—কি করবো?

—চলে যাও। 

—উপায় নেই। 

—কেন?

—কবুল বলে ফেলেছি যে তাই। 

—তাতে কি!!?তুমি চাইলে সেটা শুধরে নিতে পারো। 

—মেঘ উৎসুক হয়ে বলে কি ভাবে?

—কবুল এর বিপরীত কথা টা বলে। 

—মানে?

—মানে!?আচ্ছা থাক এসব ছাড়ো। আমাকে একটা কথা বলো। 

—কি কথা?

—তোমার কোন লাভার আছে?আই মিন তোমার ভালবাসার  মানুষ যাকে তুমি ভালবাসো??


মেঘের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায় সৈকতের এমন কথা শুনে। 

—কি হলো বলো??

মেঘ সৈকতের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত ভাবে বলেঃ

—না নেই। 

—কি বলছো!!?এটাও আমাকে বিশ্বাস করতে হবে যে তোমার মত সুন্দরী একটা মেয়ের কোন বি এফ নেই বা ছিল না!!?

—হুম এটাই সত্য । কিন্তু হঠাৎ  আপনি এমন  প্রশ্ন কেন করলেন??

—এমনি। 

—আপনি যে কোন কারণ ছাড়া কোন কথা বলেন না সেটা আমি বুঝে গেছি। 

—হা হা হা।  

—হেসে কথা ঘুরানোর চেষ্টা করবেন না।  

—আমি কেন কথা ঘুরাবো?

—তাহলে বলুন কেন জিঙ্গাসা করলেন ?

—জানতে ইচ্ছে হল তাই। 

মেঘ সৈকতের কাছে দু’পা এগিয়ে  এসে বলে চোখের দিকে তাকিয়ে বলে আর কিছু জানতে ইচ্ছা হয় না??


সৈকত তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ মেঘের গভীর কালো চোখের দিকে । সৈকতের মনে হয় সৈকত যেন হারিয়ে যাচ্ছে গভীর কোন তলদেশে জড়িয়ে পড়ছে গভীর কোন মায়ায় । 

সৈকত তাড়াতাড়ি করে চোখ সরিয়ে বলে  আর কি হচ্ছে হবে!!?আর কিছু জানার ইচ্ছা নেই। 


মেঘ নিজেও হারিয়ে গিয়েছিল সৈকতের চোখের গভীরে । মানুষ মিথ্যা বলে কিন্তু মানুষের চোখের ভাষা কখনও মিথ্যা বলে না। মেঘ সৈকতের চোখে অনাবিল ভালবাসার  সন্ধান পেয়েছে।  দেখেছে সৈকতের চোখে ভালবাসার ছায়া কিন্তু ----------


হঠাৎ  ঝিনুকের কন্ঠে মেঘ সব ভুলে যায়। 


—দরজা খোলা আছে ভিতরে এসো। 

মেঘ সৈকতের দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হেসে স্বাভাবিক হয় । 


সৈকত কিছু না বলে ঘুরে বেলকনির রেলিং ধরে দাড়িয়ে দূর আকাশ পানে তাকিয়ে থাকে। 


—ভাবি ডিস্টার্ব করলাম??

—আরে না!!ডিস্টার্ব কেন হবো?

—না মানে এই সময় । 

—তাতে কি?বল কি বলবে?

—আসলে আমার কিছু ফ্রেন্ড এসেছে তোমাকে দেখতে সবাই অপেক্ষা করছে তাই তোমাকে ডাকতে এলাম। 

—ছেলে ফ্রেন্ড না মেয়ে ফ্রেন্ড??

—কি যে বলো না ভাবি গালর্স কলেজে ছেলে ফ্রেন্ড আসবে কোথা থেকে?

—ওহ সরি। আসলে কিছু মনে করো না। আমি প্রশ্নেটা অন্য কারণে করেছি। তুমি যাও আমি দু মিনিটে আসছি। 

—ওকে ভাবি। 


ঝিনুক চলে যেতেই সৈকত আড়চোখে তাকিয়ে  দেখে মেঘকে। 

মেঘ নিজের শাড়ি টা ভাল করে গুছিয়ে নেয় । তারপর মাথায় শাড়ির সাথে ম্যাচ করে তার লাগেজ থেকে একটা হিজাব বের করে সেটা মাথায় পরে নেয় ।মেঘ এমনিতে খুব সুন্দরী কিন্তু হিজাবে পরে আগের থেকে আরোও বেশি কিউট আর সুন্দর দেখাচ্ছে।  


মেঘ গুছিয়ে দরজা খুলে বের হতেই শাড়ির আচলে একটু টান খায় । 

মেঘের মুখ লজ্জায় লাল হয়ে যায় সৈকতের দুষ্টামি ভেবে।  

মেঘ পিছন না ফিরে বলেঃ

—কি করছেন ছাড়ুন??

তবুও যখন ছাড়ছে না তখন পিছন ফিরে দেখে শাড়িটা দরজার হুকে বেধে আছে। আর সৈকত বেলকনিতে দাড়িয়ে ওর দিক তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে আর দু’হাত নাড়িয়ে ঘাড়টা এদিক ওদিক নাড়িয়ে বোঝাল যে সে একাজ করে নি। 


মেঘ নিজের বোকামির কথা মনে করে আরো বেশি লজ্জা পেল।তাড়াতাড়ি শাড়িটা ছাড়িয়ে নীচে নেমে এলো। 


ঝিনুকের ফ্রেন্ডসদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে সন্ধ্যা  হয়ে গেল তারা বিদায় নিয়ে চলে গেল । 

ততক্ষনে অফিস শেষ করে সবাই বাসায়

চলে এসেছে  ।সারাদিন বাড়িটা যত নিরিবিলি থাকে সবাই বাসায় ফিরতেই বাসার পরিবেশটা অন্য রকম হয়ে যায় । 

