অনুগল্প ১


💔💔#গল্পটা_স্বপ্নভঙ্গের💔💔


লেখাঃ সাবেরা সুলতানা রশিদ


মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে মেঘ, স্বপ্ন ছিল বি বি এ টা শেষ করে ব্যাংকে চাকরী করবে।সেই আশা নিয়ে বি বি এ তে ভর্তি হয়েছিল।নিজের বড় বোনের  বাসায় থেকে কলেজে যাওয়া আসা করতো।কিছুদিন যেতে না যেতেই মেঘ শুনলো তার এক কাজিন (লিজা) যে কিনা ইন্টার পাশ ও করেনি সে পুলিশে চাকরি পেয়েছে।এই খবর টা শোনার পর থেকেই মেঘের বড় আপুর মাথায় কি যেন ভর করলো!!উঠতে বসতে মেঘ কে কথা শোনাত,,ওমুক এই করে তমুক তাই করে নিজে কি করবি!!??


দাড়ান একটু মেঘের সম্পর্কে ও তার ফ্যামিলি সম্পর্কে বলে নি।মেঘের বাবা একজন সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন,মা গৃহিনী।বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে তার নিজের পচ্ছন্দ করা ছেলের সাথে।মেঘের ইন্টার পরিক্ষার প্রায় মাস খানেক আগে তার আম্মুর ব্রেস্ট টিউমার ধরা পড়ে।তাড়াতাড়ি করে অপারেশন করা হয় ঠিকই কিন্তু শরীরে ক্যান্সারের জীবানু পাওয়া যায়।অপারেশন করার পর টানা পনের দিন ক্লিনিকে রাত দিন মেঘ কে তার আম্মুর পাশে থাকতে হয়।কখন কি প্রয়োজন কখন খাওয়াতে হবে সব দেখাশুনা মেঘ নিজেই করতো। কারন তার বোনের সংসার আছে একটা বাচ্চাও আছে সে রান্না করে খাবার পাঠানো ছাড়া আর কিছুই করতে পারবে না।ডাক্তার পনের দিন পর যখন রিলিজ করলো মেঘের আম্মুকে মেঘ তার আম্মুকে বোনের বাসায় রেখে সোজা নিজেদের বাড়িতে চলে আসে।কারন পরিক্ষার আর বেশিদিন সময় নাই।বাড়িতেও বাবা আর মেঘ ছাড়া আর কেউ নেই যে বাড়ির অন্য কাজ করে দিবে।সব কাজ মেঘ কেই করতে হতো। কলেজে যাওয়ার আগে রান্না সেরে কলেজে যেত। দুপুরে ফিরে ঠাণ্ডা খেত।তারপর একটু রেস্ট নিয়ে বই নিয়ে বসতো।এভাবে কেটে গেল বাকি দিনগুলি।মেঘের পরিক্ষা শুরু হয়। একদিকে মায়ের অসুস্থতা,অন্যদিকে নিজের পরিক্ষা সাথে বাড়ির সব কাজ সামলানো। মা থেকেও আজ কাছে নেই। বাবা বাড়ি থাকে ঠিকই কিন্তু সেই ভাবে আর কথা হয়না।মেঘ অনেক একাকী হয়ে পড়ে।কিন্তু মনে একটাই স্বপ্ন ভালো রেজাল্ট তাকে করতেই হবে।হঠাৎ করে একদিন মেঘের ফোনে একটা রং নম্বর থেকে ফোন আসে। মেঘ সেটা রং নম্বর বলে কেটে দিলেও ছেলেটা তারপর থেকে প্রায় এস এম এস করে।কিন্তু মেঘের তাতে মাথা ব্যথা নেই।কারন আগে পরিক্ষা পরে অন্য কিছু।একে একে সব পরিক্ষা যখন শেষের পথে তখন সেই ছেলেটি আবার ফোন করে।মেঘ ফোনটা রিসিভ করে একটু ঝাড়ি দেয় এ জন্য যে  মেঘ প্রথম দি  নিষেধ করার পরো ও উনি কেন মেঘকে প্রতিদিন ম্যাসেজ দিয়েছে আবার আজ ফোন করেছেন??ছেলেটি মেঘ কে অবাক করে দিয়ে বলে পরীক্ষার যাতে ক্ষতি না হয় সেজন্য এতোদিন কল না দিয়ে ম্যাসেজ দিয়েছে।এখন যেহেতু পরীক্ষা শেষ তাই কল দিয়েছে।মেঘ যতোটা ছেলে টাকে অপমান করে আর ছেলেটা ততো নির্লজ্জের মতো মেঘের সাথে কথা বলার জন্য ফোন করতো। এক দিন, দুদিন করে টানা পনের দিন ছেলেটা একই সময় ফোন করতো, আর মেঘ ও এক দিন, দুদিন করে কথা বলতে বলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়লো। মেঘের একটা কথা বলার মানুষ হলো। ছেলেটার নাম  ধ্রুব একটা নামকরা বেসরকারি ইউনিভার্সিটিতে আইন নিয়ে পড়াশুনা করছে। ১ বছর লাগবে পড়াশুনা শেষ করতে।কথা বলতে বলতে মেঘ আর ধ্রুব এর মাঝে খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়। ধ্রুব তার সব কথা মেঘের সাথে শেয়ার করতো। 