সবাই এক সঙ্গে মিলে চা কফি খাওয়া গল্প ,হইহুল্লোড় করা। সবাই যখন হল রুমে বসে চা খাচ্ছে তখন মেঘ কিচেনে গিয়ে রোজির সাথে নাস্তা তৈরির কাজে হাত লাগায় রোজিকে সাহায্য  করে । 

রোজি নাস্তার ট্রে টা সবার সামনে এনে রাখে 

—এই নাও সবাই চিকেন পাকড়া খেয়ে বলো কেমন হয়েছে। 


বড় ভাই,মেঝ ভাই ,ঝিনুক একসঙ্গে বলে চিকেন পাকড়া ওয়্যাও। 


কে কয়টা খেতে পারে শুরু হয়ে গেল কাড়াকাড়ি।  সবাই মুখে দিয়ে বললো উুহ যা টেস্টি হয়েছে না লা জবাব। 

হঠাৎ চৌধুরী সাহেবের আগমন ঘটল। 

সবাই বেশ অবাক হয়ে গেল কারণ সাধারনত উনি এত তাড়াতাড়ি বাসায় আসেন না । তার বাসায় ফিরতে দশটা না হয় এগারোটা বাজে। 


এতক্ষন যে হইচইপূর্ণ  পরিবেশ ছিল সেটা  থেমে গেল সবাই চুপ চাপ খাচ্ছে কারো মুখে কোন কথা নেই। মেঘ বুঝতে পারল যে তার শ্বশুর আসায় সবাই এতোটা চুপ হয়ে গেছে। 

মেঘ শ্বশুরের কাছে এগিয়ে গিয়ে সালাম দিয়ে ভালমন্দ জিঙ্গাসা করে হাত থেকে কোট টা নিয়ে তাকে বসতে বললো। 


চৌধুরী সাহেব সবার সঙ্গে হলে রুমে বসলেন । মেঘ চা করে এনে সঙ্গে কিছু পাকড়া ও দিল। চৌধুরী  কোন কথা না বলে খেতে শুরু করলেন। এতে সবাই আরো বেশি অবাক হল। কারণ উনি এসব ভাজাপোড়া পচ্ছন্দ করেন না আর সবচেয়ে বড় কথা উনি নেতা হবার পর থেকে কখনও এভাবে নিজের পরিবারের সঙ্গে বসে সন্ধ্যায় এত তাড়াতাড়ি ফিরে এক সঙ্গে নাস্তা করেন নি। 

সবার মুখে বিস্ময়ের ছাপ। কিন্তু কেউ সেটা মুখ ফুটে বলতে পারছে না।  


উনি পাকড়া গুলো সব শেষ করে বললেন নিশ্চয় মেঘ মা বানিয়েছে?

রোজি হাসি মুখে এগিয়ে এসে বললো হ্যা বাবা মেঘ নিজের হাতে সব করেছে।  

চৌধুরী সাহেব বললঃ

—আজ অনেক বছর পর সেই স্বাদ আবার মুখে পেলাম। তোমার শ্বাশুড়ী মা যখন বেচে ছিল তখন প্রায় সে এটা বানাতো তারপর আর খাওয়া হয়নি। এত বছরে ভুলতে বসে ছিলাম সেই স্বাদটা কিন্তু আজ তোমার হাতের টা খেয়ে সেই স্বাদ ফিরে পেলাম। 

মেঘ বুঝলো তার শ্বশুরের অতীতের স্মৃতি  মনে পড়েছে।তাই তার গলাটা ভারী হয়ে গেছে। হয়তো চোখটা ছলছল করছে।  


মেঘ বুঝলো আসলে সবাই যে এই মানুষ টাকে এত ভয় পায় হয়তো সেটা তার এই বাহ্যিক আচারন আর মুখের গাম্ভীর্য দেখে । কিন্তু তার মনটা এখনও সেই বাচ্চাদের মতই আছে। হয়তো বড় নেতা  হয়েছেন বলেই নিজের মনের ভাব নিজের আবেগ ,ভালবাসা কাউকে বুঝাতে পারেন না বা বুঝানোর চেষ্টা করেন না ।  লোকে শুনলে কি বলবে কি ভাববে হয়তো এই জন্য!!


—কি ভাবছো মা??


শ্বশেরের কথায় মেঘের ঘোর টা কেটে যায়। 

—না ,বাবা তেমন কিছু না। 

—এতো ভাল করে পাকড়া করে খাওয়ালে এখন বল আমার কাছে তোমার কি চাই। 


মেঘ  তার শ্বশুরের কাছে এসে বলে আমার কিচ্ছু চাইনা বাবা শুধু তোমার এ মেয়েটার জন্য দোয়া কর ।  


চৌধুরী মেঘের মাথায় হাত রেখে বলে আমার দোয়া সবসময় তোমার সাথে থাকবে ।  


মেঘ যেন নিজের বাবার হাতের ছোয়া খুজে পায় । নিজের বাবা মা আর ভাইয়াকে খুব মিস করতে শুরু করে । 


রোজি এসে মেঘের কাধে হাত রেখে বলেঃ

—কি রে বাড়ির কথা খুব মনে পড়ছে তাই না??

—হুম। 

চৌধুরী সাহেব বলে সৈকত কোথায় ?

মেঘ মাথা নিচু করে বলে ও ঘরেই আছে। 


হঠাৎ  না ভাবি ভাইয়া তো একটু আগে বেরিয়েছে । 

—কখন?

—তুমি তখন কিচেনে ছিলে। 

—ও

মেঘের মন কিছুটা খারাপ হয়ে যায় । ভেবেছিল নিজের হাতের বানানো চিকেন পাকড়া আর চা দিয়ে আসবে উপরে কিন্তু তা আর হলো না। 


চৌধুরী সাহেব উঠে মেঘের কাছে এসে বলে মেয়ের বাবারা তার মেয়েকে জামাইয়ের হাতে হাত দিয়ে বলে তার মেয়েটাকে দেখে রাখার জন্য । আর আমি আজ তোকে বলছি আমার খামখেয়ালি আর বদমেজাজি ছেলেটাকে তুই যে করেই হোক একটু মানুষের মত মানুষ বানিয়ে দে।বলে চোখ মুছে উনি নিজের রুমে চলে যায়।  


বাসার পরিবেশটা মুহূর্তে যেন কেমন ভারী হয়ে ওঠে। 


হঠাৎ করে সৈকত বাসায় ঢোকে । সৈকতের আগে আগে একটা কুকুর দৌড়ে ঘরে ঢোকে ঘেউ ঘেউ শুরু করে দেয় ।  


কুকুর টা ঘেউ ঘেউ করতে করতে মেঘের দিকে ছুটে আসতেই মেঘ ভয়ে চোখ বন্ধ করে চিৎকার  দিয়ে ওঠে।   

সবাই হো হো হেসে ওঠে। হাসির শব্দে কোনরকম একচোখ খুলে  তাকিয়ে দেখে  

ওর থেকে এক হাত দূরে কুকুরটা এসে থেমে গেছে।  সৈকতের হাতে ওর গলার দড়ি টা ধরা। 


মেঘ লাফ দিয়ে পিছনে সরে বলেঃ

 —এ কুকুর এখানে কেন??


(সবাই পাশ থেকে আস্তে আস্তে বলে এইবার শুরু হবে)। 


সৈকত কটমট চোখে মেঘের দিকে এগিয়ে আসে-------------

           

৫.

               


সৈকত মেঘের কাছে এসে বললো এই তুমি কি বললে?

—বললাম এই কুকুরটা এখানে কি করছে?

—এই খবরদার কুকুর বলবে না।(রেগে)

—কুকুরকে কুকুর বলবো নাতো কি গাধা বলবো!!?

—এই এর নাম টমি।আজ থেকে টমি বলে ডাকবে।

—উুহঃ কুকুরের নাম নাকি টমি!!পারবোনা,কুকুরকে কুকুরই বলবো।

—খুব খারাপ হবে বলে দিচ্ছি।

—নতুন করে আর কি খারাপ হবে শুনি?


এই তোরা থামবি!!?ছোট্ট বাচ্চাদের মত ঝগড়া করছিস পাশ থেকে রোজি এগিয়ে এসে বলে।


—আচ্ছা ভাবি তুমি বলো কুকুর কে কেন নাম ধরে ডাকতে হবে?

—এই আবার??(সৈকত রেগে)

—মেঘ চুপ কর।সৈকত যা বলে সেটা বলবি।কারণ আমরা সবাই ওকে টমি বলে ডাকি।সৈকত ওকে ছোট্ট থাকতে এ বাড়িতে এনেছে।ওর টেককেয়ার করা,

খাওয়ানো,ওর সাথে খেলাকরা   সব সৈকতই করছে।তাই দুজনের ভাব খুব গভীর।

টমি বলে ডাকলে যেখানেই থাকুক না কেন দৌড়ে আসে।

—ভাবি আমি কুকুর খুব ভয় পায়।

—টমি কিছু বলবে না।তোকে আজ নতুন দেখছে তাই একটু এরাকম করছে।আস্তে আস্তে  ঠিক হয়ে যাবে।পরে দেখবি তোর সাথেও ওর খুব ভাল বন্ধুত্ব হয়ে যাবে। 


—হলেই ভাল বলে মেঘ সৈকতের  দিকে তাকিয়ে একটু মুখ ভেঙচি দিয়ে রোজির সাথে চলে আসে।


————**——**——**————


রাতের খাবার শেষ করে সবাই যার যার মত ঘুমাতে চলে গেছে।মেঘ রুমে ঢুকতেই চোখ কপালে উঠলো।কি দেখছে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেনা।বিছানায় মেঘের জায়গায় সৈকতের পাশে ঐ কুকুরটা শুয়ে আছে।

—কি হচ্ছে এটা?

সৈকত ম্যাগাজিনের পাতা উল্টাতে উল্টাতে বললোঃ

—কি হচ্ছে!!?কিছুইনা।

—এই কুকুরটা আমার জায়গায় কি করছে?

—এই তুমি আবার ওকে টমি না ডেকে কুকুর বললে?

—আচ্ছা ভুল হইছে।এখন বলেন এটা এখানে কেন?

— ও এখানে থাকবে।

—এখানে থাকবে মানে?আমি কোথায় ঘুমাবো ?

—সকালেই বলছি এবাড়িতে অনেক খালি রুম আছে,যেকোন একটাই গিয়ে শুয়ে পড়।

—না।

—না কেন।

—আমি এখানে ঘুমাবো।পারলে আপনার টমিকে এখান থেকে বিদায় করুন।

—একদমই না। সবসময় টমি আমার সাথে ঘুমায়।গতকাল ওর জীবনে প্রথম ও আমাকে ছাড়া আলাদা শুয়েছিল তাও শুধুমাত্র তোমার জন্য।


মেঘ মনে মনে রেগে ফেটে পড়ছে আর বলছে একটা কুকুরের প্রতি এত ভালবাসা আর নিজের বৌয়ের বেলায়!?ভালবাসাতো দূরে থাক, বলে কিনা তার কোন দায়দায়িত্ব নেই আমার প্রতি!!।


মেঘ কন্ঠটা একটু নরম করে বলেঃ

—দেখুন আমি একা ঘুমাতে পারবোনা আজ।

সৈকত অবাক হয়ে বলে কেন!কি হয়েছে?

—আকাশে মেঘ করছে ঝড়ের মত বাতাস বইছে।এ ঝড় বৃষ্টির রাতে আমি একা শুতে পারবোনা।আমার খুব ভয় করে।


মেঘের কথা শুনে সৈকত হো হো করে হেসে ওঠে।এই তুমি কি বাচ্চা নাকি??