একে অপরকে না দেখেই খুব ভালবেসে ফেলে তারা।জানে সামনে অনেক ঝড় আসবে, তবুও দুজন দুজনকে না ছেড়ে যাওয়ার প্রমিজ করে।


দিন যায় দিন আসে মেঘের পরীক্ষার রেজাল্ট বের হয়।শুরু হয় ভার্সিটি ভর্তির জন্য প্রানপন যুদ্ধ।চান্স ও হয়। অন্যদিকে মেঘের আপুও লেগে যায় ছেলে দেখতে।তার কথা ছেলে যাই হোক না কেন তার টাকা থাকতে হবে।মেঘ তার আপুর প্লান বুঝে ফেলে।তাই মনে মনে নিজেই ঠিক করে  পড়াশুনার পাশাপাশি কিছু একটা করতে হবে।ধ্রুব তাকে বলে প্রাইমারি চাকরির জন্য রেডি হতে বলে।মেঘকে বুঝায় যে যদি চাকরিটা  হয়ে যায় তাহলে ফ্যামিলির আর কেউ মেঘকে বিয়ের জন্য জোর দিতে পারবেনা।মেঘ ও ধ্রুবর কথা মতো শুরু করে পড়াশুনা,যাতে করে অন্তত একবার পরীক্ষা দিলে পরের বারের আশা না করতে হয়।


ওদিকে ক্লাস শুরু ৬ মাস যেতে না যেতেই মেঘের আপুর শুরু হয় মেঘকে উঠতে বসতে খোটা দেওয়া।বিভিন্ন ভাবে কথা বলা।একদিন মেঘ  ধ্রুবের সাথে কথা ফোনে কথা বলছিল হঠাৎ মেঘের আপু এসে মেঘের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে ধ্রুবকে ইচ্ছা মতো গালাগালি করে,, অনেক কথা শুনিয়ে দেয়।তারপর ধ্রুব মুখ বুজে শুনে ঠাণ্ডা মাথায় মেঘের আপুকে বুঝাতে চেষ্টা করে তাদের রিলেশনের ব্যাপারে।সে কোন ফ্যামিলির ছেলে বাসা কোথায়, বাড়ির ঠিকানা সব দিয়ে দেয়।তারপর ও মেঘের আপু সেসব গ্রাহ্য না করে অনেক খারাপ ব্যবহার করেন।তারপর মেঘের ফোন দিয়ে বাড়িতে তার আম্মুর কাছে ফোন করে মেঘের নামে বানিয়ে বানিয়ে বাড়িতে মিথ্যা বলতে শুরু করে।


একদিকে মেঘের আম্মু এমনিতেই অসুস্থ তার উপর এসব কথা শুনে তিনি সহ্য করতে পারতেন না।মেঘের সাথে তার আম্মু কথা বলা বন্ধ করে দিল। মেঘ কোন কিছুই বুঝতে পারতো না কেন সবাই এমন করছে তার সাথে।মেঘের আপু মেঘ কে সব সময় আম্মুর অসুস্থতার কথা বলে, ওষুধপাতির দামের কথা বলে মেঘ কে বুঝিয়ে দিতে শুরু করলো যে আম্মু,আব্বুর কাছে তুই এখন বোঝা হয়ে গেছিস।মেঘের জন্যই নাকি তার আম্মুর ওষুধ কেনার টাকা থাকে না।মেঘ খুব অভিমানী আর জেদি মেয়ে ছিল। কথা গুলি আর সহ্য করতে পারতো না।একা একা কান্না করতো। ওদিকে ধ্রুব মেঘের সাথে দেখা করার জন্য পাগল হয়ে উঠলো।এমনিতে সবাই ভুল বুজে মেঘকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।