এসব নাটক বন্ধ কর।টমি ঘুমাচ্ছে এখন আমাকেও ঘুমাতে দাও বলে হাত থেকে ম্যাগাজিনটা রেখে পাশ ফিরে শুইয়ে পড়ে।


মেঘ অবাক হয়ে যায় সৈকতের আচারণে।সৈকত মেঘের কথার কোন পাত্তা না দিয়ে নিজের মত শুইয়ে পড়লো।

এদিকে ঝড় বৃষ্টির মাত্রা বাড়তে শুরু করেছে।

মেঘ কি করবে বুঝতে পারছেনা।ভয়ে গুটিয়ে যাচ্ছে তারপর আস্তে পায়ে সৈকতের কাছে যেয়ে বললো আপনি কি ঘুমাচ্ছেন?

এইযে শুনছেন।

তিনবার ডাকার পর সৈকত রাগাম্বিত হয়ে বললোঃ

—কি হয়েছে এত ঘ্যানঘ্যান করছো কেন?তোমার জন্য কি রাতে ঘুমাতেও পারবোনা??

—মেঘ কাপা কাপা কন্ঠে বলে আমার সত্যিই খুব ভয় করছে।

—তুমি যদি মনে করো যে আমি তোমার কথায় ভুলে তোমাকে আমার পাশে ঘুমাতে দেব তারপর তোমার ভয় ভাঙ্গানোর জন্য জড়িয়ে ধরে অন্য দম্পতির মত রোমান্স  করবো তাহলে ভুল ভাবছো।


সৈকত মেঘের কথা না জেনে যে এরাকম কথা বলবে মেঘ ভাবতেও পারেনি।সৈকতের উপর আগে রাগছিল আর এখন তার এ কথায় কেন জানি মেঘের মনে খুব ঘৃণা জন্মনিল।

কারণ একটা মানুষতার অসহায়তার কথা বলছে আর সেকিনা------------

ছিঃ

মেঘ এমনিতে খুব জেদী।সৈকতের এ কথা শোনার পর মেঘের মনে জিদ ভর করলো।আজ যা হয় হবে।নিজের ভয়টাকে আজ সে নিজেই জয় করবে।হয় জিতবে আর না হয়  হারবে।


মধ্যে রাতে বজ্রপাতের শব্দে সৈকতের ঘুমটা ভেঙ্গে গেল।কাছে কোথাও বজ্রপাত হয়েছে শব্দটা খুব জোরেই হয়েছে।হঠাৎ সৈকতের মেঘের কথা মনে পড়ে তাড়াতাড়ি করে বেডসুইচ অন করে লাইট জ্বালিয়ে রুমের চারিদিকে চোখ বুলায়।

না রুমে কোথাও নেই।

তাহলে কি সত্যিই অন্য রুমে গিয়ে ঘুমিয়েছে!?

বসে ভাবে একটু দেখে আসি কোথায় সে।আবার ভাবে কি দরকার?আমি কেন শুধুশুধু তার কথা ভাবছি?

যেখানে ঘুমিয়ে আছে সেখানে ঘুমাক।

এবাড়িতে তার কথা ভাববার অনেক লোক আছে।আমি না ভাবলেও চলবে।


সৈকত উঠে একটু হাটাহাটি করে আর ভাবে তখন ওভাবে কথাগুলো বলা উচিত হয়নি।হতেও তো পারে যে মেঘ সত্যিসত্যিই এই ঝড়বৃষ্টি খুব ভয় পায়।আমি যেমন আগুন দেখলে এখনও ভয় পায় তেমনি কোন কারণে মেঘও হয়তো---

সৈকতের মনের ভিতর কেমন যেন অস্থিরতা কাজ করতে শুরু করে।

না,দাড়িয়ে থাকলে চলবেনা।

দেখে আসি মেঘ কোথায়।সৈকত দরজার কাছে এসে যখনই দরজা খোলার জন্য হাত দিল ঠিক তখনই দমকা হাওয়ায় বেলকনির দরজা খুলে হুপ করে এক ঝাটকা ঠান্ডা বাতাস এসে সৈকতের গায়ে লাগলো।


উুহঃ এই দরজা আবার কে খুলে রেখেছে?আমি নিজেইতো এ দরজা বন্ধ করে ছিলাম।নিশ্চয় এটা ওরই কাজ সব সময় আমার রুমে এসে উল্টাপাল্টা কাজ করে।

একরাশ বিরক্তি নিয়ে বেলকনির দরজা আটকে দিতে এগিয়ে যায় সৈকত।আকাশে থেকে-থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে বৃষ্টির পরিমান একটু কমেছে কিন্তু বাতাসের গতি কমেনি।

হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকানোর আলোয়  সৈকতের মনে হয় বেলকনিতে কিছু একটা ঝাপসা দেখা গেল।সৈকত মনের সন্দেহ দূর করার জন্য লাইট অন করতেই দেখে মেঘ বেলকনিতে পড়ে আছে।


সৈকত ছুটে মেঘের কাছে যেয়ে ডাকতে থাকে।কিন্তু মেঘের কোন সাড়া নেই।সৈকত মেঘের শরীরে হাত দিয়ে দেখে ছিটেআসা বৃষ্টির পানিতে শরীর ভিজে ঠান্ডা হিম হয়ে আছে।মেঘের ঙ্গান নেই।

সৈকত তাড়াতাড়ি করে মেঘকে কোলে তুলে এনে সোফার উপর শুইয়ে দেয়।


সকালে তীব্র মাথাব্যথা নিয়ে হঠাৎ  ঘুম ভেঙ্গে মেঘ নিজেকে আবিষ্কার করে কোম্বলের নিচে সৈকতের বুকের মধ্যে । চোখ মেলতে পারছে না মনে হচ্ছে মাথার শিরা গুলো  ছিড়ে যাচ্ছে।

তারপরও অতি কষ্টে একটু চোখ মেলে দেখে সৈকত ওকে ছোট্ট বাচ্চাদের মত দু’হাতে জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। 

মেঘের রাতের  কথা মনে পড়ে সৈকতর উপর রাগ করে ঝড়ের মধ্য বেলকনিতে গিয়ে দাড়িয়ে ছিল  হঠাৎ দুরে একটা বজ্রপাতের শব্দ হয় তারপর আর মনে নেই। 

মেঘ সৈকতের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে   আর ভাবে কি নিষ্পাপ দেখাচ্ছে ওকে। দেখলে মনে হয় কি শান্ত, বুকের ভিতরটাই ভালবাসায় পরিপূর্ণ  কিন্তু !!সম্পূর্ণ তার উল্টো।

একটুও ভালবাসতে চায় না ,আর ভালবাসা নিতেও চাইনা । 

সবসময় কেমন যেন দুর দুর করে ।

নিজেকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।  

মেঘ দেখে ওর শরীরের রাতের ভেজা কাপড় গুলো পাশে টেবিলের উপর রাখা।  আর এখন সৈকতের একটা টি-শার্ট পরানো। ভাবতেই লজ্জা পায় মেঘ। 

এক অদ্ভুত রকমের ভাল লাগা কাজ করে মনের মধ্যে ।  

আস্তে করে নিজের ঠোঁট টা সৈকতের ঠোঁটে চেপে ধরে ।  


হঠাৎ গরম তাপে সৈকতের ঘুম ভেঙ্গে যায় । সৈকত মেঘের কপালে হাত দিয়ে দেখে জ্বরে মেঘের শরীর পুড়ে যাচ্ছে। সৈকত চোখ বড় বড় করে বলেঃ

—একি তোমার শরীরে তো অনেক জ্বর । 

মেঘ কোন কথা না বলে চুপ করে চোখ বুজে শুইয়ে থাকে।আর ভাবে তার মানে সৈকত বোঝেনি যে তাকে একটা চুমু দিছি। এখন দেখবো সত্যিই তুমি আমাকে মন থেকে ভালবাসো না ঘৃনা করো। 


উুহ হঠাৎ আবার মাথার ব্যথাটা তীব্র থেকে তীব্রতর  হতে শুরু করেছে । মেঘের মনে হচ্ছে সব কিছু কেমন ঝাপসা হয়ে আসছে। মাথার ভিতর ঝিমঝিম করছে।  কানের ভিতরে কেমন ঝিঁ ঝিঁ শব্দ হয়ে চারিদিক টা কেমন নিস্তবদ্ধ হয়ে গেছে। 


————**——**——**————


মেঘ চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে ওর আম্মু ছল ছল চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। মেঘ বুঝতে পারছে না স্বপ্ন দেখছে না সত্যি!!?

—এখন কেমন আছিস মেঘ?

—আম্মু তুমি কখন এলে?

—গতকাল 

—গতকাল!!?

—হ্যা,তুই তো কিছু জানিস না। জানবিই বা কি করে ?আজ দু দিন পর তোর হুশ ফিরলো। 

—কি বলছো?

রোজি কাছে এসে বলে হ্যা সত্যি। তুই তো আমাদের সবাইকে কেমন ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি। 


মেঘ রুমের চারিদিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে যে এ মুহূর্তে ও হাসপাতালের  বেডে শুইয়ে আছে ।  

সবাই এক এক করে ছুটে আসে মেঘের সুস্থতার কথা শুনে। কিন্তু এত মানুষের মাঝেও মেঘের দু’চোখ শুধু একজন কেই খুজছে। কিন্তু তাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।  

—কি রে কাকে খুজছিস?

—কই কাউকে না তো। 

—আমি বুঝিনা মনে হচ্ছে!!সৈকত কে খুজছিস?

—মেঘ লজ্জায় কোন কথা না বলে মাথা নিচু করে থাকে। 

—সৈকত একটু আগে বাসায় গেল। বেচারা! এ দুদিনে খুব খারাপ অবস্থা হয়ে গেছে ওর । 

—কেন ভাবি কি হয়েছে??

—এই দুদিন তো রাত দিন সবসময় ও শুধু তোর পাশে বসে ছিল। ঠিক মত খাওয়া নেই ঘুম নেই। সবাই মিলে অনেক বলে একটু আগে তাকে বাসায় পাঠালাম একটু রেস্ট করার জন্য। 


হঠাৎ মেঘের আম্মু বলেঃ

তুই কপাল গুনে এমন একটা স্বামী পেয়েছিস মা। আমার তো জামাই কে নিয়ে প্রথম দিন থেকে ভয় ছিল । কিন্তু এ দুদিনে সব ভুল ভেঙ্গে গেছে। জামাই যে তোর অনেক খেয়াল করে সেটা বুঝতে পারছি। 

সবার কথা শুনে মেঘের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। কিন্তু সৈকতের উপর অনেক অভিমান জমা হয় । এতট ভালবাসে মনে মনে আবার উপর উপর এমন ব্যবহার করে যে ----------


মেঘের ঙ্গান ফেরার কথা শুনে চৌধুরী সাহেব ছুটে আসে মেঘকে দেখতে । 

খুশিতে তার চোখ দিয়ে দুফোটা অশ্রু ঝরে পড়ে।  মেঘের মাথায় হাত দিয়ে বলে এই বুড়ো বয়সে তো তুই আমাকে ভয় ধরিয়ে দিয়ে ছিলিস মা। হঠাৎ করে কি করে এমন অসুস্থ হয়ে পড়লি বলতো??


মেঘ কি বলবে বুঝতে পারে না। সত্যিটা কি সবাই জানে??

না জানেনা। আর জানেনা বলেই তার শ্বশুর একথা জানতে চাইছে। সেদিনের রাতের কথা কাউকে কিছু বলা যাবে না।  তাহলে সবাই সৈকতকে ভুল বুঝবে। 

আর সেদিন রাতে এমন কিছু হয়েছিল বলেই তো সৈকতের বুকে মাথা রাখার সুযোগ পেয়েছিল। আর সৈকতের বুকে যে নিজের জন্য এত ভালবাসা লুকানো আছে তা এমনটা না হলে যে বোঝাই যেত না।  


—কি রে মা ,কি ভাবছিস?