মেঘের মনে মনে ভয় হতে লাগলো ধ্রুব ও না মেঘকে দেখার পরে দূরে সরে যায়।কারন মেঘ খুব সাধারণ একটা মেয়ে ছিল।অন্য মেয়েদের মতো সে তার লাইফস্টাইল সময়ের সাথে বদলাতে পারেনি।কোন আর্টিফিসিয়াল জিনিশ তার পচ্ছন্দ হতো  না। ধ্রুবের অনেক জোরা জুরিতে  একটা দিন ঠিক করে তারা দেখাও করলো।ধ্রুব মেঘকে না দেখেই যতোটা না ভালবেসেছিল, দেখার পরে ভালবাসার পরিমান টা অনেক বেড়ে গেল।মেঘের সরলতা ধ্রুব কে বিমোহিত করে দিল।আর মেঘের এই সিমপ্লিসিটি ধ্রুব কে মুগ্ধ করে দিল।একটা মেয়ে বিনা সাজে এতো টা সুন্দর কি করে হয় তা ধ্রুব মেঘ কে না দেখলে বুঝতে পারতো না।


সেদিন মেঘ ধ্রুবর সাথে দেখা করে বাসায় ফিরতেই মেঘকে দেখে মেঘের আপু হাতে একটা থ্রিপীচ তুলে দিয়ে বললেন এটা চেঞ্জ করে নে।আর শোন হালকা একটু সাজুগুজু ও করবি।মেঘের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়েছিল কথাটা শুনে।মেঘ বুঝতে পেরেছিল কিছু একটা ঘটতে চলেছে। কারন কিছু দিন থেকে বাসায় ফিসফিস করে মেঘের অজান্তে এসব কিছু চলছিল।মেঘ কি করবে কিছুই বুঝতে পারেনা।এ মুহুর্তে যে ধ্রুবকে সব জানাবে তার ও উপায় নেই।ধ্রুব শুনে কিইবা করবে,, এতো ক্ষনে হয়তো ধ্রুব ঢাকার উদ্দেশ্য গাড়িতে উঠে বসেছে।


মেঘ তার আপুর কথামতো রেডি হয় ঠিক কিন্তু মনে মনে আল্লাহ কে ডাকতে থাকে যেন, মেঘ যা ভাবছে তা মিথ্যা হয়।কথায় আছে অভাগা যেদিকে চায়, সাগরও শুকিয়ে যায়।মেঘের  অবস্থাও তেমন হলো।ছেলে পক্ষ দেখতে আসলো, সে পেশায় একজন ইঞ্জিয়ার।ছেলেটি মেঘকে দেখে সরাসরি সবার সামনে বলেও দিল যে মেঘকে তার খুব পচ্ছন্দ হয়েছে।মেঘের বড় আপু খুব খুশি কথাটা শুনে।কিন্তু মেঘ কেন যেন খুশি হতে পারছে না।ছেলেপক্ষ জানিয়ে দিয়ে গেল তারা মতামতের অপেক্ষায় থাকবে।


ঝড় উঠার আগে গোটা প্রকৃতি যেমন ঠাণ্ডা হয়ে যায়,ছেলেপক্ষ দেখে যাওয়ার পর থেকে মেঘের আপুও তেমনি চুপ হয়ে যায়।মেঘ তার আপুর এই চুপ থাকাকে পজিটিভ ভাবে নিয়েছিল, ভেবেছিল বিয়েটা হয়তো  কোন না কোন ভাবে ভেঙ্গে গেছে।কিন্তু মেঘের ধারনা ভূল প্রমানিত হলো।মেঘের পরীক্ষার এক মাস বাকী মেঘ ক্লাস শেষ করে বাসায় এসে দেখে আপু সব ব্যাগ গুছিয়ে অপেক্ষা করে বসে আছে।মেঘ জিঙ্গাসা করতেই বলে আম্মু অসুস্থ দুপুর থেকে তাড়াতাড়ি রেডি হয়েনে।মেঘ সাত পাচ না ভেবেই তার আপুর কথা বিশ্বাস করে ফেলে।একটা বারের জন্য ও মনে হয়নি আপু হয়তো মিথ্যা বলতে পারে।বাড়িতে আসতে সন্ধ্যা হয়ে যায়।বাড়িতে অলরেডি অনেক মানুষ এসে গেছে আত্মীয় দের মধ্য থেকে।মেঘ ভেবেছিল তার আম্মুর অসুস্থতার কথা শুনেই হয়তো  সবাই এসেছে।কিন্তু মেঘ তার আম্মুর কাছে যেতেই বড় ধরনের ধাক্কা খায় কারন তার আম্মু দিব্যি সুস্থ আছে। মেঘের আর কিছু বুঝতে বাকি থাকে না। তাড়াতাড়ি নিজের রুমে এসে ফোন খুজতে থাকে ধ্রুব কে সবটা জানানোর জন্য।কিন্তু আগেই তার ফোন কেউ সরিয়ে ফেলেছে।মেঘ অনেক কষ্ট করে অন্য আরেক জনের ফোন থেকে ধ্রুবের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে,অনেক গুলি কল দেওয়ার পরেও যখন ধ্রুব ফোনটা রিসিভ না করে তখন মেঘ ছোট্ট একটা ম্যাসেজ দিয়ে রাখে নিজের নামে