—না কিছু না।  


হঠাৎ ডাক্তার আসে মেঘ কে চেকআপ করতে। 

চৌধুরী সাহেব ডাক্তার কে জিঙ্গাসা করলো মেঘের অবস্থা। 

—এখন ভাল আছে,তবে

—তবে কি ডাক্তার ?

—আজকের দিনটা এখানে থাক । আগামীকাল বাসায় নিয়ে গেলে ভাল হবে। 


মেঘ মনে মনে ডাক্তার কে ধন্যবাদ দেয় সুযোগ করে দেয়ার জন্য ।   কারণ মেঘ

আজ  নিজে সৈকতের ভালবাসা পরিমান টা দেখতে চাই। 


মেঘ বুদ্ধি করতে থাকে কিভাবে সবাইকে বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে শুধুমাত্র সৈকতকে রাখা যায়। 


মেঘের মনের মধ্য হাসফাস করছে সৈকত কে দেখার জন্য।এতক্ষন তো ওর চলে আসার কথা ঙ্গান ফেরার কথা শুনে কিন্তু কই!!??


দুপুরে ঝিনুক আসে মেঘকে দেখতে। 


রোজি ঝিনুক কে জিঙ্গাসা করেঃ

—কি রে সৈকত কি করছে? এখনো ঘুমাচ্ছে?

—কিসের ঘুম!!একটু আগে ভাইয়ার কয়েকটা বন্ধু এসেছিল তাদের সঙ্গে বেরিয়েছে। 

—মেঘের ঙ্গান ফেরার কথা বলেছিলি?

—হ্যা বলে ছিলাম। শুনে বললো থ্যাঙ্ক গড। 


মেঘের মনের মধ্য এতক্ষন যে অনন্দ হচ্ছিল সেটা এক মুহূর্তে ভষ্স হয়ে গেল। 

সৈকত মেঘের ঙ্গান ফেরার কথা শুনেও তাকে একবার দেখতে না এসে বন্ধুদের সঙ্গে চলে গেল!!?


মেঘের বুকের ভিতরটায় কেন জানি খুব কষ্ট হচ্ছিল।নিজের চোখের পানি অনেক কষ্টে সংবরণ করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললো এ দুদিন অনেক কষ্ট করেছে আমার জন্য। আজ না হয়  একটু বাইরে সময় কাটাক ভাল লাগবে। 


কিন্তু মেঘের মনে শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল সৈকত কেন তার সাথে এমন করে?? সবটুকু বলেও যেন কিছুই বলে না। সব সময় ধরা ছোয়ার বাইরে-------


    ৬.

                 

মেঘের সুস্থতার কথা শোনার পর সেদিন আর সৈকত মেঘকে দেখতে আসে নি।  

মেঘ যেন সুস্থ হয়েও আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তবে সেটা ভিতরে ভিতরে । কাউকে কিছু বুঝতে দিচ্ছে না অথচ ভিতরে জলে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কেন সৈকত তার সাথে এমন করছে কিছুই বুঝতে পারে না মেঘ। সেদিন ক্লিনিকে রাতে মেঘের পাশে ওর আম্মু ছিল। 

মেঘ সারা রাত না ঘুমিয়ে শুধু ছটফট করেছে আর ভাবছে কখন সকাল হবে ?

কখন সৈকতের মুখ টা দেখতে পারবে? এ কদিনে সৈকতের উপর অনেক মায়া জমে গেছে। মেঘ যে সৈকতকে  মনে মনে অনেকটাই ভালবাসতে শুরু করছে সেটা নিজে খুব ভালভাবে বুঝতে পারছে।  

যে মানুষটা তাকে এতটা এড়িয়ে চলে কথাই কথাই কষ্ট দেওয়ার চেষ্টা করে তাকে যে সে এতোটা ভালবাসবে মেঘ নিজেও বুঝতে পারেনি। 

মেঘ মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নেয় “সকালে বাসায় গিয়ে যে কর হোক সৈকতের মনের কথাটা তাকে আজ জানতেই হবে”। 


সকাল ১০টাই মেঘকে রিলিজ করা হল । চৌধুরী অফিসে যাওয়ার আগে মেঘের সাথে দেখা করে গেছে । রোজি আর ঝিনুক এলো মেঘকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার জম্য ।মেঘ অনেক আশা করে ছিল হয়তো সৈকতও তাদের সাথে আসবে কিন্তু-------


মেঘের আম্মু ক্লিনিক থেকে সোজা নিজেদের বাসায় চলে গেছে। মেঘ নিষেধ করেছিল যেতে ভেবে ছিল আম্মু তার সঙ্গে আসবে। কিন্তু আব্বু আর ভাইয়ার এ কদিনে একটু খাওয়ার কষ্ট হয়েছে । তাই মেঘ আর তার আম্মুকে জোর করেনি তার বাসায়  যাওয়ার জন্য। 

গাড়ির মধ্যে বসে  রোজি আর ঝিনুক একের পর এক কথা বলছে কিন্তু মেঘের সে দিকে কোন খেয়াল নেই। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে আর সৈকতের কথা ভাবছে।  কেন মানুষটা এমন??কেন!?কেন?কেন? 


গাড়ি বাড়ির দরজায় পৌছাতে যে যেখানে ছিল সবাই ছুটে এল। অনি দৌড়ে এসে বললো কি মজা!ছোট আম্মু এসেছে  !ছোট আম্মু এসেছে। 

বাসার কাজের মানুষ গুলো এসে ভাল মন্দ জিঙ্গাসা করছে। 

মেঘ অনি কে কোলে নিয়ে হল রুমের একটা সোফায় বসে । শরীরটা এখনো যে অনেকটা দুর্বল হয়ে আছে সেটা অনিকে কোলে নিয়ে বুঝতে পেরেছে। 


ঝিনুক মেঘের কাছে এসে বললো ভাবি জানো এ কদিন তোমাকে অনেক মিস করেছি । এ দুদিন বাড়িটা কেমন যেন ফাকা ফাকা লাগতো।  সবছিল তারপর ও মনে হতো কি যেন নেই। 

রোজি বলে ঠিক বলেছিস। মেঘ দুদিনে যে আমাদের সবার মনে এতোটা জায়গা করে নিবে সেটা বুঝতেই পারিনি।  

রোজি মেঘের কাধে হাত রেখে বললো জানিস তুই ছাড়া এ বাড়িটা মনে হচ্ছিল অপূর্ণ । এখন তুই এসে পূর্ণতা পেল। 


মেঘ মিচকি হেসে বলেঃ

— কি যে বলো না ভাবি!!?

—হ্যা সত্যি। আচ্ছা শোন তুই তাড়াতাড়ি করে ফ্রেস হয়ে একটু রেস্ট কর । একটু পরেই আবার তোকে একটা কাজ করতে হবে। 

—কি কাজ?

—তোদের বিয়েটা হুট করে হলো এ জন্য কোন অনুষ্ঠান করা হয়নি। তারপর বিয়ের  দুদিনের মাথায় এমন অসুস্থ হয়ে পড়লি।তাই বাবা তোর সুস্থতা কামনা করে মানত করেছিল যে ,তুই সুস্থ হয়ে বাড়িতে আসলেই গরিব মিসকিনদের পেট ভরে খাওয়াবে আর তাদের কিছু নতুন কাপড়  দান করবে। 

খুশিতে মেঘের চোখে পানি চলে আসে। 

এ বাড়ির সবাই তাকে এতটা ভালবাসে!!তার জন্য এতটা ভাবে!!?

বাড়ির সবাই এখন খুব খুশি মেঘ কে পেয়ে। 


মেঘ বার বার দোতলার দিকে তাকাচ্ছে আর ভাবছে

হল রুমে এত কথা হচ্ছে এত সরগোল হচ্ছে এটা শুনেই তো সৈকতের বোঝার কথা যে মেঘ বাসায় ফিরেছে। তারপর ও কেন সে নিচে আসছে না একটা বার দেখা করতে??সৈকত কি তাহলে এখনো ঘুমাচ্ছে?নাকি বাসায় নেই!?


মেঘ রোজিকে বলে ভাবি আমার শরীরটা একটু খারাপ লাগছে আমি উপরে যাচ্ছি। 

—চল আমি তোকে নিয়ে যাচ্ছি। 

—না ভাবি তুমি অনিকে নাও আমি যেতে পারবো। 

—আচ্ছা। 

মেঘ আস্তে আস্তে সিড়িঁ বেয়ে উপরে উঠে সৈকতের রুমের দরজার কাছে আসতেই বুকের ভিতরটা কেমন যেন দুরুদুরু করতে থাকে। এটা ভয়ে না অন্য কারণে সেটা মেঘ বুঝতে পারেনা। 


আস্তে করে দরজায় হাত দিয়ে ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে কিসের যেন তীব্র গন্ধ মেঘের নাকে এসে লাগলো। রুমের জানালা দরজা সব আটকানো তাই অন্ধকারে মেঘ ভালভাবে কিছু দেখতেও পাচ্ছে না।জানালা খোলার জন্য এগিয়ে যেতেই পায়ে একটা শক্ত কিছুর সাথে ধাক্কা খায় মেঘ।  নিজেকো কোন রকম সামলে জানালার পর্দা সরিয়ে জানালা খুলতেই দেখে সৈকত ফ্লোরে পড়ে আছে । আর ফ্লোর এখানে ওখানে দু-তিনটা খালি বোতল গড়াগড়ি খাচ্ছে। 

রুমের ভিতরে কোন জিনিস ঠিক নেই সব  ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। 

মনে হচ্ছে কেউ রাগ করে সব কিছু ছুড়ে ফেলেছে। 


মেঘ যেন এসব দেখে বিশ্বাস করতে পারছে না।  কি হচ্ছে এসব??

এই মানুষটা আবার এসব খাওয়া শুরু করলো ??কিন্তু কেন??


মেঘ বুঝতে পারে যে গন্ধটা তাহলে এসবের। সৈকতের দিকে তাকিয়ে দেখে দু’হাত মেলে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। মাথাটা শক্ত ফ্লোরে দিয়ে। মুখটা আগের থেকে অনেকটা শুকিয়ে গেছে। চোখের নীচে একটু কালো ও হয়েগেছে। চুল গুলো উস্কোখুস্কো। পায়ের জুতা মোজাটা পর্যন্ত খোলা নেই। টমি ও শুইয়ে আছে সৈকতের পায়ের কাছে।  মেঘ কে দেখে দু-একবার আস্তে করে ডেকে উঠলো কিন্তু মেঘ ভয় পেল না।  


মেঘ বিছানার উপর থেকে বালিস এনে সৈকতের মাথার নীচে দিয়ে দিল। 

তারপর পায়ের কাছে বসে পা থেকে জুতা খুলে টমির দিকে তাকিয়ে বললোঃ

— কিরে তোর মালিকের এ অবস্থা কেন?

আমি না হয় দুদিন অসুস্থতার জন্য বাসয় ছিলাম না কিন্তু তুইতো ছিলি। তুই খেয়াল করিস নি কেন??


টমি মেঘের দিকে তাকিয়ে শান্ত ভাবে ঘেউ ঘেউ করে উঠলো। মনে হচ্ছে কিছু বলছে। 

মেঘ টমি কে বললো কি বলছিস আমি বুঝতেছি না।

আমি তো তোর ভাষা এখনও বুঝিনা কিন্তু তুই তো তোর মালিকের সঙ্গে থেকে থেকে মানুষের কথা কিছুটা হলেও বুঝতে শিখেছিস।  

 

পা থেকে মুজা টা খুলে রাখে আর বলে আচ্ছা এ মানুষটা এমন কেন বলতো!!?