 "আজ যে মুল্যবান জিনিশ তুমি হারাতে যাচ্ছো, হাজার চেষ্টা করেও তুমি আর তা ফেরত পাবেনা" (মেঘ)


ম্যাসেজটা পাওয়ার পর ধ্রুব তাড়াতাড়ি করে ওই নম্বরে ফোন করতেই মেঘ সবটা খুলে বলে যে রাত পার হলেই বিয়ে।ধ্রুব কথাটা শুনেই আর কিছু না ভেবেই মেঘ কে বলে চিন্তা করোনা আমি এখনি বের হচ্ছি।বর যাত্রী বাড়িতে পৌছানোর আগেই আমি পৌছে যাবো। মেঘ কথাটা শুনে খুশি হলেও বুকের ভিতরে কেমন জানি এক অজানা ভয় চেপে ধরছিল বার বার।ধ্রুব মেঘকে আশস্ত করে সে আসবে।আর মেঘকে লাল শাড়ি পরিয়ে বউ বেসে তার করে  নিয়ে যাবে।


ধ্রুব যখন মেঘের শহরে পৌছায় তখন সকাল ১০ টা বাজে।ধ্রুব বাস থেকে নেমে একটা মোটরসাইকেল ঠিক করে মেঘদের বাড়ি যাওয়ার জন্য। বাইক চালককে ঠিকানা বুঝিয়ে দিতেই উনি বললেন যে সে মেঘ কে খুব ভালো করেই চিনে তারা একই গ্রামে থাকে।ধ্রুব বাইকে উঠে বসে কি ভেবে আবার তাকে বলে আপনি দাড়ান আমি এখনি আসছি বলে রাস্তার ওপাশের  বড় কাপড়ের দোকানে ডোকে তারপর হাতে একটা শপিং ব্যাগ নিয়ে হেটে আসতেই ধ্রুবর ফোনটা বেজে ওঠে, ধ্রুব ফোন রিসিভ করে আনমনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হতেই একটা গাড়ি ধাক্কা দেয়, ধ্রুব গাড়ির ধক্কায় দূরে গিয়ে ছিটকে পড়েতেই জায়গাটা রক্তে লাল হয়ে যায় হাতে ধরা থাকে শপিং ব্যাগ।সবাই তাড়াতাড়ি করে ছুটে আসে কিন্তু ততোক্ষনে সব শেষ।বাইক চালক তাড়াতাড়ি দৌড়ে আসে।  


হ্যা ধ্রুব  সেদিন মেঘকে দেওয়া কথা রেখেছিল।বর যাত্রি  আসার আগে ধ্রুব এসেছিল ঠিকই, কিন্তু লাশ হয়ে।বিয়ে বাড়িতে বর যাত্রি আসার আগেই গেটে  হঠাৎ অচেনা ছেলের লাশ!!!?? সবার জানাজানি হয়ে গেল।মেঘের কানে কথাটা পৌছাতেই মেঘ ছুটে যায়,মেঘ ধ্রুবকে দেখেই কেমন যেন পাথরের মতো হয়ে যায়।ধ্রুবের হাত থেকে ব্যাগ টা নিয়ে খুলতেই লাল রঙের বেনারসি শাড়ি দেখে। মেঘ শাড়িটা খুলে দুহাতে করে বুকে চেপে ধ্রুব বলে চিৎকার করে উঠেই অঙ্গান হয়ে পড়ে যায়।


হ্যা মেঘ বেচে আছে।ধ্রুবকে নিয়ে দেখা স্বপ্ন গুলি ভেঙ্গে যাওয়ার পর নতুন করে নিজের মতো করে সেই স্বপ্ন আবার জোড়া লাগিয়েছে,নতুন করে সংসার পেতেছে  মেন্টাল  হাসপাতালের ২০১ নম্বর সেলে।ধ্রুবের আনা সেই লাল বেনারসি শাড়ি  পরেই মেঘ সেই দিন থেকে আজও অপেক্ষা করে বসে আছে তার ধ্রুবের জন্য।মেঘ কথা বলে নিজের সাথে বিড় বিড় করে আর মাঝে মাঝে ধ্রুব ধ্রুব বলে চিৎকার করে কাদে.......


(সমাপ্ত)

Comments