এতক্ষন টমি মাথা উচু করে কথা গুলো শুনলেও মেঘের এ কথা শুনে কেন জানি মাথাটা নিচু করে নিল। 


মেঘ বললো তার মানে তুই ও জানিস না !!?আচ্ছা আমি না হয় এ বাড়ীতে নতুন কিন্তু তুই তো অনেক বছর ধরে আছিস 

তাহলে বলতো কিসের এত কষ্ট তার??


হঠাৎ এ কথা শুনে টমি উঠে দৌড়ে একটা 

ড্রয়ারের কাছে গেল। আর মুখ দিয়ে সেটা খোলার চেষ্টা করছে। 


মেঘ অবাক হয়ে যায় টমির কাজে। 

আরে কি করছিস??বলে নিজে উঠে যায়। কিন্তু ড্রয়ার টা না খুলে টমিকে বলে আজ থেকে আমিও তোর বন্ধু হয়ে গেলাম । একটু সাহস নিয়ে টমির গলায় বাধা বেল্টে একটু হাত দেয় । 


আচ্ছা এখন কি করা যায় বলতো। সারা ঘরে কেমন গন্ধ বের হচ্ছে।  আর উনি ও নীচে পড়ে আছে।  ঘর টা যে কাউকে দিয়ে পরিষ্কার করাবো তার ও উপায় নেই। 


শরীরে আগের মত এত শক্তি ও নেই যে টেনে বিছানায় তুলবো। আচ্ছা তারপরও একটু চেষ্টা করে দেখি। 


মেঘ সৈকতের কাছে গিয়ে মাথাটা টেনে উঠিয় সোজা করে বসানোর চেষ্টা করতেই সৈকতের ঘুম ভেঙ্গে যায়। 


একটু চেয়ে থেকে ভাল করে চোখ মুছে বলে আরে তুমি!!?

কখন এলে??


সৈকত কথা বলতেই ওর মুখ থেকে মদের গন্ধ সব মেঘের নাকে এসে লাগলো। 

উুহঃবলে মেঘ নাক চেপে অন্য দিকে মুখ ঘোরাল। 

—ও সরি। সরি 


মেঘ উঠে সরে গিয়ে বলেঃ

—কিসের সরি??

—তোমার তো এ গন্ধটা পচ্ছন্দ  না তাই। 

—আপনি এসব কেন করছেন?

—সবসময় করি। 

—গত কয়েকদিন তো ঠিক ছিলেন তাহলে আবার কেন??

—এ কথার উত্তর আমি তোমাকে দিতে বাধ্য নই। মন চেয়েছে তাই। 

—আপনার যখন যেটা মন চাইবে আপনি তখন সেটাই করবেন!!?

—হ্যা করবো। তাতে তোমার কি??

—আমার কিছু না। আসলে আমারই ভুল। 

—কি ?

—কিছুনা । 

মেঘ রাগ করে ঘর থেকে বের হয়ে আসে। 

এদিকে সব আয়োজন শেষ । সবার খাওয়া শেষ।  চৌধুরী সাহেব মেঘকে ডেকে সবাইকে কাপড় গুলো বিতরন করতে বলে।  মেঘ দাড়িয়ে নিজের হাতে সবার হাতে কাপড় গুলো তুলে দেই।  সবাই খুব খুশি হয়ে মেঘ কে মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করে যায়। 


হঠাৎ মেঘ দেখে সৈকত কোথায় যেন যাচ্ছে। মেঘ কিছু না জিঙ্গাসা করে চুপ করে থাকে।  এক এক করে সবাই চলে যায়। 


বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হতে চললো কিন্তু সৈকতের আর দেখা নেই।  

সবাই খুব আনন্দ করছে কিন্তু মেঘের মনটা ভার হয়ে আছে ।  


মেঘ রাতের খাবারটা কোনরকমে তাড়াতাড়ি শেষ করে।  সৈকত আসার আগেই রুমে এসে একটা খয়েরী শাড়ী পরে সুন্দর করে সাজে।  মাথায় রজনীগন্ধা  ফুলের মালা জড়িয়ে রুমে হালকা আলো জ্বালিয়ে সৈকতের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। 


অপেক্ষার প্রহরটা সত্যিই খুব কষ্টের হয় । সেটা এতদিন মেঘ অন্যের মুখে শুনে এসেছে কিন্তু আজ  নিজে সেটা উপলব্ধি করতে পারছে। এক একটা মিনিট যেন মেঘের কাছে এক বছরের সমান। মেঘ ঘড়ি দেখে বারোটা বেজে দশ মিনিট তবুও সৈকতের আসার কোন নাম নেই।  

এমনিতে মেঘের শরীরটা খারাপ তার উপর গতরাত র্নিঘুম কাটিয়ে এখন চোখটা কেমন যেন মাতালের মত ঢুলুঢুলু হয়ে আসছে হাজার চেষ্টা করেও আর চোখের পাতা খুলে রাখতে পারছেনা। 


হঠাৎ দরজাটা খুট শব্দে খুলে যায় ।  সৈকত আস্তে ধীর পায়ে এগিয়ে আসে মেঘের  কাছে । সৈকত যতো মেঘের কাছে এগিয়ে আসছে মেঘের হার্টবিট ততো বেড়ে যাচ্ছে।  মনে হচ্ছে বুকের ভিতরে কেউ জোরে জোরে হাতুড়ি পেটাচ্ছে। সৈকত কাছে এসে মেঘের সামনে বসে হাত দিয়ে মেঘের মুখটা উচু করে কপালে একটা চুমু দেয়।  মেঘ সৈকতের স্পর্শে লজ্জায় লাল হয়ে যায়।  

সৈকত মেঘের কানের কাছে মুখ নিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলে মেঘ আই লাভ ইউ। 

মেঘ ও সৈকতের গলা জড়িয়ে ধরে বলে------------


                                       (চলবে)


Comments